
যে জন্মের মৃত্যু নেই! মুহাম্মদ আবদুল খালেকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি
——————————————-
সোহেল মো. ফখরুদ-দীন
———————————————
আজ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। সকালবেলা ঢাকার পুরানা পল্টন এলাকার পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোর মধ্যে ঘুরছিলাম। পুরোনো বইয়ের প্রতি আমার এক ধরনের দুর্বলতা আছে—বরং একে ভালোবাসা বলাই ভালো। যতবার ঢাকায় গিয়েছি , পুরোনো বইয়ের দোকানে না ঢুকে ফিরে গেছি—এমন ঘটনা আমার স্মৃতিতে নেই। পুরোনো বইয়ের গন্ধ, হলদে হয়ে যাওয়া পৃষ্ঠা, মলাটের বিবর্ণতা—সবকিছুর মধ্যেই যেন অতীতের কোনো মানুষের নিঃশ্বাস লুকিয়ে থাকে।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। পুরোনো বইয়ের স্তূপের মধ্যে হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটি বইয়ের মলাটে—‘যে জন্মের মৃত্যু নেই’। লেখক মুহাম্মদ আবদুল খালেক। বইটি হাতে তুলে নিলাম। মাত্র বিশ টাকায় বইটি কিনে নিলাম। কিন্তু বইটির মূল্য আমার কাছে বিশ টাকা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন মানুষ, একজন কবি, একজন গবেষক এবং দীর্ঘদিনের এক স্মৃতির অমূল্য অধ্যায়।
বইটির নামটি আমাকে থামিয়ে দিল—‘যে জন্মের মৃত্যু নেই’। কী অদ্ভুত এক নাম! মানুষ জন্ম নেয়, বেঁচে থাকে, একদিন মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু কিছু মানুষের জন্ম যেন মৃত্যুর সীমারেখায় থেমে থাকে না। তাঁরা তাঁদের কর্মে, লেখায়, চিন্তায়, স্মৃতিতে এবং মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন। কবি আবদুল খালেকও কি তেমন একজন মানুষ নন? তিনি চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুর সংবাদটি জানার পরও আজ পুরোনো বইয়ের দোকানে তাঁর বইটি হাতে নিয়ে মনে হলো—তিনি যেন কোথাও যাননি। তাঁর অক্ষরগুলো তো এখনো আছে, তাঁর বই আছে, তাঁর স্মৃতি আছে; আছে তাঁর সঙ্গে কাটানো কিছু অমূল্য মুহূর্ত। প্রায় তিন দশক আগে চট্টগ্রামে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। কেবি আমান আলী রোডের পুরোনো চারতলা ভবনে প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ মোস্তফা জামাল সাহেবের বাসায় তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা। সেই প্রথম পরিচয়ের পর ধীরে ধীরে সম্পর্কটি পরিচয় থেকে আন্তরিকতায় গড়ায়। দেখা হলে কথা হতো, সাহিত্য-ইতিহাস-রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হতো। তাঁর মধ্যে ছিল ইতিহাসের প্রতি গভীর আগ্রহ এবং অতীতের মানুষদের নিয়ে কাজ করার এক অদম্য তাগিদ।
বাংলাদেশের প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ের বহু লেখক, গবেষক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও মনীষীকে নিয়ে তিনি গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইগুলো শুধু বই ছিল না—এক অর্থে সেগুলো ছিল হারিয়ে যেতে বসা মানুষ ও সময়কে ধরে রাখার চেষ্টা।
চট্টগ্রামে একবার জে. এম. সেনের স্মরণে আমি একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিলাম। সেই অনুষ্ঠানে কবি আবদুল খালেক প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তাঁর উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে অন্যরকম মর্যাদা দিয়েছিল। তিনি আমাকে তাঁর লেখা অনেক বই উপহার দিয়েছেন। বইয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল গভীর এবং স্বতঃস্ফূর্ত।
একবার, সম্ভবত অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ শেষে ফিরে এসে তিনি আমাকে একটি সুন্দর ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন। উপহারটির আর্থিক মূল্য হয়তো খুব বেশি ছিল না, কিন্তু আজ এত বছর পর সেই ঘড়ির স্মৃতির মূল্য আমার কাছে অপরিসীম। কারণ বস্তুটি নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষটিই ছিল মূল্যবান। ঢাকার বাংলা মোটর ( হাতিরপুল ) এলাকায় তাঁর বাড়িতেও একবার গিয়েছিলাম। বাড়িতে ঢুকে মনে হয়েছিল—এটি যেন কোনো সাধারণ বাসাবাড়ি নয়, বইয়ের একটি নীরব রাজ্য। চারদিকে শুধু বই আর বই। এমনকি যে খাটে তিনি ঘুমাতেন, সেখানেও বইয়ের স্তূপ। বই যেন তাঁর জীবনের সঙ্গী, তাঁর নিঃসঙ্গতার বন্ধু। সেদিন বাড়িতে তাঁর বয়স্ক মা ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। জানতে পারলাম, তিনি মায়ের সেবাযত্নেই নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। কিছুদিন পর তাঁর মা-ও পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। মানুষের জীবনে দায়িত্ব, ভালোবাসা ও একাকিত্ব কীভাবে পাশাপাশি হাঁটে—তাঁর জীবন যেন তারও একটি নীরব উদাহরণ।
কলকাতায় একবার কবি হরেন দার সঙ্গে ভারতের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ প্রণব মুখার্জির বাসায় গিয়েছিলাম। তখন তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি হননি। বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি শুনে প্রণববাবু হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন—কবি আবদুল খালেককে চেনেন? প্রশ্নটি আমাকে বিস্মিত করেছিল। বুঝেছিলাম, তাঁর পরিচিতি শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ ছিল না। আমি তাঁকে চাচা বলে সম্বোধন করতাম। তিনি ‘কষ্ঠি পাথর’ নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করতেন এবং আওয়ামী ধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
আজ পুরোনো বইয়ের স্তূপ থেকে তাঁর ‘যে জন্মের মৃত্যু নেই’ বইটি হাতে তুলে নিয়ে মনে হলো—কখনো কখনো পুরোনো বই আসলে পুরোনো হয় না। বইয়ের পাতার ভাঁজে মানুষটি আবার ফিরে আসেন। মৃত মানুষও অক্ষরের মধ্য দিয়ে কথা বলেন। স্মৃতি তখন সময়ের দেয়াল পেরিয়ে আমাদের কাছে এসে দাঁড়ায়।
কবি আবদুল খালেক আজ আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই। এটাই পৃথিবীর নির্মম সত্য। মানুষ মরণশীল। কিন্তু মানুষের কর্ম, সৃষ্টি, ভালোবাসা ও স্মৃতি কখনো কখনো মৃত্যুকে অতিক্রম করে যায়। একজন গুণী মানুষ তাঁর জীবনের আয়ু দিয়ে যতটা বাঁচেন, তাঁর কর্মের আয়ু দিয়ে বাঁচেন তার চেয়েও অনেক বেশি।
‘যে জন্মের মৃত্যু নেই’—আজ বইটির নামটি আমার কাছে তাই শুধু একটি কাব্যগ্রন্থের নাম নয়; এটি যেন কবি আবদুল খালেকের জীবন ও স্মৃতির এক প্রতীকী পরিচয়।
আজ তাঁর বইটি বিশ টাকায় কিনেছি; কিন্তু এর ভেতরে যে মানুষটিকে আবার খুঁজে পেলাম, তাঁর মূল্য কোনো অর্থে মাপা যায় না।
প্রিয় কবি আবদুল খালেক, আপনি চলে গেছেন—কিন্তু আপনার বই রয়ে গেছে, আপনার কর্ম রয়ে গেছে, আপনার স্মৃতি রয়ে গেছে। আমাদের মতো যারা আপনাকে কাছ থেকে দেখেছি, কথা বলেছি, আপনার স্নেহ পেয়েছি—তাদের হৃদয়ের পাতায়ও আপনি বেঁচে থাকবেন। আপনার ‘যে জন্মের মৃত্যু নেই’—সেই জন্ম হোক আপনার কর্মের জন্ম। আপনি বেঁচে থাকুন আপনার সৃষ্টি, স্মৃতি ও ভালোবাসার মধ্যে—অন্তরে অন্তরে।
মহান আল্লাহ আপনার পরম আত্মার শান্তি দান করুন।
————
লেখক: সোহেল ফখরুদ-দীন, পরিচালক, ইতিহাসের পাঠশালা, বাংলাদেশ।
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
![]()









