[bangla_day] - [english_date] - [bangla_date] - [hijri_date]

নীরব পিতৃত্ব: ত্যাগে গড়া এক জীবনের ভিত্তি

নীরব পিতৃত্ব: ত্যাগে গড়া এক জীবনের ভিত্তি

আবদুল্লাহ মজুমদার

কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন কোনো শিরোনামে ধরা পড়ে না, কোনো আলোচনায় দীর্ঘ হয় না; তবুও তাঁদের নীরব উপস্থিতি একটি পুরো পরিবারের ভিত্তি গড়ে দেয়। বাবা সেই রকমই এক অদৃশ্য শক্তি—যিনি সন্তানের স্বপ্নের ভিত তৈরি করেন নিজের স্বপ্ন ভেঙে। তাঁর ত্যাগ দৃশ্যমান নয়, কিন্তু প্রতিটি সফলতার ভেতরে তা গভীরভাবে মিশে থাকে। এই নীরব অথচ বিশাল অবদানকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার একটি প্রতীকী উপলক্ষ হলো বাবা দিবস।

বাবা দিবস একটি আধুনিক সামাজিক উপলক্ষ। এটি কোনো ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা নয়; বরং বিশ্বজুড়ে বাবাদের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি প্রতীকী দিন।

এর সূচনা ঘটে যুক্তরাষ্ট্রে। সোনোরা স্মার্ট ডড নামের এক নারী তাঁর একক পিতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা থেকে এই দিবস পালনের ধারণা দেন। তাঁর বাবা একা হাতে ছয় সন্তানকে বড় করেছিলেন। সেই ব্যক্তিগত অনুভূতিই পরবর্তীতে একটি বৈশ্বিক সামাজিক স্বীকৃতিতে রূপ নেয়।

১৯১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে বাবা দিবস পালিত হয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পর ১৯৬৬ সালে এটি জাতীয় স্বীকৃতি পায়। বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে জুন মাসের তৃতীয় রবিবারে দিনটি পালিত হয়।

বাবার ভূমিকা: অর্থের বাইরে এক নীরব ভিত্তি
বাবার ভূমিকা কেবল উপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি, আবার একই সঙ্গে মানসিক স্থিতি ও নৈতিক দিকনির্দেশনার প্রতীক।

একজন বাবা সন্তানকে শৃঙ্খলা শেখান, দায়িত্ববোধ গড়ে তোলেন এবং বাস্তব জীবনের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত করেন। অনেক ক্ষেত্রে বাবার নীরব উপস্থিতিই সন্তানের আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

তাঁর দায়িত্বের বড় অংশই অদৃশ্য। নিজের স্বপ্ন, বিশ্রাম এবং ব্যক্তিগত চাহিদাকে তিনি অনেক সময় পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য পিছনে সরিয়ে রাখেন। এই নিঃশব্দ ত্যাগই তাঁকে একজন “অদৃশ্য স্থপতি”তে পরিণত করে।

নীরব চাপের ভেতরে একজন বাবা: সমাজে বাবাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা প্রায় একরকম—তাঁকে শক্ত থাকতে হবে; ভেঙে পড়া চলবে না। আবেগ প্রকাশ যেন তাঁর জন্য নয়।

এই সামাজিক চাপের ভেতরেই একজন বাবা প্রতিদিন বেঁচে থাকেন। অর্থনৈতিক দায়িত্ব, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সন্তানের পড়াশোনা এবং পরিবার পরিচালনা—সব মিলিয়ে তিনি এক অবিরাম মানসিক চাপ বহন করেন।

কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এই চাপের কথা তিনি খুব কমই বলেন। তাঁর এই নীরবতা অনেক সময় পরিবারের জন্য শক্তি হয়ে দাঁড়ালেও, ব্যক্তিগতভাবে তা এক গভীর একাকীত্বের গল্প।

পরিবর্তিত পারিবারিক বাস্তবতা: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক কাঠামো বদলেছে। এখন অনেক পরিবারে মা-বাবা উভয়েই অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয়। ফলে বাবার ভূমিকা শুধু উপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তিনি এখন পথপ্রদর্শক, মানসিক সমর্থনদাতা এবং অনেক ক্ষেত্রে সন্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধুও।

এই পরিবর্তন পারিবারিক সম্পর্ককে আরও মানবিক করেছে। তবে পরিবর্তন সত্ত্বেও বাবার মূল পরিচয় অপরিবর্তিত—তিনি সেই নীরব দায়িত্বশীল শক্তি, যিনি পরিবারকে স্থিতি দেন।

বাবার অনুপস্থিতি: এক গভীর শূন্যতার নাম
যেসব পরিবারে বাবা নেই, সেখানে শূন্যতা শুধু আর্থিক নয়, আবেগগতও। একজন বাবার অনুপস্থিতি সন্তানের আত্মবিশ্বাস, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং নিরাপত্তাবোধে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

বাবা কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি মানসিক আশ্রয়, একটি স্থিতিশীল ছায়া, যা জীবনের অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করে।

ব্যক্তিগত স্মৃতি: সততার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি
আমার বাবা মারা যান ১৯৯১ সালের ২ জুন। একই বছরের ২৯ এপ্রিল একটি ঘূর্ণিঝড়ের পর আমরা রাজধানীতে তাঁর চিকিৎসার জন্য যাই। তখন তাঁর ক্যান্সার ধরা পড়ে। চিকিৎসা চলে ফিজি হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে, মিরপুরে বড় চাচার বাসায় থেকে।

তখন আমার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। বাবাকে খুব কাছ থেকে দীর্ঘ সময় দেখার সুযোগ হয়নি। কিন্তু সেই অল্প সময়ের স্মৃতিতেই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় আমি পেয়েছি—অসাধারণ সততা।

তিনি এমনভাবে সৎ ছিলেন, যেন এক নীরব নৈতিকতার প্রতিমূর্তি। তাঁর কথায়, কাজে এবং আচরণে ছিল এক ধরনের নির্মলতা, যা খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। জীবনে এমন মানুষ খুব কমই দেখা যায়।

এই স্মৃতি আজও আমার কাছে বাবাকে শুধু একজন অভিভাবক নয়, বরং এক জীবন্ত মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে।

বাবা দিবস: প্রয়োজন নাকি প্রতীক: বাবা দিবস কোনো বাধ্যতামূলক সামাজিক বা ধর্মীয় বিষয় নয়। এটি একটি প্রতীকী দিন, যা বাবার অবদান স্মরণ করিয়ে দেয়।

কেউ কেউ মনে করেন, ভালোবাসা ও দায়িত্ব কোনো নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হতে পারে না। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ব্যস্ত জীবনে এই ধরনের একটি দিন অন্তত কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করে।
এই দুই দৃষ্টিভঙ্গিই বাস্তব এবং গ্রহণযোগ্য।

উপসংহার: বাবা দিবস শেষ পর্যন্ত একটি প্রতীক—নীরব ত্যাগের প্রতি সামান্য স্বীকৃতি। কিন্তু এই স্বীকৃতির বাইরেও সত্য আরও গভীর।

একজন বাবা কোনো উৎসবের বিষয় নন; তিনি একটি জীবনের ভিত্তি। তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ্যে নয়, ত্যাগে; তাঁর পরিচয় কথায় নয়, দায়িত্বে। তিনি এমন এক নীরব স্থপতি, যিনি নিজের জীবনকে পিছনে রেখে সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন।

তাই শেষ পর্যন্ত বলা যায়—বাবা দিবস থাকুক বা না থাকুক, বাবার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ব কোনো দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রতিদিনের অনুভূতি, প্রতিদিনের ঋণ এবং প্রতিদিনের এক নীরব কৃতজ্ঞতা।

লেখক: সহকারী সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn

“বোয়ালখালীতে বালুর অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ-বৈধ বালুমহাল নেই, অথচ প্রতিদিন শত শত ট্রাক। চরণদ্বীপ, খরণদ্বীপ ও কধুরখীলে ৩০টির বেশি বালু বিক্রয়কেন্দ্রের অভিযোগ। রাজস্ব, পরিবেশ ও জনদুর্ভোগের দায় কার?