
সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই
কলমের কণ্ঠরোধ করে সত্যকে হত্যা করা যায় না
চট্টগ্রাম সিনিয়র’স প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও অবিলম্বে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের জোর দাবি
একজন সাংবাদিকের মৃত্যু মানে শুধু একটি প্রাণের অবসান নয়, একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া, সন্তানের মাথার ওপর থেকে নির্ভরতার ছায়া সরে যাওয়া এবং সত্য প্রকাশের পথে এক ভয়াবহ অশনিসংকেত। নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যার মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত, ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরের তেলনজিয়া এলাকায় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন। তিনি বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের একটি ফেসবুক পাতায় বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখি করতেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর আগেও ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় তিনি হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে আবারও তাঁর প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ঘটনা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একটি পরিবার তার প্রিয় মানুষটিকে হারিয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান রেখে গেছেন। যে মানুষটি পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়তে, সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে এবং নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন, তাঁকে আর জীবিত ফিরে পাওয়া গেল না। তাঁর সন্তানদের কাছে বাবার অনুপস্থিতি কোনো সাময়িক শূন্যতা নয়, এটি সারা জীবনের বেদনা। তাঁর স্ত্রীর কাছে এই হারানো শুধু একজন স্বামীর মৃত্যু নয়, জীবনের বহু স্বপ্ন ও নির্ভরতার আকস্মিক অবসান।
আমরা প্রশ্ন রাখতে চাই, একজন সাংবাদিককে যদি আগের হামলার পরও নিরাপদ রাখা না যায়, তবে সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তা কোথায়? অন্যায়, অপরাধ ও অনিয়মের সংবাদ প্রকাশ করা কি একজন সাংবাদিকের অপরাধ? সত্য তুলে ধরার কারণে কাউকে যদি জীবন দিতে হয়, তবে তা কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, গোটা সমাজের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা।
চট্টগ্রাম সিনিয়র’স প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের মৌলিক অধিকার। সাংবাদিকের কলম যেন ভয়, হুমকি কিংবা মৃত্যুর আশঙ্কায় থেমে না যায়। সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং সাংবাদিকদের ওপর সংঘটিত অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
আমরা সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি—
১. সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত অবিলম্বে সম্পন্ন করতে হবে।
২. হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। হত্যার পেছনে কোনো পূর্বশত্রুতা, পেশাগত বিরোধ কিংবা অপরাধসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। কোনো সম্ভাবনাকেই আগাম সত্য ধরে না নিয়ে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নিতে হবে।
৩. এর আগে তাঁর ওপর সংঘটিত হামলার ঘটনা, সেই ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা পর্যালোচনা করতে হবে।
৪. প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল তথ্য ও অন্যান্য প্রমাণ যথাযথভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই বিচারের বাইরে থাকতে না পারে।
৫. নিহত সাংবাদিকের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাঁদের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা দিতে হবে।
৬. সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি ও হত্যার ঘটনাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সাংবাদিকের কণ্ঠরোধ করতে সহিংসতার আশ্রয় নেওয়ার সাহস না পায়।
আমরা আরও মনে করি, সাংবাদিক হত্যার বিচার কেবল একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়; এটি আইনের শাসন, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনগণের জানার অধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকারের পরীক্ষা। অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয় কিংবা প্রভাব যা-ই থাকুক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকতে পারে না।
আমাদের প্রতিবাদ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রমাণহীন অভিযোগ নয়। আমাদের দাবি সত্য উদ্ঘাটনের, অপরাধীর পরিচয় নির্ধারণের, নিরপেক্ষ তদন্তের এবং আইনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার। আমরা চাই না কোনো নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হোক; আবার কোনো অপরাধীও যেন প্রভাব, অর্থ কিংবা ক্ষমতার জোরে পার পেয়ে না যায়।
আজ লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের রক্তাক্ত মৃত্যু আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ছে। তাঁর পরিবারের কান্না আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন সাংবাদিকও কারও বাবা, কারও স্বামী, কারও সন্তান এবং একটি পরিবারের বেঁচে থাকার অবলম্বন। সাংবাদিকের কলম সমাজের অসংগতি তুলে ধরে, মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে। সেই কলমের মানুষকে হত্যা করা হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু তাঁর পরিবার নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের সত্য বলার সাহসও।
আমরা বিশ্বাস করি, গুলি করে একজন সাংবাদিকের জীবন থামিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু সত্যের প্রয়োজনকে চিরতরে মুছে ফেলা যায় না। ভয় দেখিয়ে কিছু কণ্ঠ স্তব্ধ করা সম্ভব, কিন্তু ন্যায়বিচারের দাবি থামিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। সাংবাদিক সমাজের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ, দায়িত্বশীল অনুসন্ধান এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগের মধ্য দিয়েই এই অন্ধকারের অবসান ঘটাতে হবে।
চট্টগ্রাম সিনিয়র’স প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে আমরা সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে জড়িতদের গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি।
আমাদের দাবি একটাই—সাংবাদিক হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সত্য প্রকাশের অধিকার রক্ষা করতে হবে। আর কোনো সাংবাদিককে যেন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ দিতে না হয়।
সাংবাদিক হত্যা বন্ধ হোক। অপরাধীর বিচার হোক। সত্য ও ন্যায়বিচারের জয় হোক।
মো. কামাল উদ্দিন
সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক
সাধারণ সম্পাদক
চট্টগ্রাম সিনিয়র’স প্রেসক্লাব
![]()









