- - -

সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যার বিচার দাবিতে সোচ্চার সাংবাদিক সমাজ, দ্রুত গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম

img 20261016 wa0251
Print News

সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যার বিচার দাবিতে সোচ্চার সাংবাদিক সমাজ, দ্রুত গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম

 

ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬: নেত্রকোনায় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার, সুষ্ঠু তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নের দাবি উঠেছে।

মোহাম্মদপুর ও মিরপুর সাংবাদিক প্রেসক্লাবের উদ্যোগে সাংবাদিক হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে নেতৃবৃন্দ বলেন, সাংবাদিকরা জাতির বিবেক। সত্য প্রকাশ, অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং জনস্বার্থ রক্ষায় সাংবাদিকরা দিনরাত কাজ করেন। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া,সারা দেশে সাংবাদিকরা মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও দেশের সার্বভৌমত্বের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন। অথচ পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁদের যদি প্রাণ দিতে হয়, তাহলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোথায়,এ প্রশ্ন আজ গোটা সাংবাদিক সমাজের।

সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাংবাদিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। মাদক ও চোরাচালানবিরোধী অবস্থান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টকে কেন্দ্র করে তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ ও আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।
আগের হামলার প্রায় ১১ মাস পর গুলি করে হত্যা
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাটে চাপাতি দিয়ে সাংবাদিক আলিফের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার প্রায় ১১ মাস পর, ২০২৬ সালের ১৫ অক্টোবর রাতে তাঁকে গুলি করে হত্যার খবর সামনে আসে।

একই সাংবাদিকের ওপর আগের হামলার পর কী ধরনের আইনগত ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল কি না এবং আগের ঘটনার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া কতদূর এগিয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।

সাংবাদিকদের দাবি, আগের হামলার ঘটনা এবং বর্তমান হত্যাকাণ্ডের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা, নির্দেশদাতা কিংবা সহযোগী থাকলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার আসরের নামাজের পর নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় তাঁর গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানা গেছে।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা
বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ) এবং সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আহমেদ আবু জাফর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেছেন, সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

তিনি বলেন, একের পর এক সাংবাদিক হত্যাকাণ্ড এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি গোটা দেশের সাংবাদিক সমাজকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সাংবাদিকদের এখন আর নীরব থাকার সুযোগ নেই। একজন সাংবাদিককে হত্যা করা মানে শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নেওয়া নয়; এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং গণমাধ্যমের নিরাপত্তার ওপর গুরুতর আঘাত।

তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে। হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সংগঠনের পক্ষ থেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তদন্তে কার্যকর অগ্রগতি না এলে যেকোনো সময় কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।
সাংবাদিক শাফায়েত হোসেনের প্রতিবাদ ও কঠোর বার্তা
সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে রিপোর্টার শাফায়েত হোসেন বলেন, “আমরা সাংবাদিকরা দেশের মানুষের অধিকার, সত্য এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করি। অন্যায়, দুর্নীতি, মাদক ও অপরাধের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে যদি সাংবাদিকদের জীবন দিতে হয়, তাহলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একজন ছোট পত্রিকার সাংবাদিক কিংবা আইপি টিভিতে কর্মরত সাংবাদিকের জীবনের মূল্য কোনো অংশেই কম নয়। সাংবাদিক যে প্রতিষ্ঠানেরই হোন না কেন, তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

তিনি বলেন, আজ একজন মফস্বল সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন, আগামীকাল অন্য কোনো সাংবাদিকও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন। এভাবে কি সাংবাদিকদের কলম থামিয়ে দেওয়া হবে? সত্য প্রকাশের কারণে যদি সাংবাদিকদের জীবন দিতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথও বাধাগ্রস্ত হবে।

শাফায়েত হোসেন আরও বলেন, আমি দেশের সব টেলিভিশন চ্যানেল, জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকা, প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিক ভাইদের প্রতি আহ্বান জানাই,সাংবাদিক হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে সবাই ঐক্যবদ্ধ হোন। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। প্রয়োজনে কলম বিরতি, মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সমাবেশের মতো কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন,আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আমাদের বিনীত অনুরোধ, দ্রুততার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করুন। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ সুপার, সংশ্লিষ্ট থানা এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। তদন্তে কোনো গাফিলতি বা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে, সেটিও যথাযথভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

তিনি বলেন, আমি মোহাম্মদ শাফায়েত হোসেন, সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে যেখানে যাওয়া প্রয়োজন, সেখানে যাব এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি চাইব। তবে আমাদের সব পদক্ষেপ হবে তথ্য-প্রমাণ, পেশাগত নীতি এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে।

সাংবাদিক নেতাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার

সাংবাদিক শাফায়েত হোসেন বলেন, সাংবাদিকদের ন্যায়বিচার ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। সাংবাদিক অভিভাবক ও মফস্বল সাংবাদিকদের নেতা এস এম জাফরসহ সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকা এখন সময়ের দাবি।

তিনি বলেন, আমরা কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে চাই না। আমরা চাই, সাংবাদিকরা নিরাপদে তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করবেন। অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে।”

সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ৮ দফা দাবি

সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত দাবিগুলো উত্থাপন করা হয়েছে ,

১. হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজনদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে হবে।

২. ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর সাংবাদিক আলিফের ওপর হামলার ঘটনা পুনরায় পর্যালোচনা করে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্ত করতে হবে।

৩. হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা, নির্দেশদাতা ও সহযোগীদের পরিচয় শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

৪. নিহত সাংবাদিকের পরিবার, সহকর্মী এবং মামলার সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

৫. তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে সাংবাদিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে যথাসম্ভব নিয়মিত অবহিত করতে হবে এবং দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিলের উদ্যোগ নিতে হবে।

৬. তদন্তে কোনো গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

৭. সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং ঝুঁকিতে থাকা সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে।

৮. হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

বিচার না হলে দেশব্যাপী আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের দাবি, সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে আর কোনো কালক্ষেপণ গ্রহণযোগ্য নয়। তদন্তের আশ্বাস দেওয়ার পরও যদি অপরাধীরা বিচারের বাইরে থেকে যায়, তাহলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হবে।

দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্তে কার্যকর অগ্রগতি দৃশ্যমান না হলে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম এবং সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, বাংলাদেশের উদ্যোগে দেশব্যাপী সাংবাদিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে কলম বিরতি, মানববন্ধন, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, সমাবেশ, স্মারকলিপি প্রদান ও লংমার্চসহ ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণার কথা জানানো হয়েছে।

সাংবাদিক সমাজের প্রত্যাশা, সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো সাংবাদিককে যেন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন দিতে না হয়, সে জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

সাংবাদিক শাফায়েত হোসেনের আহ্বান,সাংবাদিক হত্যার বিচার চাই, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা চাই, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa