- - -

২১শে মার্চ-বিশ্ব কবিতা দিবস: কবিতার মন্দিরে হৃদয়ের আরাধনা

Print News

২১শে মার্চ-বিশ্ব কবিতা দিবস: কবিতার মন্দিরে হৃদয়ের আরাধনা

মো.কামাল উদ্দিন

আমি কবি নই। অসংখ্য কবিতা লিখলেও এখনো কবি হয়ে উঠতে পারিনি। তবুও যখন একা বসে থাকি, যখন কলমের কালিতে মনের গভীরতাকে প্রকাশ করতে চাই, তখন মনে হয়, আমি এক নিভৃতচারী কবি—যার প্রতিটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকে অনুভূতির স্পন্দন।
আমাকে অনেকেই সব্যসাচী লেখক বলেন—আমাদের দৈনিক ভোরের আওয়াজ পত্রিকার সম্পাদক আব্দুল আল মামুন কিংবা সাংবাদিক মামুন ঠাকুর প্রায়ই এ কথা বলেন। কেন বলেন, জানি না। তবে এটুকু জানি, কবিতার প্রতি আমার যে অপরিসীম ভালোবাসা, সেটিই হয়তো আমাকে এক অনুচ্চারিত কবির পরিচয় দেয়। আজ বিশ্ব কবিতা দিবস। কবিতার মহিমা উদযাপনের এই দিনে আমি ফিরে তাকাই নিজের লেখা কবিতার দিকে, অনুভব করি শব্দের সুরভি, ছন্দের আবেশ। কবিতা মানেই হৃদয়ের স্পন্দন, অনুভূতির প্রকাশ।
কবিতার ভাষায় জাগে প্রাণ
“কবিতার ভাষায় জাগে প্রাণ,
শব্দে বাঁধি স্বপ্নের গান।
কলম চলে, গল্প গড়ে,
বিশ্বজুড়ে কবির তরী ওড়ে!”
কবিতা কেবল শব্দের সমাহার নয়, এটি অন্তরের গোপন কথোপকথন। কবিতা হল দ্রোহ, প্রেম, যন্ত্রণা, আনন্দ—সকল আবেগের সম্মিলিত রূপ। বিশ্ব কবিতা দিবসে আমি স্মরণ করি সেই মহাকবিদের, যাঁরা কবিতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
বিশ্বের প্রথম কবি: এনহেদুয়ান্না
কবিতার ইতিহাস যদি খুঁজতে যাই, তবে প্রথম কবির নাম আসে—এনহেদুয়ান্না (Enheduanna)। তিনি ছিলেন সুমেরীয় রাজকন্যা, যিনি খ্রিস্টপূর্ব ২৩শ শতাব্দীতে মেসোপটেমিয়ার উর শহরে বসবাস করতেন।
এনহেদুয়ান্না শুধু প্রথম নারী কবিই নন, বরং ইতিহাসের প্রথম কবি, যার লেখা সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁর কবিতা দেবী ইনান্নাকে (যিনি প্রেম ও শক্তির দেবী) নিয়ে রচিত, যেখানে তিনি প্রেম, শক্তি ও আধ্যাত্মিকতার সুর মেলান।
‘ইনান্নার মহিমা’ কবিতার অনুবাদ
“হে ইনান্না, স্বর্গের মহীয়সী নারী,
তোমার জ্যোতি আচ্ছাদিত করে ধরিত্রী,
তোমার দৈব আদেশ আনয়ন করে জীবন ও মৃত্যু,
তোমার শক্তি প্রবল, প্রভাত তারা সমুজ্জ্বল!”
এই কবিতা প্রমাণ করে যে, মানুষের ভাবপ্রকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম কবিতা। সময় বদলেছে, সভ্যতা পাল্টেছে, কিন্তু কবিতার শক্তি আজও অটুট।
বিশ্ব কবিতা দিবস: কবিতার উৎসব-
২১ মার্চ বিশ্ব কবিতা দিবস। ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে ঘোষণা করে যে, এই দিনটি বিশ্বের কবিতাপ্রেমীদের জন্য উৎসর্গিত থাকবে। উদ্দেশ্য একটাই—”কাব্যিক প্রকাশের মাধ্যমে ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সংরক্ষণ করা এবং বিপন্ন ভাষাগুলিকে টিকিয়ে রাখা।”
এই দিনটি বিশ্বজুড়ে কবিতা পাঠ, লেখা, প্রকাশনা এবং শিক্ষাদানকে উৎসাহিত করার জন্য পালিত হয়। কবিতার শক্তি, ভাষার সুরক্ষা এবং সাহিত্যিক চেতনার বিস্তারের জন্য ইউনেস্কো এই দিবসটি প্রবর্তন করে।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে কবিতা দিবস উদযাপনের ধরণ আলাদা। যুক্তরাজ্যে অক্টোবরের প্রথম বৃহস্পতিবার, ভারতে ফেব্রুয়ারির শেষে, আবার কোনো কোনো দেশে নভেম্বরে কবিতা দিবস পালিত হয়।
নজরুল: বিদ্রোহ আর প্রেমের কবি-
বাংলার কবিতায় বিদ্রোহের এক অনন্য প্রতীক হলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি প্রেম, সাম্য, দ্রোহ—সবকিছুর কবি। তাঁর কবিতায় আগুনের দহনে জ্বলে ওঠে প্রতিবাদ, আবার কখনো তারই শব্দের ছন্দে ঝরে পড়ে প্রেমের মৃদু স্বরলিপি।
বিদ্রোহী কবিতার অংশ
“বল বীর—
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি, নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!”
এই কবিতার মধ্যে আছে দুর্দমনীয় এক বিদ্রোহ। যখন পৃথিবীতে শোষণ আর অবিচার বেড়ে চলে, তখন নজরুলের কবিতা যেন এক নতুন শক্তি এনে দেয়।
প্রেমের কবিতা: এক অন্যরকম স্পর্শ
“তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়,
সেই কি মোর অপরাধ?”
নজরুল প্রেমেরও কবি। তাঁর রচনাগুলো কখনো বিদ্রোহী, কখনো গভীর প্রেমময়। বিশ্ব কবিতা দিবসে তাঁর মতো মহাকবিকে স্মরণ করা মানে কবিতার চেতনাকে আরও গভীরে উপলব্ধি করা।
কবিতা: আমার আত্মার আরাধনা
আমার নিজের জীবনে কবিতার ভূমিকা অপরিসীম। আমি কবি না হলেও কবিতার কাছে ঋণী। যখন অন্যায় দেখি, যখন পৃথিবীর ভার বুকে চেপে বসে, তখন কবিতা আমার একমাত্র আশ্রয়।
আজকের দিনে আমি ফিরে দেখি সেই সমস্ত কবিদের, যাঁরা আমাদের জীবনকে কবিতার ছন্দে রাঙিয়ে তুলেছেন। তাঁদের জন্য, কবিতার জন্য, বিশ্ব কবিতা দিবসে আমি নিবেদন করি আমার একান্ত অনুভূতি:
“কবিতা শুধু শব্দ নয়,
এ হৃদয়ের গান,
প্রতিবাদের ভাষা,
ভালোবাসার আহ্বান।”
আসুন, কবিতার শক্তিকে ভালোবাসি, কবিতাকে বাঁচিয়ে রাখি। কারণ কবিতা কখনো মরে না, এটি মানুষের আত্মার প্রতিধ্বনি।
হে কবিতা, তুমি চিরজীবী হও!

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa