
সোনালি শীষে ভরা মাঠ, তবুও দুশ্চিন্তায় কৃষক
অনুকূল আবহাওয়া, সরকারি প্রণোদনা আর কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে মৌলভীবাজারের হাওর-সমতলে এবার আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। হেমন্তের মাঠজুড়ে এখন শুধুই সোনালি শীষের দোল। কিন্তু এই সোনালি হাসির আড়ালেই লুকিয়ে আছে উৎপাদন খরচ আর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার গভীর শঙ্কা।
সোমবার ( ২ নম্ববর) সরেজমিনে মৌলভীবাজারের খাইঞ্জার হাওড়পাড়ে গিয়ে দেখা যায় এক অপরূপ দৃশ্য। যতদূর চোখ যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে পাকা আমন ধানের সমারোহ। হেমন্তের হিমেল বাতাসে দুলছে থোকা থোকা সোনালি ধানের শীষ। এই দৃশ্য দেখে আনন্দে আত্মহারা কৃষকরা।
মাঠে এখন দম ফেলার ফুরসত নেই। কেউ কাস্তে হাতে সনাতন পদ্ধতিতে ধান কাটছেন, আবার কেউ আধুনিক কম্বাইন হারভেস্টারের সাহায্যে ঘণ্টায় বিঘার পর বিঘা জমির ধান কেটে, মাড়াই করে, বস্তাবন্দি করছেন। হারভেস্টারের বিকট শব্দ আর কৃষকের হাঁকডাকে মুখরিত পুরো হাওরাঞ্চল। শিশু থেকে বৃদ্ধ, সবাই নেমেছে মাঠে। নারীরাও পিছিয়ে নেই, তারা ব্যস্ত খড় শুকানো আর ধান ঝাড়ার কাজে।
মোস্তফাপুর ইউনিয়নের কৃষক শিমুল বলেন, এবার ৯ কিয়ার জমিতে আমন লাগাইছি। আল্লাহর রহমতে অন্য বছরের তুলনায় ফলন অনেক ভালো হইছে। মাঠের দিকে তাকাইলে মনটা ভইরা যায়।
এবারের এই বাম্পার ফলনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সরকারের বিনামূল্যে সার, বীজ বিতরণ এবং কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ে নিরলস উদ্বুদ্ধকরণ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে উচ্চফলনশীল উফশী ও হাইব্রিড জাতের আগাম আমনের ফলন আশাতীত হয়েছে।
কৃষি বিভাগ জানায়, এ বছর মৌলভীবাজারে ৯৯ হাজার ১৫৪ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। এসব জমি থেকে ২ লাখ ৯০ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৯৬ মেট্রিক টন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, এবার প্রাকৃতিক কোনো বড় দুর্যোগ হয়নি। আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। তার ওপর সরকারি সহায়তায় কৃষকরা উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করেছে। সময়মতো সার ও পরামর্শ পেয়েছে। ফলে ফলন বাম্পার হয়েছে।
আধুনিক কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহার এবার শ্রমিক সংকট অনেকটাই কমিয়েছে এবং ফসল দ্রুত ঘরে তুলতে সাহায্য করছে।
ফলন ভালো হলেও কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ। কারণ, ধান চাষের খরচ এবার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। সার, বীজ, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি— সবকিছুর দামই ঊর্ধ্বমুখী।
কৃষক এস এম উমেদ আলী বলেন, জমিতে হাইব্রিড জাতের ভালো ফলন হইছে। ধান কাটা শুরু করছি। কিন্তু এক কিয়ার জমিতে ১৫-১৬ হাজার টাকা খরচ হইছে। বাজারে যদি ১২০০-১৩০০ টাকার নিচে ধানের দাম থাকে, তাইলে আমরার লোকসান ছাড়া উপায় নাই।
আরেক কৃষক জানান, আমরা ফলন ফলাইতে পারি, কিন্তু দামটা আমরার হাতে নাই। মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে কিনে বেশি দামে বেচে। সরকার যদি সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনে, তবেই আমরা ন্যায্য দাম পাব।
চাষিদের আশঙ্কা, বাজারে ধানের সরবরাহ বাড়লে দাম আরও পড়ে যাবে। তখন বাম্পার ফলনও তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারবে না।
কৃষকের এই দুশ্চিন্তার কথা মাথায় রেখে মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন। মাঠে কৃষকদের ধান কাটতে উৎসাহ দিচ্ছেন জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল ও কৃষি কর্মকর্তারা। তারা বিভিন্ন হাওরে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলছেন, তাদের সমস্যা শুনছেন।
জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, কৃষকরা যাতে ধানের ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। আমরা ইতোমধ্যে খাদ্য বিভাগের সঙ্গে কথা বলেছি, যাতে সরকারি খাদ্য গুদামে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা হয়। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী যাতে কৃষককে ঠকাতে না পারে, সেজন্য বাজার মনিটরিং জোরদার করা হবে।
কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকেও কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, তারা যেন তাড়াহুড়ো করে কাঁচা ধান না কাটেন এবং সঠিকভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করেন, যাতে ভালো দাম পাওয়া যায়।
মৌলভীবাজারের এই সোনালি ফসল শুধু একটি জেলার নয়, পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য আশার আলো। এখন প্রয়োজন, এই ফসল যেন কৃষকের গোলায় হাসি হয়ে থাকে, বাজারের ফাঁদে পড়ে কান্না না হয়— সেটি নিশ্চিত করা। সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপই পারে এই বাম্পার ফলনকে প্রকৃত সাফল্যে রূপ দিতে।
![]()









