
সুফি আলহাজ হাফেজ ক্বারী মাওলানা সৈয়দ ফজলুর রহমান (ক.): দক্ষিণ চট্টগ্রামের এক উজ্জ্বল আধ্যাত্মিক দিশারী
————————————–
সোহেল মো. ফখরুদ-দীন
—————————————
আমার প্রিয় জন্মভূমি চন্দনাইশ উপজেলার
সাতবাড়ীয়া ইউনিয়নের গৌরবকুলের শ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ সুফি দার্শনিক আল্লামা হাফেজ কারী সৈয়দ ফজলুর রহমান ( ক.) দুনিয়া আখেরাতের সঠিক শিক্ষাদাতা জগৎগুরু পন্ডিতদের অন্যতম একজন । বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের সুফি সাধনা ও মরমীবাদের ধারায় যেসব আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ মানুষের অন্তর্জগতে আলোর সঞ্চার করেছেন, হযরত শাহসুফি আলহাজ হাফেজ ক্বারী মাওলানা সৈয়দ ফজলুর রহমান (ক.) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার সাতবাড়ীয়ায় অবস্থিত হাফেজ নগর দরবার শরীফকে কেন্দ্র করে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক অনন্য আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষা সংস্কারের আন্দোলন। তিনি মাইজভান্ডারি তরিকার প্রবাদপ্রতিম মহাপুরুষ সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারি ( ক.) এর মুরিদন ও খলিফা ছিলেন। তিনি শুধু একজন পীর বা আলেম ছিলেন না; বরং ছিলেন মরমী সাধক, তাসাউফের দার্শনিক, সমাজসংস্কারক এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত এক আদর্শ ব্যক্তিত্ব।
পবিত্র আহলে বাইতের বংশধর হিসেবে তাঁর ব্যক্তিত্বে জন্মগতভাবেই যুক্ত হয়েছিল আধ্যাত্মিক মর্যাদা।
শৈশবে হিফজুল কোরআন মুখস্ত কোরআনের হাফেজ। কোরান শিক্ষা সম্পন্ন করে ‘হাফেজ’ উপাধি অর্জন করেন এবং কিরআতে পারদর্শিতার কারণে ‘ক্বারী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। দাওরায়ে হাদিসসহ উচ্চতর ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তিনি শরীয়ত ও মারেফাতের সমন্বিত জ্ঞান অর্জন করেন।
তাঁর তাসাউফি সাধনার মূলভিত্তি ছিল ইখলাস, যিকির, মুরাকাবা, আত্মশুদ্ধি, সেমা ও সুন্নাহভিত্তিক জীবনযাপন। তাঁর খানকাহ ছিল আত্মিক পরিশুদ্ধির এক জীবন্ত শিক্ষাকেন্দ্র, যেখানে অসংখ্য মানুষ বাইআত গ্রহণ করে নৈতিক ও আদর্শ জীবন গঠনের দীক্ষা লাভ করেছেন। কাশফ ও কারামাতের বহু ঘটনা প্রচলিত থাকলেও তিনি সর্বদা আমল ও তাকওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতেন। সমগ্র বাংলাদেশ,ভারত, বার্মায় তাঁর লক্ষ লক্ষ মুরিদ ছিলো। আমি ছোট্ট বয়সে তাঁর ওরশ শরীফে গমনকৃত হাজার হাজার মরিদ বক্ত নর- নারীকে নগ্ন পায়ে মাইলের পর মাইল হেঠে মাজার শরীফে আসতে দেখেছি। তাঁর মাজার শরীফের পাশে হিন্দু বৌদ্ধধর্মের লোক সংখ্যা খুবই চোখের পড়ার মতো। হুজুর সকল ধর্মের মানুষের কাছে স্মরণীয়। পীর সাহেব হুজুর
সমাজসংস্কারেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। আক্বীদা সংশোধন, বিদ‘আত ও কুসংস্কার পরিহার, সুন্নাহর চর্চা এবং শিক্ষাবিস্তারে তিনি কাজ করেছেন নিরলসভাবে। মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি দ্বীনি শিক্ষা ও নৈতিকতার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর দরবারে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই সমান আশ্রয় পেত।
হাফেজ নগর দরবার শরীফ আজ দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর ওরশ, সেমা, জিকির-মাহফিলে থেকে আধ্যাত্মিক জাগরণ ছড়িয়ে পড়ে।
অসাধারণ বিনয়, আল্লাহভীতি, দুনিয়াবিমুখতা ও মানবপ্রেম ছিল তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তিনি সত্যিকার অর্থে ছিলেন “ মাম্বা-এ-ফুয়যাত” ও “মাসদারে কামালাত ”।
তাঁর ইন্তেকালের পরও তাঁর শিক্ষা ও তরীকা আজও সমাজে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে, তাঁর উত্তরসুরী পীর মশায়েখ ও বুজুর্গ বৃন্দ। বাংলাদেশের সুফি ইতিহাসে তাঁর নাম তাই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি হুজুর কেবলা সুফি হাফেজ কারী সৈয়দ ফজলুর রহমান ( ক.) এর ৯৩ তম পবিত্র বার্ষিক ওরশ শরীফ। দি একাডেমি অব হিস্ট্রি বাংলাদেশ ( ইতিহাসের পাঠশালা ) বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে তাঁকে।
—-
লেখক: সোহেল মো. ফখরুদ-দীন, সম্পাদক ও পরিচালক, দি একাডেমি অব হিস্ট্রি বাংলাদেশ ( ইতিহাসের পাঠশালা ) ।
![]()









