
বাবার স্মরণে প্রতিমাসের ৩০ তারিখ
চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস
আমার কষ্টের তারিখ,
আমার দুঃখের তারিখ,
প্রতিমাসের ত্রিশ তারিখ
এলে বুকে ওঠে ঝড়,
চোখের কোণে নামে নীরব ভোর।
বছরের কোনো একটি দিন নয়,
কোনো ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়,
বাবাকে হারানোর বেদনা
প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ, প্রতি নিঃশ্বাসে
নীরবে আমাকে ঘিরে রয়।
৩০ অক্টোবর ২০২২
যেদিন হারিয়েছি তোমায়, বাবা,
সেদিন থেকে ত্রিশ তারিখ মানেই
বুকের ভেতর হাহাকার,
মনজুড়ে অন্ধকার।
দিন শেষে যখন সন্ধ্যা নামে,
চারপাশ যখন নীরবতায় থামে,
তখন তোমার স্মৃতিগুলো
এক এক করে ফিরে আসে,
পুরোনো দিনের দরজায় কড়া নাড়ে।
বাবা, তুমি আমার হৃদয়জুড়ে,
তোমার স্মৃতি আমার জীবনজুড়ে।
ত্রিশ তারিখ এলেই কেন জানি
হৃদয়ের ভাষা হারিয়ে ফেলি,
কীভাবে বোঝাব সেই ব্যথা
তা আজও বুঝে উঠতে পারি না আমি।
তাই কলম তুলে নিই,
মনের কথাগুলো লিখে যাই,
প্রতিমাসের ত্রিশ তারিখে
গত এক মাসের গল্প বলি,
স্মৃতির পাতায় তোমাকে খুঁজি,
আর অশ্রুর ভেতর তোমায় আঁকি।
মানুষের শৈশব থেকে বর্তমান,
জীবনের প্রতিটি বাঁকে জমে থাকে কত স্মরণ।
কখনো হাসি, কখনো কান্না,
কখনো হারানোর বেদনা
সব মিলিয়েই তো জীবন নামের আয়োজন।
আজ আমি নিজেও একজন বাবা,
বাবা হওয়ার কর্তব্য পালন করি।
তখন বুঝি, বাবা হওয়া
শুধু একটি পরিচয় নয়
এ এক কঠিন দায়,
এ এক নীরব ত্যাগের মহাকাব্য,
যার প্রতিটি পৃষ্ঠা একজন বাবাই জানেন।
বাবাকে হারানোর কষ্ট
কথায় কি কখনো প্রকাশ হয়?
আমি যতটুকু লিখি,
যতটুকু বলি,
তা কেবল অনুভূতির সামান্য ছায়া,
অন্তরের পুরো ব্যথা নয়।
বাবা তো বটগাছের মতো,
পথিককে যেমন দেয় শীতল ছায়া,
তেমনি বাবা ছায়া হয়ে
আগলে রাখেন একটি পরিবার,
দুঃখের দিনে হন নির্ভরতার পাহাড়।
বাবার তুলনা হয় না,
বাবার শূন্যতা পূরণ হয় না।
বাবা, তুমি যেখানে আছো
ভালো থেকো, শান্তিতে থেকো,
আমাদের অদৃশ্য ছায়া হয়ে
নীরবে পাশে থেকো।
মা আজ অনেক কিছু ভুলে গেছে,
তোমার কথাও আর মনে রাখে না।
তোমার ছবি চোখের সামনে ধরলেও
কোনো পরিচয়ের ভাষা তার মুখে ফোটে না।
দিন দিন মা ভুলে যাচ্ছে সবাইকে,
তবুও কখনো ঘুমের ঘোরে
কিছু আপন মানুষের নাম উচ্চারণ করে।
সেই ডাক হয়তো পৌঁছে যায় না
যাদের উদ্দেশে সে ডাকে,
তবুও সেই ডাক শুনে
আমার বুকের ভেতর কেমন যেন লাগে।
আমি সৃষ্টিকর্তার প্রতি
কোনো আবেগ অনুভব করি না,
কারণ আমার কাছে
পিতা-মাতাই ছিলেন
দৃশ্যমান আশ্রয়,
জীবনের সবচেয়ে বড় প্রার্থনা।
তোমাদের পায়ে মাথা নত করি,
তোমাদের আশীর্বাদেই পথ চলি।
আমার কাছে বাবা-মা
শুধু সম্পর্ক নন
তাঁরাই আমার জীবনের
সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুরু,
সবচেয়ে পবিত্র স্থান।
বাবা, চলে যাওয়ার আগে
তুমি যে কথাগুলো বলেছিলে,
এক এক করে সেগুলোই
বাস্তব হয়ে এসেছে জীবনে।
মানুষের ভিড়ে, মানুষের ছদ্মবেশে
কত রাক্ষসের মুখ দেখেছি,
কত আঘাত সহ্য করেছি নীরবে।
আজও যারা আমাকে
ভেঙে দিতে চায়,
চূর্ণ করতে চায়,
তাদের মাঝেও আমি দাঁড়িয়ে আছি
তোমার আশীর্বাদকে বুকে নিয়ে,
তোমার স্বপ্নকে চোখে নিয়ে।
তুমি চলে যাওয়ার পরে
অনেক কিছুই অর্জন করেছি,
কিছু প্রাপ্তি এসেছে
অপ্রত্যাশিত পথ ধরে।
আমি জানি
এসবের পেছনে তোমার আশীর্বাদ আছে,
তোমার অদৃশ্য হাত আছে
আমার মাথার ওপরে।
আমি কখনো শ্রেষ্ঠ হতে চাই না,
কারও চেয়ে বড় হতে চাই না,
আমি শুধু সৃষ্টিশীল মানুষ হতে চাই।
আমার সন্তান আমাকে দেখে শিখুক,
আমার পরিবার আমাকে দেখে শিখুক,
আমার শিক্ষার্থীরা আমাকে দেখে শিখুক,
আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা কিছু ভালো গ্রহণ করুক
এই আমার চাওয়া,
এই আমার সাধনা,
এই আমার জীবনের প্রার্থনা।
আমি যেন মানুষের জন্য
কিছু রেখে যেতে পারি,
আমার কাজের ভেতর দিয়ে
কিছু ভালো কথা বলে যেতে পারি।
আমার জীবন যদি কারও
একটি ভালো পথের সন্ধান দেয়,
তবেই মনে করব
বাবার সন্তান হিসেবে
আমার পথচলা বৃথা যায়নি।
বাবা, প্রতি মাসের ত্রিশ তারিখে
তোমার কথা মনে পড়ে,
বুকের ভেতর নীরব কান্না ঝরে।
তুমি নেই
তবু তোমার ছায়া আছে,
তুমি দূরে
তবু হৃদয়ের খুব কাছে আছো।
ত্রিশ তারিখ তাই শুধু তারিখ নয়,
এ আমার স্মৃতির দরজা,
এ আমার অশ্রুর ভাষা,
এ আমার বাবাকে ফিরে পাওয়ার ক্ষণ,
এ আমার নীরব প্রার্থনার সন্ধ্যা।
বাবা, তুমি ভালো থেকো
যেখানে আছো, সেখানেই থেকো।
আমাদের ওপর আশীর্বাদের হাত রেখো,
আমাদের ভুল হলে ক্ষমা করো,
আর তোমার সন্তানকে
সৎ ও সৃষ্টিশীল থাকার শক্তি দিও।
প্রতিমাসের ত্রিশ তারিখে
আমি আবার তোমায় লিখব,
আবার তোমার স্মৃতির কাছে ফিরব
কারণ তুমি চলে গেলেও, বাবা,
আমার হৃদয় থেকে
কখনো চলে যাবে না তোমার ছায়া।
![]()









