
বাবার লাশ বাড়িতে রেখে পরীক্ষা দেওয়া আফিয়া মাসুমা পেল এ গ্রেড
এইচএসসি পরীক্ষার যখন ফেলের সংখ্যা বেশি, তখন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে পরীক্ষায় বসা বেনাপোলের আফিয়া মাসুমা এ গ্রেড পেয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। শোককে শক্তিতে পরিণত করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মাসুমার এই সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত রেজাল্টে দেখা যায় আফিয়া মাসুমা এ গ্রেডে পেয়েছে।
যশোরের শার্শা উপজেলার উপজেলা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় মাসুমা। মাসুমা বেনাপোল পোর্ট থানার নামাজগ্রামের মৃত আব্দুস সামাদের ছোট মেয়ে। মাসুমার বাবা আব্দুস সামাদ (৬৫) ছিলেন বেনাপোলের মেসার্স তাজমহল ট্রান্সপোর্ট ও হাজী মুছা করিম এন্ড সন্স এর সত্ত্বাধিকারী। তিনি একজন বিশিষ্ট আমদানিকারকও ছিলেন।
পরিবার ও কলেজ সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে স্টোক জনিত কারণে অসুস্থ্য হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান তার বাবা। রাতেই তার মরদেহ নিয়ে আসা হয় বাসায়। শোকে বিহ্বল স্বজনেরা নিচ্ছেন লাশ দাফনের প্রস্তুতি। এমন অবস্থায় বাবার লাশ বাড়িতে রেখে আফিয়া মাসুমা ২০১৬ সালের জুলাই মাসে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তার কেন্দ্র ছিল বেনাপোল কলেজে। পরীক্ষা শেষে বাড়িতে ফিরে বাবার লাশ দাফনে অংশ নেয় সে। বাবার মৃত্যুর পর মাসুমা ভেঙে পড়লেও স্বজনদের কথায় এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে যায় সে। তার পরীক্ষার কারণে মরদেহ দাফনের সময়ও বৃদ্ধি করা হয়। তাকে না দেখিয়ে যেন দাফন করা হয় সে কথাও সে বলে যায় সে। বাবা হারানোর শোক নিয়েই পরবর্তী পরীক্ষাগুলো শেষ করে মাসুমা।
পিতার লাশ বাড়িতে রেখে পরীক্ষার হলে বসা এবং পরবর্তীতে কৃতকার্য হওয়ার ঘটনাটি বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জীবনে ঘটা অত্যন্ত বাস্তব ও হৃদয়বিদারক একটি চিত্র। স্বজন হারানোর চরম শোক বুকে চেপে যখন কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে হাজির হয়, তখন তা শিক্ষার প্রতি তার অদম্য একাগ্রতা এবং মানসিক দৃঢ়তার এক অনুপম দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়। বেনাপোলের আফিয়া মাসুমা সেই দৃষ্টান্ত রাখলেন।
রেজাল্টের পর প্রতিক্রিয়ায় মাসুমা জানায়, বাবা সব সময় চাইতেন আমি ভালো ফল করি। পরীক্ষার সময় বাবাকে হারানো আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত ছিল। কিন্তু বাবার স্বপ্ন পূরণের কথা ভেবেই নিজেকে সামলে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। আমি আরো ভাল রেজাল্ট করতে পারতাম। পরীক্ষায় লিখতে গিয়ে বার বার মৃত বাবার মুখটা ভেসে আসছিল। বাবা বেঁচে থাকলে এ রেজাল্ট দেখে খুবই খুশি হতেন। সবার কাছে বাবার জন্য দোয়াও প্রার্থনার পাশাপাশি সে যেন আরো উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করে সকলের মুখ উজ¦ল করতে পারি সেই দোয়াও চেয়েছেন সে।
শার্শা উপজেলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. হাসানউজ্জামান জানান, মাসুমা শুরু থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। সে ভালো ফলাফল করবে এটা শিক্ষকরা প্রত্যাশা করতেন। পরীক্ষা চলাকালিন বাবার মরদেহ বাড়িতে রেখে পরীক্ষা দিয়ে সে আমাদের কলেজের সম্মান আরো উজ¦ল করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনের এত বড় শোককে জয় করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এবং এ গ্রেড অর্জন করা তার অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তার পরিচয়। তার রেজাল্ট এ আমরা সবাই খুশি। বাবার দুর্ঘটনাটি না ঘটলে সে জিপিএ-৫ পেতো। কলেজের শিক্ষকদের প্রত্যাশা মাসুমা ভবিষ্যতেও সাফল্যের স্বাক্ষর রাখবে।
শার্শা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাবাকে হারানো যে কারও জন্য খুবই কষ্টদায়ক। তারপরও এইচএসসি পরীক্ষার্থী মাসুমা বাবা হারানোর কষ্ট নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভাল ফলাফল করেছেন এটি খুবই খুশির সংবাদ। উপজেলা প্রশাসন এই মেধাবীর পাশে থাকবে। তার পরিবার যদি উচ্চশিক্ষার বিষয়ে সহযোগিতা চান তাহলে সর্বোচ্চ সহায়তা করা হবে।
![]()









