- - -

নির্লোভ নিরহংকার ও আদর্শিক চেতনার ধারক লায়ন্স এম শামসুল হক 

Print News

নির্লোভ নিরহংকার ও আদর্শিক চেতনার ধারক লায়ন্স এম শামসুল হক

আদর্শিক চেতনার ধারক ও বাতিঘর ছিলেন লায়ন শামসুল হক।স্বাধীনতা যুদ্ধে ও ৭৫ এর পরবর্তী তার অবদান অনস্বীকার্য।লায়ন শামসুল হক ছিলেন একজন আপদমস্তক রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক। তিনি ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে রাজনীতিতে পদায়ন করেন।পটিয়ার ঐতিহ্যেবাহী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মেধাবী,আদর্শিক,সাংগঠনিক দক্ষতা, সমাজসেবক ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে চট্রগ্রাম জেলায় একজন অকুতোভয় বীর ছিলেন।চট্রগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি,সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক,সাংগঠনিক সম্পাদক,সদস্য,পটিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি,জিরি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি,ফিরিঙ্গি বাজার ওয়ার্ড এর সাধারণ সম্পাদক ,চট্রগ্রাম জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য,কমার্স কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন।
১৯৪৮ সালে ১ জানুয়ারী চট্রগ্রাম জেলা পটিয়া উপজেলা জিরি ইউনিয়ন কৈয়গ্রাম গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম আহমদ হোসেন পোষ্টমাষ্টার ও মাতা মরহুমা চেমনা খাতুন।সরকারি মুসলিম হাই স্কুল থেকে এসএসসি, চট্রগ্রাম কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি,৬৮ সালে ডিগ্রি পাস করেন।পরে এলএলবি ভর্তি হয়ে শেষ করতে পারেননি।সরকারি মুসলিম হাই স্কুলে ১০ ম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন ৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন করতে পুলিশ কর্তৃক নির্যাতন কারাভোগ করেন এবং ২ টি মামলার আসামি হন। স্কুল ছাত্রলীগের মাধ্যমে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে প্রথমে কারাভোগ করেন।পরবর্তী চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হয়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের পুরোধা ছিলেন।ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধে তার অবদান অনস্বীকার্য। ৬৯ গণ আন্দোলনে তিনি অসীম সাহসীকার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিকর সংগঠনের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন।চট্রগ্রাম লায়ন্স ক্লাব ৩১৫ এর গর্ভনর,চট্রগ্রাম লায়ন্স ব্লাড ব্যাংকের চেয়ারম্যান, চট্রগ্রাম চেম্বার অ্যান্ড কমার্স ইন্ডাস্ট্রির সাব কমিটির কো-চেয়ারম্যান,চট্রগ্রাম ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়া পটিয়ায় স্কুল,কলেজ,ক্লাব ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার অবদান অতুলনীয়। আন্তর্জাতিক গর্ভণর হিসেবে একসেলেন্ট গর্ভণর এডওয়ার্ড পুরস্কার লাভ করেন।তিনি বহু সামাজিক,সাংস্কৃতিক ও ক্লাবের সাথে জড়িত ছিলেন।
তিনি ইউরোপ,যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই,হংকং,চীন,থাইল্যান্ড,
থাইল্যান্ড, ভারত,শ্রীলঙ্কা,বার্মা,নেপাল সহ বিভিন্ন
দেশ সফর করেন।
আওয়ামী রাজনীতির কঠিন দুঃসময়ের নেতা হিসেবে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বহু আন্দোলন সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে বহুবার জেল জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।৭৫ এর পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে চট্রগ্রামের মধ্যে একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে কাজ করেন।স্বৈরচ্চার জিয়া,এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে মাঠে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নির্যাতন ভোগ করেছেন। সেই দুঃসময়ে তার অবদান অনস্বীকার্য। পরিচ্ছন্ন, নিষ্টা ও সততার মুর্ত প্রতীক হিসেবে কাজ করেছেন।
আদর্শিক,মেধাবী,সৎ,পরিচ্ছন্ন চট্রগ্রামের যে ক’জন নেতার মধ্যে তিনি অন্যতম।নিজের পকেটের টাকা খরচ করে দলের দুঃসময়ে কাজ করেছেন এমনকি তার ফিরিঙ্গি বাজারের বাসা ছিল নেতাকর্মীদের আশ্রয়স্থল।
বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরে যখন কোন নেতারা রাজনীতি করতে বিমুখ ছিল সেই দুঃসময়ে তিনি সাহসীকতার সাথে পটিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে কর্মী বাহিনী যোগাড় করে দলকে উজ্জীবিত ও সুসংগঠিত করতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭ সালের দিকে কঠিন সময়ে পটিয়া কর্ত্তালাবেলখাইন মহাবোধি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আহবায়ক সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন,কেন্দ্রীয় নেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী,এস এম ইউসুফ,আতাউর রহমান খান কায়সার,পটিয়ার আহবায়ক সুলতান আহমদ কুসুমপুরী নেতৃত্বে সমাবেশে লোক সমাগমে ব্যার্থ হলে তিনি সুক্ষ বুদ্ধির মাধ্যমে নিজ ইউনিয়ন জিরি থেকে হাজার হাজার লোক দিয়ে সমাবেশ সার্থক করেন।
রাজনীতির সুবাদ পুরুষ লায়ন এম শামসুল হক ছিলেন সততার মুর্ত প্রতীক ও আদর্শিক চেতনার বাতিঘর। তিনি সব সময় নেতাকর্মীদের আদর্শ ও সততার রাজনীতির বাণী শুনাতেন।বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনার বাণী শুনাতেন।সাধারণ মানুষের মাঝে যাতে করে আমরা গিয়ে রাজনীতি করতে পারি তা তিনি বলতেন।সাধারণ জীবন যাপন করতে পছন্দ করতেন।নীতির প্রশ্নে কখনো আপোষ করেনি ও দলের সাথে কখনো বেঈমানী করেনি বিধায় জনপ্রতিনিধির তকমা তার গায়ে লাগাতে পারেনি যা রাজনীতির জন্য অশুভ সংকেত। তিনি কখনো প্রতিশোধের রাজনীতি পছন্দ করতেন না ও কারো বিরুদ্ধে করা পছন্দ করতেন না।সবার সাথে বন্ধুত্ত্ব ছিল তার স্বভাব। সকলের বন্ধু থাকতে পছন্দ করত।তার রাজনীতির হাতের খড়ি তার বড় ভাই ভাষাসৈনিক ড. মাহাফুজুল হক। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী,ভাষাসৈনিক,বাংলা প্রচলনের প্রতিষ্ঠাতা
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষ সমিতির সভাপতি।

লায়ন এম শামসুল হক ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পটিয়া সংসদীয় আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন অশুভ শক্তির নিকট পরাজিত হয়ে মাত্র ২ দিনের মাথায় পরিবর্তন করে দেয় কিন্তু তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে কাজ করেছেন।পরে ২০০৮ সালে তৃণমূলের ভোটের ১ম হয়ে পটিয়া আসন থেকে সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাচন বোর্ড এর তার নাম ১নং আসলেও
অশুভ শক্তি ও টাকার নিকট পরাজিত হয়ে দলচ্যুত এক ব্যক্তিকে দল মনোনয়ন দিলে অভিমান করে রাজনীতি সরে যায় লায়ন এম শামসুল হক। এরপরে ২০২২ সালে জেলা পরিষদের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন এর জন্য আবারো পুরোদমে রাজনীতির মাঠে প্রবেশ করলেও তার স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে রাজনীতির মাঠে ফিরে আসা হলো না লায়ন এম শামসুল হক সাহেবের।দীর্ঘদিন অসুস্থ হওয়ার পরে
২০২৩ সালে ১৯ জানুয়ারী চট্রগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে শেষ নিঃস্বার্থ ত্যাগ করেন রাজনীতির সুবাদ পুরুষ লায়ন এম শামসুল হক। চট্রগ্রাম লালদিঘি মাঠ ও পটিয়া উপজেলা এসএনুর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নামাজের জানাযা শেষে তার বড় ভাই ড. মাহাফুজুল হক ও পিতা-মাতার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়।
আজীবন মানুষের মনের কোঠায় তিনি একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক,আদর্শিক, পরিচ্ছন্ন,
মেধাবী, বঙ্গবন্ধু প্রেমিক,জনতার বন্ধু ও সমাজসেবক হিসেবে বেচে থাকবে।তার আদর্শ রাজনীতির মানুষ তাকে বাচিয়ে রাখবে চিরদিন। বর্তমান প্রজন্ম তার কর্ম ও চিন্তা নিয়ে এগিয়ে যাবে।তিনি মানুষের নিকট আজীবন চির অম্লান ও শ্রদ্ধার সাথে বেচে থাকবে।

লেখক – তসলিম উদ্দীন রানা
লেখক,গবেষক ও কলামিস্ট।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa