
নিম্নমানের সড়কের খবর করতে গিয়ে রক্তাক্ত সাংবাদিক : এমপির ভাইয়ের হামলায় বিএনপি-জামাতের ‘গণতন্ত্র’ উন্মোচিত
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে পৌর সড়কের নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে বাংলা টিভির উপজেলা প্রতিনিধি ও কুমারখালী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আহসান উল্লাসের ওপর হামলা হয়েছে। শনিবার দুপুরে কুন্ডুপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য আফজাল হোসেনের ভাই আনোয়ার ও তার দেহরক্ষী রুহুলের নেতৃত্বে একদল ব্যক্তি এই হামলা চালায়। আহত সাংবাদিককে কুমারখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
ঘটনার ধারাবাহিকতা লক্ষণীয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক ফারজানা আখতার জানিয়েছেন, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়ার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ বন্ধের চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এরপরও কাজ চলতে থাকায় তিনি নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ বন্ধ করেন। তিনি চলে আসার পরপরই সাংবাদিকের ওপর হামলা হয়। অর্থাৎ প্রশাসনিকভাবে কাজ বন্ধ হওয়ার পরও ঠিকাদার ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা বুঝিয়ে দিল, প্রশাসনের চিঠি তাদের কাছে ব্যবহৃত টিস্যু পেপারের মতোই। আর যে সাংবাদিক সেই অনিয়মের প্রমাণ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন, তাকেই শায়েস্তা করা হলো।
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিনের বক্তব্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক। তিনি বলছেন, সংবাদ সংগ্রহের সময় বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে, তবে সদস্যসংখ্যা কম থাকায় তা পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। এখানে প্রশ্ন হলো, একটি উপজেলা শহরে যেখানে এমপির ভাই ও তার দেহরক্ষী সংবাদকর্মীর ওপর প্রকাশ্যে হামলা চালাচ্ছে, সেখানে পুলিশের সদস্যসংখ্যা কম থাকার অজুহাত কতটা গ্রহণযোগ্য? আর যে ব্যক্তি এমপির ভাই, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও মামলা প্রক্রিয়াধীন রাখা ছাড়া তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন?
২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে সাংবাদিকের ওপর হামলা, পত্রিকা অফিস ভাঙচুর, সাংবাদিক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ছিল নিত্যদিনের। সেই সময়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে খবর করলেই সাংবাদিকদের কুপিয়ে জখম করা হতো। আজ ২০২৬ সালে বিএনপি আবারও ক্ষমতায়, আর সংসদে ক্ষমতার ভাগ বসিয়ে জামাতে ইসলাম। ফিরে এসেছে সেই চেনা দৃশ্যপট। ক্ষমতাধরদের অনিয়মের খবর করলেই সাংবাদিকের ওপর হামলা। কুষ্টিয়ার ঘটনা তারই স্পষ্ট নজির।
স্থানীয় সাংবাদিকরা হামলায় জড়িতদের পাশাপাশি এর নেপথ্যে কেউ থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু দাবি জানিয়েই কি হবে? ২০০১-০৬ সালে সাংবাদিকরা কতবার দাবি জানিয়েছেন, কতবার প্রতিবাদ করেছেন। ফলাফল কী? সেই সময়ে ক্ষমতাসীনরা সাংবাদিকদের ওপর হামলাকে প্রশ্রয় দিয়েছে, পুলিশকে দায় এড়াতে বাধ্য করেছে, আর বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করেছে। ২০২৬ সালে এসে সেই একই চিত্র। প্রশাসন কাজ বন্ধ করছে, কিন্তু ক্ষমতাধরদের চোখে সেটা কিছুই না। সাংবাদিক রক্তাক্ত হচ্ছেন, কিন্তু অপরাধীরা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
যে সাংবাদিক নিম্নমানের সড়ক নির্মাণের মতো জনগণের টাকার অপচয়ের খবর করবেন, তিনি যদি হাসপাতালে বেডে শুয়ে থাকেন, তাহলে ভবিষ্যতে কে কলম ধরবেন? কে প্রশ্ন করবেন এমপির ভাই কেন সড়কের ঠিকাদারিতে হাত দিয়েছেন? কে জানতে চাইবেন, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কেন কাজ চলছে? বিএনপি-জামাতের ২০২৬ সালের বাংলাদেশে সাংবাদিক মানে হয় প্রধানমন্ত্রীর লাঞ্চ বিলের খবর দেবেন, নইলে মন্ত্রীর ছেলের বিয়ের খরচ নিয়ে লিখবেন। আর যদি সাধারণ মানুষের ভাঙা রাস্তার খবর করতে যান, তাহলে ভাঙা হবেন নিজেই। কুষ্টিয়ার উল্লাস সেটাই প্রমাণ করলেন।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, বিএনপি-জামাতের শাসনব্যবস্থার ভিত্তি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নয়, বরং গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ। ২০০১-০৬ সালে তারা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়ে, মিথ্যা মামলা দিয়ে, জেলে পুরে গণমাধ্যমকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করেছিল। ২০২৬ সালে এসে তারা একই পথে হাঁটছে। কুষ্টিয়ার ঘটনা তারই সূচনা। প্রশাসন, পুলিশ, ক্ষমতাসীন দল সবাই মিলে সাংবাদিককে একা করে দিয়েছে। অথচ এই সাংবাদিকরাই জনগণের চোখ। তাদের ওপর হামলা মানে জনগণের চোখ উপড়ে ফেলা। আর যারা জনগণের চোখ উপড়ে ফেলে, তারা জনগণের শত্রু ছাড়া আর কিছু না।
![]()









