
ডেঙ্গু নিয়ে বিভ্রান্তি নয়, সঠিক তথ্য তুলে ধরুন: মেয়র শাহাদাত
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সঠিক তথ্য উপস্থাপন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেছেন, চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলার ডেঙ্গু আক্রান্তের তথ্য আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। তথ্যের বিভ্রান্তি তৈরি হলে প্রকৃত সংক্রমণ পরিস্থিতি আড়ালে থেকে যায় এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোও জবাবদিহির বাইরে থেকে যায়।
রোববার (১১ অক্টোবর) চট্টগ্রামের হোটেল পেনিনসুলার ডালিয়া হলে ‘ডিভিশনাল লেভেল ট্রেনিং অন ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অব ডেঙ্গু’ শীর্ষক বিভাগীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মেয়র বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করলেই হবে না, কোন এলাকায় সংক্রমণ বেশি, কোথায় মশার প্রজননস্থল রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ কী ভূমিকা পালন করছে, তা সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে। রোগীদের চিকিৎসার স্থান বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের আক্রান্ত হওয়ার এলাকা নির্ধারণ করলে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, “ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে সঠিক তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। তথ্যের বিভ্রান্তির কারণে যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেসব এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। তাই প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।”
চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলার রোগীরা নগরীর হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসেন উল্লেখ করে মেয়র বলেন, হাসপাতালে রোগী ভর্তি হলেই তাঁকে চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। নগরী ও উপজেলাভিত্তিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
সীতাকুণ্ডে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বারোপ
মেয়র তাঁর বক্তব্যে সীতাকুণ্ডসহ চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলার ডেঙ্গু পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু নগরকেন্দ্রিক কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি, সেসব এলাকায় স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি দাবি করেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নগরীর বাইরেও প্রয়োজন অনুযায়ী মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে লার্ভিসাইড প্রয়োগসহ সহযোগিতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
থেমে থেমে বৃষ্টি ও জমে থাকা পানিতে বাড়ছে ঝুঁকি
সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করে মেয়র বলেন, থেমে থেমে বৃষ্টিপাতের ফলে বিভিন্ন স্থানে স্বচ্ছ পানি জমে থাকছে। এসব পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি করছে। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিধনের পাশাপাশি জমে থাকা পানি অপসারণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, বাসাবাড়ির ছাদবাগানের টব, পরিত্যক্ত বোতল, পুরোনো টায়ার, ডাবের খোসা, নির্মাণাধীন ভবন এবং বিভিন্ন স্থাপনার আশপাশে জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবনে দীর্ঘদিন পানি জমিয়ে রাখা এবং হাসপাতালসহ জনবহুল এলাকায় ডাবের খোসা যত্রতত্র ফেলে রাখার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
মেয়র বলেন, “যেখানে পানি জমে থাকে, সেসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। কোনো পাত্রে বা স্থানে পানি জমে থাকলে তা দ্রুত অপসারণ করতে হবে। নাগরিকদের নিজেদের বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সবাই সচেতন হলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।”
তিনি আরও জানান, মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করছে। নির্মাণাধীন ভবনসহ যেসব স্থানে পানি জমিয়ে রাখা হচ্ছে, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানাও করা হচ্ছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু সিটি কর্পোরেশনের একার দায়িত্ব নয়। এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, আতঙ্ক বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে বাস্তব পরিস্থিতির ভিত্তিতে জনগণকে সচেতন করতে হবে। কোন এলাকায় কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।
মেয়র জানান, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বিনামূল্যে ডেঙ্গুর এনএস ওয়ান অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে বিনামূল্যে ডেঙ্গু সেন্টার চালুর কথাও উল্লেখ করেন তিনি। নগরবাসীর কাছে এসব সেবার তথ্য পৌঁছে দিতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন মেয়র।
জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান
ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি নিয়মিত হাসপাতাল পরিদর্শন ও চিকিৎসাসেবার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন বলেও জানান।
তিনি বলেন, জ্বর হলে অবহেলা করা যাবে না। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিরাপদ তরল গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে। রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি, রক্তক্ষরণ কিংবা অন্য কোনো বিপৎসংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। ডেঙ্গু রোগীর জটিলতা মোকাবিলায় যথাযথ পর্যবেক্ষণ ও তরল ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আনিসুল হোসেন, বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রাম শাখার সম্পাদক অধ্যাপক বেলায়েত হোসেন এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ফিল্ড অফিসের প্রধান মাধুরী ব্যানার্জি।
রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আয়োজনে, বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের সহযোগিতায় এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের সমর্থনে এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা, রোগীর জটিলতা শনাক্তকরণ এবং কার্যকর চিকিৎসার মাধ্যমে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু কমানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ক্যাপশন – চট্টগ্রামের হোটেল পেনিনসুলায় ‘ডিভিশনাল লেভেল ট্রেনিং অন ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অব ডেঙ্গু’ শীর্ষক বিভাগীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
![]()









