[bangla_day] - [english_date] - [bangla_date] - [hijri_date]

ট্রান্সফরমার চুরি: অন্ধকারে কারা, জবাবদিহিতে কারা?

ট্রান্সফরমার চুরি: অন্ধকারে কারা, জবাবদিহিতে কারা?

আবদুল্লাহ মজুমদার

অন্ধকারেরও একটা সীমা আছে। রাতের অন্ধকার স্বাভাবিক; কিন্তু মানুষের ঘরে যে অন্ধকার নেমে আসে, তার কারণ যদি হয় বিদ্যুতের অবকাঠামো চুরি, তাহলে সেটি আর স্বাভাবিক থাকে না। হাটহাজারীর ১০ নম্বর উত্তর মাদার্শার মানুষ এখন সেই অস্বাভাবিক অন্ধকারের মুখোমুখি। বিদ্যুতের খুঁটি আছে, তার আছে, বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকারও আছে—কিন্তু কোথাও কোথাও নেই ট্রান্সফরমার। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাত্র এক মাসে ৫–৬টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। সর্বশেষ ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রহমত আলী চৌধুরী মসজিদের খুঁটির ওপর স্থাপিত ট্রান্সফরমারটিও চুরি হয়েছে। ঘটনাটি সত্য হলে এটি শুধু চুরির ঘটনা নয়; এটি জনসেবা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। আর সেই প্রশ্নের কেন্দ্রে এখন একটাই কথা—একই এলাকায় বারবার ট্রান্সফরমার চুরি হওয়ার পরও নিরাপত্তাব্যবস্থা কোথায়?

সাংবাদিক জাহেদ মঞ্জুর একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে বিষয়টি সামনে এসেছে। তাঁর দেওয়া তথ্যে উত্তর মাদার্শায় এক মাসে ৫–৬টি ট্রান্সফরমার চুরির অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। সর্বশেষ মসজিদের খুঁটির ওপর স্থাপিত ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনাটিও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা যাচাই করা জরুরি। কিন্তু অভিযোগটি যদি সত্য হয়, তাহলে বিষয়টি নিয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের কোনো বিকল্প নেই।

কারণ, ট্রান্সফরমার চুরি কোনো সহজ কাজ নয়। এটি বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর স্থাপিত থাকে। খুলে নিতে কারিগরি জ্ঞান, সময় ও ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন। এরপর সেটি ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিতে পরিবহনেরও প্রয়োজন হয়। ফলে একটি ট্রান্সফরমার চুরি মানে একাধিক ধাপে একটি কাজ সম্পন্ন করা। আর একই এলাকায় যদি অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক ট্রান্সফরমার চুরি হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—ঘটনাগুলো কি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত?
চোরেরা কখন আসে? কীভাবে আসে? কীভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে? কীভাবে ট্রান্সফরমার খুলে নেয়? কীভাবে সেটি সরিয়ে নিয়ে যায়? ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা মানুষ কিছুই টের পান না কেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। তবে তার চেয়েও জরুরি আরেকটি প্রশ্ন—চুরি যাওয়া ট্রান্সফরমারগুলো যায় কোথায়?

চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩-এর নিজস্ব ওয়েবসাইটে উত্তর মাদার্শা অভিযোগ কেন্দ্রের যোগাযোগ নম্বর প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সংঘবদ্ধ একটি অসাধু চক্র চালু লাইন থেকে ট্রান্সফরমার, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও তার চুরির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। এ কারণে উত্তর মাদার্শার ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার আগে ধারাবাহিকতা ও সম্ভাব্য যোগসূত্র খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার—সন্দেহ আর প্রমাণ এক নয়। স্থানীয় মানুষের সন্দেহ থাকতে পারে, নানা কথাও ছড়াতে পারে; কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা যায় না। একইভাবে, প্রমাণের অভাবকে অজুহাত বানিয়ে তদন্ত থামিয়েও রাখা যায় না। দায়িত্বশীল তদন্তের কাজ হলো সন্দেহকে প্রমাণে রূপ দেওয়া অথবা সন্দেহকে ভুল প্রমাণ করা।

প্রতিটি ঘটনার সময়, স্থান ও পদ্ধতি বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। চুরির ধরনে কোনো মিল আছে কি না, ঘটনাস্থলের আশপাশে সন্দেহজনক ব্যক্তি বা যানবাহনের চলাচল ছিল কি না, চুরি করা সরঞ্জাম পরিবহনের সম্ভাব্য পথ কোনটি—এসব খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে চুরি যাওয়া ট্রান্সফরমারের যন্ত্রাংশ কোথায় যাচ্ছে, কোথাও সেগুলো ভাঙারি বা অন্য কোনো মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে কি না—সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত।

কারণ চুরি বন্ধ করতে হলে শুধু চোরের হাত ধরলে হবে না; চোরাই মালামালের বাজার ও সরবরাহপথও বন্ধ করতে হবে।
ট্রান্সফরমার চুরির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কে? সাধারণ মানুষ। চোর একটি যন্ত্র নিয়ে যায়; কিন্তু তার বিনিময়ে একটি এলাকার মানুষকে দিতে হয় দীর্ঘ বিদ্যুৎহীনতার মূল্য। দোকান বন্ধ থাকে, ছোট ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কৃষকের সেচব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন ঘটে। একটি ট্রান্সফরমার চুরির অর্থনৈতিক মূল্য যতটা, সামাজিক ভোগান্তির মূল্য অনেক সময় তার চেয়েও বেশি।
তাই ট্রান্সফরমার চুরিকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা, জনসেবা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতারও পরীক্ষা।

উত্তর মাদার্শার অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে। এক মাসে কতটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে? প্রতিটি ঘটনায় মামলা বা সাধারণ ডায়েরি হয়েছে কি না? কোনো ট্রান্সফরমার উদ্ধার হয়েছে কি না? কাউকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না? চুরি যাওয়া সরঞ্জামের কোনো অংশ উদ্ধার হয়েছে কি না? আর একই এলাকায় বারবার চুরির পর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু উত্তর মাদার্শার মানুষের জন্য নয়; বিদ্যুৎ সেবার সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়। আধুনিক জীবনে এটি মৌলিক নাগরিক সেবার অংশ। সেই সেবার অবকাঠামো যদি বারবার চুরি হয়, তাহলে প্রতিটি ঘটনায় শুধু নতুন যন্ত্র বসিয়ে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। কোথায় দুর্বলতা আছে, কেন একই এলাকায় বারবার ঘটনা ঘটছে, কোথায় নজরদারি বাড়ানো দরকার—এসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। যেসব এলাকায় চুরির ঝুঁকি বেশি, সেখানে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা, রাতের নজরদারি বাড়ানো, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সমন্বয় জোরদার করা যেতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির সুযোগ থাকলে সেটিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যেন আরেক ধরনের অন্যায় না ঘটে, সেটিও মনে রাখতে হবে। সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে হয়রানি করা যাবে না। কোনো ভাঙারি ব্যবসায়ী, স্থানীয় বাসিন্দা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। অপরাধীকে শনাক্ত করা যেমন জরুরি, তেমনি নিরপরাধ মানুষের অধিকার রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

উত্তর মাদার্শার ঘটনাটি তাই একটি এলাকার কয়েকটি ট্রান্সফরমার চুরির অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে—জনগণের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কতটা নিরাপদ?
একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির মাথায় ট্রান্সফরমার বসানো হয় মানুষের ঘরে আলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য। কিন্তু সেই ট্রান্সফরমার যদি রাতের আঁধারে খুলে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে অন্ধকার শুধু ঘরে নামে না; প্রশ্নও নামে ব্যবস্থার ওপর। সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই।

উত্তর মাদার্শার মানুষ কারও বিরুদ্ধে প্রমাণহীন অভিযোগ চান না। তারা চান না নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার হোক। তারা শুধু চান—তাদের বিদ্যুৎ নিরাপদ থাকুক, চুরি হলে তদন্ত হোক, চোরাই মালামালের পথ বন্ধ হোক এবং একই ঘটনা বারবার না ঘটুক।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি খুব সরল। একটি ট্রান্সফরমার চুরি হলে একটি খুঁটি অন্ধকার হয়; বারবার ট্রান্সফরমার চুরি হলে অন্ধকার নামে মানুষের আস্থায়। সেই আস্থার আলো ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু চোর ধরলেই হবে না—চুরির কারণ, পথ, বাজার এবং নিরাপত্তার দুর্বলতাও চিহ্নিত করতে হবে। উত্তর মাদার্শার মানুষ এখন শুধু নতুন ট্রান্সফরমার নয়, এমন একটি নিরাপত্তাব্যবস্থা চান, যেখানে রাতের আঁধার আর কারও ঘরের আলো কেড়ে নিতে না পারে।

লেখক: সাহিত্য ও মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn