
আদর্শবান নেতা সেকান্দার হায়াত খান
কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি
নাসিরুদ্দিন চৌধুরী
বাংলাদেশের স্বাধীনতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অবদান অনেকখানি, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ছুটি ঘটনা হলো বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা এবং স্বাধীন বাংলা বেতার। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে অর্থাৎ মধ্য রাতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করে আর স্বাধীন বাঙলা বেতারও চালু করা হয়ে ২৬ মার্চ দ্বিপ্রহরে এবং জাতিকে উক্ত বেতার থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার সংবাদ দেন তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান তিনি বেতার থেকে ঘোষণাটি সকালে পাঠও করেন।
বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার প্রচারের প্রয়োজনেই স্বাধীন বাংলা বেতার চালু করেছিলেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকমর্রিা। ৮ম বেঙ্গলের ইআইসি মেজর জিয়াউর রহমান ঘোষণা পাঠ করেন ২৭ মার্চ। আমাদের বর্তমান আলোচনায় জন্য এ তথ্যটুকুই প্রয়োজন। আর হাঁ যে স্থানে বেতার কেন্দ্রটি চালু করা হয়েছিলো। সে স্থানের নাম চান্দগাঁও, বহরদরহাটও নয়, কালুরঘাটও নয়।
সেকান্দর হায়াত খানের জন্ম ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি; তাঁর পিতার নাম ছালেহ আহমদ খান, মাতা বেগম আছিয়া খাতুন। তাঁর পিতা ছালেহ আহমদ খান তৎকালীন মোহরা ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ও চট্টগ্রাম জুরী কাউন্সিল বোর্ডের সদস্য এবং তৎকালীন বৃহত্তম পাঁচলাইশ থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। সভাপতি থাকাকালে সময়ে মোহরা এ এল খান হাইস্কুল মাঠে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বিশাল সংবর্ধনা দিয়েছিলেন।
সেকান্দর হায়াত খান ও তার ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন-অর-রশিদ খান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। দুই ছেলে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করাতে সালেহ আহমদ খান পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হন।
সেন্ট্রাল মোহরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সেকান্দর হায়াত খানের শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। সেখান থেকে প্রাইমারি পাস করে মোহরা এ এল খান উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি এবং কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ সরকারী (ডিগ্রি) কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে চট্টগ্রাম সরকারী সিটি কলেজে ভর্তি হন। সিটি কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন এবং সিটি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে বি.এ পাস করেন।
তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সময় ছিল ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দেঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন ’৬৮ খ্রিস্টাব্দে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন ও ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা বলতে গেলে প্রথমে উল্লেখ করতে হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপনের কথা। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য গৌরবদীপ্ত নাম চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র।
মুক্তিকামী বাঙালির কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার ঘোষণাটি উচ্চারিত হয়েছিল এ বেতার কেন্দ্র থেকেই। নয় মাস মুক্তিযুদ্ধকালে এই কেন্দ্রের অংশ বিশেষ নিয়েই গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র স্থাপয়িতাদের মধ্যে একটি অপরিহার্য নাম হলেন সে সময়ের কালুরঘাট এলাকার সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক ও আওয়ামী লীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা সেকান্দর হায়াত খান।
তিনি হানাদারদের সম্ভাব্য হামলার আশংকায় কালুরঘাট ট্রান্সমিটার থেকে ১ কিলোওয়াট বিশিষ্ট একটি ট্রান্সমিটার কেন্দ্রের দেয়াল ভেঙ্গে বের করে এনে একটি ট্রাকে তুলে একে ভ্রাম্যমাণ কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন; পরবর্তীকালে তা প্রথমে পটিয়া তারপর রামগড় হয়ে মুক্তাঞ্চলে নিয়ে যান। সাথে ছিলেন বেলাল মোহাম্মদদের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের কর্মীগণ, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস্ এর সৈনিক ও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী। এর মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান বিক্ষিপ্তভাবে প্রচার করা হয়েছিল। ’৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিরোধ পর্বে মেজর জিয়াউর রহমান বেশ কয়েকদিন তাঁর বাসভবনে অবস্থান করে মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন।
দেশকে রক্ষার শপথ নিয়ে সেকান্দর হায়াত খান দেশ থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বিতাড়িত করার জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য পায়ে হেঁটে ফটিকছড়ি দিয়ে রামগড় হয়ে ভারতে যান। ভারতে হরিণা ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে চট্টগ্রাম এসে সক্রিয় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি তৎকালীন পাঁচলাইশ থানা মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্বপালনকালে তিনি হাতে গুলিবিদ্ধ হন।
১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে দেশ গড়ার ও সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার ব্রত নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেন। প্রথমে থানা আওয়ামী লীগ এবং পরবর্তীকালে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারবর্গ দুষ্কৃতকারীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর তিনি চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের হাল ধরে রাখেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিজে এসে অনেক প্রলোভন দেখানো সত্ত্বেও তিনি দল ছেড়ে যান নি। এমন কি তাকে মন্ত্রিত্বের লোভও দেখানো হয়েছিল, শুধু শর্ত ছিল দল ত্যাগ করার। কিন্তু তিনি কখনো নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে আপোষ করেন নি।
তখন তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়াকে বলেছিলেন, ‘‘বাংলাদেশে দল ত্যাগ করে অন্যদলের মন্ত্রী হওয়ার চেয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সদস্য হওয়া অনেক গৌরবের।’’ তিনি ঘৃণাভরে জিয়াউর রহমান সরকারের মন্ত্রিত্বের লোভ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিনি ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন মোহরা ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বিপুল ভোটের ব্যবধানে। চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় এলাকার তিনি প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। তিনি রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ মোহরা ওয়ার্ড কার্যালয় সংলগ্ন মোহরা ওয়ার্ড মিলনায়তন তিনি প্রতিষ্ঠান করেন যে প্রতিষ্ঠান সেটি বর্তমানে মোহরা মাতৃসদন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তিনি এলাকায় বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মসজিদ নির্মাণের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন তিনি মোহরা জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মোহরায় মাতৃসদন নির্মাণের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে জায়গা দান করে ছালে আহমদ খান মাতৃসদন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ চট্টগ্রাম শাখা প্রতিষ্ঠার জন্য জায়গা দান করেন। তিনি প্রবীণ হিতৈষী সংঘ চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এছাড়াও প্রবীণদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধপত্র দেওয়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করেন তিনি।
এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য অনেক জেল জুলুম অত্যাচার সহ্য করেন। তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম লালদীঘি মাঠে ২৪ জানুয়ারি ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে শেখ হাসিনার জনসভায় নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয়। তখন তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এবং নির্যাতনের শিকার হন। পুলিশ তাকে রাইফেলের বাট ও লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করে। তাঁকে টেনে হিঁচড়ে পুলিশ হেড কোয়ার্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি অনেক নির্যাতন ভোগ করার পরও কখনও দলীয় আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। এক কথায় তিনি কখনও অন্যায়ের সাথে আপস করেননি।
জীবনে কখনও অর্থ বিত্তের জন্য নিজের নীতি ও আদর্শকে বিসর্জন দেননি। তিনি কখনও দুর্নীতির সাথে আপস করেননি। যদি আপস করতেন আজ প্রচুর অর্থ বিত্তের মালিক হতে পারতেন। এই জন্য তাঁর মনে কখনও ক্ষোভ বা হতাশা ছিল না । তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সব সময় আপসহীন সৈনিক। তার প্রমাণ ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁহার মালিকানাধীন সিটিকম এয়ারকন্ডিশন বাস উদ্বোধনের সময় সন্ত্রাসীরা চাঁদা দাবি করতে গেলে চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় দামপাড়া জিইসি মোড়ে সন্ত্রাসীরা তাঁকে গুলি করে মারাত্মকভাবে জখম করে।
ব্যক্তিগত জীবনে সেকান্দর হায়াত খান দুই পুত্র ও দুই কন্যা সন্তানের জনক। তার বড় ছেলে খালেদ হোসেন মাসুক চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজে ১৯৯৭-১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে সংসদের জিএস ছিলেন। সেকান্দর হায়াত খানের সহধর্মিণী জোবাইরা নার্গিস খান একজন সুগৃহিণী ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের তিনবার বিপুল ভোটে নির্বাচিত মহিলা কমিশনার। এছাড়াও তিনি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে দুইবার সফলতার সহিত দায়িত্ব পালন করেন।
![]()









