- - -

শাজনীন হত্যা মামলা: ১৯ বছরের বিচারপ্রক্রিয়া কী প্রশ্ন তোলে

Print News

শাজনীন হত্যা মামলা: ১৯ বছরের বিচারপ্রক্রিয়া কী প্রশ্ন তোলে

আবদুল্লাহ মজুমদার

IMG 20260530 WA0008 233x300কোনো সমাজে ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা গড়ে ওঠে তখনই, যখন অপরাধের বিচার শুধু সঠিকভাবে নয়, সময়মতোও সম্পন্ন হয়। বিচারপ্রক্রিয়া যদি বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে, তবে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ক্ষুণ্ন হয়। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিচার বিলম্ব। শাজনীন তাসনিম রহমান হত্যা মামলা সেই বাস্তবতার একটি আলোচিত ও বেদনাদায়ক উদাহরণ।
১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল ঢাকায় নিজ বাসভবনে নিহত হন ১৫ বছর বয়সী শাজনীন তাসনিম রহমান। তিনি স্কলাস্টিকা স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী এবং দেশের অন্যতম শিল্পগোষ্ঠী ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা লতিফুর রহমানের কন্যা ছিলেন। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় উঠে আসে, তাঁকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং দ্রুত বিচারের দাবি ওঠে সর্বস্তর থেকে।

মামলার বিচার শেষে ২০০৩ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আদালত ছয় আসামির প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দেন। কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়া সেখানেই শেষ হয়নি। আপিল ও অন্যান্য আইনি ধাপ অতিক্রম করতে করতে মামলাটি আরও দীর্ঘায়িত হয়। পরবর্তীতে ছয় আসামির মধ্যে পাঁচজন খালাস পান। শেষ পর্যন্ত একজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে এবং ২০১৭ সালে তা কার্যকর করা হয়। অর্থাৎ, বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ১৯ বছর।

এখানে প্রশ্নটি কোনো আদালতের রায় নিয়ে নয়। আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত দেন। তবে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। একটি হত্যা মামলার নিষ্পত্তিতে প্রায় দুই দশক সময় লাগা কোনো কার্যকর বিচারব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। বিশেষত যখন মামলাটি জাতীয়ভাবে আলোচিত এবং রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের মনোযোগ আকর্ষণকারী একটি ঘটনা।

শাজনীন হত্যা মামলার গুরুত্ব আরও একটি কারণে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। নিহতের পরিবার ছিল দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ও প্রতিষ্ঠিত পরিবার। দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ, আইনি সহায়তা গ্রহণ এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে অনুসরণ করার সক্ষমতা তাদের ছিল। তারপরও যদি চূড়ান্ত বিচার পেতে ১৯ বছর অপেক্ষা করতে হয়, তবে সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে সেই পথ কতটা দীর্ঘ ও কষ্টকর হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

বাংলাদেশে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও হত্যার অসংখ্য মামলা বছরের পর বছর বিচারাধীন থাকে। মামলাজট, তদন্তের দুর্বলতা, সাক্ষী হাজিরে জটিলতা, বারবার শুনানি পেছানো এবং বিচারিক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ হয়ে যায়। এতে একদিকে ভুক্তভোগী পরিবার হতাশায় নিমজ্জিত হয়, অন্যদিকে অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বিচার বিলম্বিত হলে সমাজে এমন ধারণা জন্ম নিতে পারে যে, অপরাধ করেও শেষ পর্যন্ত শাস্তি এড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

অবশ্য দ্রুত বিচারের নামে ন্যায়বিচারের মান বিসর্জন দেওয়ার সুযোগ নেই। আইনের শাসনের অন্যতম শর্ত হলো, প্রতিটি অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু ন্যায়বিচার ও দীর্ঘসূত্রতা এক বিষয় নয়। দক্ষ তদন্ত, আধুনিক ফরেনসিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিচারিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দ্রুত ও নির্ভুল বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব।

বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থা সংস্কারের আলোচনা নতুন নয়। কিন্তু সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় তখনই, যখন একটি বহুল আলোচিত মামলার নিষ্পত্তিতেই প্রায় দুই দশক লেগে যায়। শাজনীন হত্যা মামলা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বিচারব্যবস্থার সাফল্য শুধু রায় প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সময়োপযোগী, কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করার মধ্যেই তার প্রকৃত শক্তি নিহিত।

উপসংহার : একটি রাষ্ট্রের নাগরিকেরা আদালতের কাছে প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। সেই ন্যায়বিচার যদি প্রজন্ম পেরিয়ে আসে, তবে তার সামাজিক মূল্য অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। শাজনীন হত্যা মামলার শিক্ষা তাই স্পষ্ট—বিচারব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও সময়োপযোগী করার কোনো বিকল্প নেই। কারণ বিচার বিলম্বিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি পরিবার নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা, আইনের শাসনের ভিত্তি এবং ন্যায়বিচারের প্রতি সমাজের বিশ্বাস।

লেখক: সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa