
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ইসলামের নির্দেশনা
।। গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির।।
বর্তমান সময়ে দেশব্যাপী সবচেয়ে বড় আতংকের নাম ডেঙ্গু। এটি একটা জীবাণুবাহী মশা। এ মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ানো একটা ভাইরাস জনিত জ্বর বা রোগের নাম- ডেঙ্গু। ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এ জীবাণু। ডেঙ্গুর প্রকোপ অন্য যেকোন বছরের তুলনায় এ বছরে অনেকটা বেশি। হাসপাতালগুলোতে কয়েক হাজার রোগী ভর্তি আছে। মারাও গিয়েছে বেশ কয়েকজন। শিশু, ছাত্র, শিক্ষক, ব্যাংকার, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তারসহ বিভিন্ন শ্রেণী, পেশার মানুষ এ জীবাণুতে আক্রান্ত। প্রতিনিয়ত নতুন ভাবে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে। সেবাদানে হাসপাতালের ডাক্তার-নার্সরা হিমশিম খাচ্ছেন। প্রশাসনিকভাবে মশা মারার কাজ চলছে। দিন যত যাচ্ছে আতঙ্ক তত বেড়েই চলছে।।
মহান আল্লাহপাকের অসংখ্য সৃষ্টি জীবের একটি হলো এ ছোট্ট মশা। আল্লাহপাক কোরআনে এ ছোট মশাকে উপমা হিসেবে পেশ করেছেন। যারা মুমিন তারা মহান পালনকর্তার উপমাকে সঠিক ও নির্ভুল হিসেবে বিশ্বাস করেন। আর অবিশ্বাসীরা এ উপমা উপস্থাপনে আল্লাহর ইচ্ছা খুজে পায় না। এ প্রসঙ্গে এরশাদ হচ্ছে-” নিঃসন্দেহে আল্লাহপাক মশা বা তদূর্ধ্ব বস্তু দ্বারা উপমা পেশ করতে লজ্জাবোধ করেন না। বস্তুতঃ যারা মুমিন তারা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করে যে, তাদের পালনকর্তা
কর্তৃক উপস্থাপিত এ উপমা সম্পূর্ণ নির্ভুল ও সঠিক। আর যারা কাফের তারা বলে, এরূপ উপমা উপস্থাপনে আল্লাহর মতলবই বা কি ছিল। এ দ্বারা আল্লাহ তায়ালা অনেককে বিপথগামী করেন, আবার অনেককে সঠিক পথও প্রদর্শন করেন। তিনি অনুরূপ উপমা দ্বারা অসৎ ব্যক্তিবর্গ ভিন্ন কাউকে বিপথগামী করেন না।” (সূরা বাকারা-২৬)। মশা যে কত ভয়ানক তা আমরা ইতিহাসের সত্য ঘটনা থেকে জানতে পারি। নমরূদের অনুসারীরা প্রতিনিয়ত প্রতিমা পূজা করত। হযরত ইব্রাহিম (আ) প্রতিমা পূজা অস্বীকার করেন এবং প্রতিমাগুলো ভেংগে ফেলেছিলেন। এ কারণে নমরুদের আদেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.) কে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। নমরুদ নিজেকে খোদা দাবী করে এবং ইব্রাহিম (আ.) যে মহান আল্লাহর ইবাদত বন্দেগি করেন তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। নমরুদ ও তার বাহিনী মহান আল্লাহকে মারার জন্য আকাশে তীর নিক্ষেপ করেন। আল্লাহপাক সামান্য এ মশাবাহিনী দিয়ে নমরুদ ও তার বাহিনীকে শায়েস্তা করেন। একটি মশা নমরুদের নাকে প্রবেশ করে মস্তিষ্কে কামড় দিতে থাকে, যন্ত্রনা নিরসন করতে পাদুকা দিয়ে বার বার মাথায় আঘাত করা হয়। আবারও মশা বেশি মাত্রায় কামড়াতে থাকলে আঘাত করতে করতে সেচ্ছাচারী অবিশ্বাসী কাফের সামান্য এ মশার কামড়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
আমরা ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য ব্যক্তিগত সিকিউরিটি বাড়াই। কিন্তু মশা এমন এক ভয়াবহ জীব যা থেকে কোন প্রকার সিকিউরিটির মাধ্যমে রক্ষা পাওয়ার সহজ উপায় নেই। মাত্র এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের একটি মশার কামড়ই হতে পারে মৃত্যুর কারণ। মহান আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকেন। মানবকল্যাণের একমাত্র দিশারী মহাগ্রন্থ কোরআন মজীদে এ মর্মে বলা হয়েছে-“আর আল্লাহ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন লোকদের ভালোবাসেন।” (সূরা আত-তাওবাহ্-১০৮)।
হাদিসেও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কথা বলা হয়েছে- হযরত আবু মালেক আশয়ারী (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন-“পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক।” (মুসলিম)।
কোরআন কারিম ও রাসুল (সা.) এর হাদিস অনুসরণ করে আমরা প্রত্যেকে সচেতনতার সাথে আমাদের আবাসস্থল, কর্মক্ষেত্র, অফিসকক্ষ, চলারপথ এবং আশপাশের ময়লা আবর্জনা, জমে থাকা পানি প্রতি নিয়ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখলে যেমন ইসলামের নির্দেশিত পথে পরিচালিত হতে পারব, ঠিক তেমনি এ জীবাণুবাহী মশার আক্রমণ থেকে বাঁচতে পারবো। চারপাশের পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। এটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ইসলামে যেভাবে বাহ্যিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কথা বলা হয়েছে ঠিক তেমনি আত্মার পরিশুদ্ধতার কথাও বলা হয়েছে-“যে নিজকে শুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয় এবং যে নিজকে কুলষিত করে, সে ব্যর্থ মনোরথ হয়।” (সূরা আশ-শামস-৯-১০)।
এডিস মশা বা ডেঙ্গু জীবাণুবাহী মশা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালগুলোতে যারা ভর্তি আছেন তাদের জন্য পর্যাপ্ত রক্তের ব্যবস্থা করা আমাদের দায়িত্ব। রোগীর সেবায় আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। সেবার ব্যাপারে হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে-“কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন-হে আদম সন্তান আমি অসুস্থ হয়েছিলাম! কিন্তু তুমি আমাকে দেখতে যাওনি। বান্দা বলবে আপনি তো বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক, আমি আপনাকে কীভাবে দেখতে পারি! আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল। তুমি তাকে দেখতে গেলে আমাকে পেতে।” (মুসলিম)।
ডেঙ্গু জীবাণুবাহী মশার ব্যাপারে দেশের গণমানুষকে সচেতন করতে হবে। ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা আরো বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে মসজিদের ঈমাম সাহেবগণ বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্ররা সচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারেন। কবি-সাহিত্যিক ও সাংবাদিকবৃন্দ মিডিয়ার মাধ্যমে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রশাসনিক ভাবে বছরব্যাপী মশা নিধনের কাজ চালানো যেতে পারে। আমাদের পার্শ্ববর্তী শহরগুলো বিশেষ করে কলকতা, চিন ও বেইজিং যে পদ্ধতিতে সফল হয়েছেন সেগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে। যারা অসুস্থ আছেন তাদের শুশ্রুষার পাশাপাশি সুস্থতার জন্যে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে। সুস্থ শরীর ও উন্নত জীবনের জন্য পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি বাড়াতে হবে ভালো কাজের প্রতিযোগিতা। তবেই, মানুষ ও মানবতার জয় হবে, ইনশাআল্লাহ।
লেখক: গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির, সাংবাদিক, ধর্ম ও সমাজ বিশ্লেষক, সাংবাদিক, চেয়ারম্যান- গাউছিয়া ইসলামিক মিশন, শূরা সদস্য, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও সিনিয়র সহ সভাপতি – বুড়িচং প্রেস ক্লাব, কুমিল্লা। ০১৭১৮২২৮৪৪৬
![]()









