- - -

শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ হলেন

Print News

শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ হলেন

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের জাতির পিতা, আমাদের জাতিরাষ্ট্রের উদগাতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থ্পতি। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে একমাত্র তিনিই বাঙালিকে জাতিপরিচিতি দান করেছেন। সেজন্য তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। গোটা পাকিস্তানি জমানায় বিভিন্ন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি বাঙালি জাতিসত্তাকে জাগ্রত ও বিকশিত করেছেন এবং বিকাশের ধাপে ধাপে জাতিসত্তাকে নির্মাণ করেছেন।
৭১-এর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করার আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাঙালি জাতি নয়মাস মরণপণ মুক্তিযুদ্ধ করে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে এবং আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। ৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে। সুতরাং সমগ্র বাংলাদেশ সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের তিনিই কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাঁকে কেন্দ্র করেই সবকিছু আবর্তিত হয়েছে।
আমরা সবাই জানি, ‘বঙ্গবন্ধু’ তাঁর নাম নয়, তাঁর উপাধি বা বিশেষণ; তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু বিশেষণ নামের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে, তাতে প্রকৃত নাম হারিয়ে গেছে। তাঁর আসল নামকে আত্মসাৎ করে বিশেষণই হয়ে গেছে নাম। এখন তাঁর কথা উঠলে, তাঁর সম্পর্কে আলোচনা হলে কেউ তাঁর আসল নাম বলেন না, বঙ্গবন্ধুই বলেন। যেন সেটাই নাম।
‘বঙ্গবন্ধু’ সব সময় তাঁর নামের বিশেষণ ছিলো না। বাংলা ও বাঙালির জন্য আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে এক পর্যায়ে তিনি বাঙালিত্বের প্রতীক হয়ে ওঠেন। বাংলা মানে শেখ মুজিব এবং শেখ মুজিব মানে বাংলা-এরকম এক পরিস্থিতি দাঁড়িয়ে যায়। পূর্ববঙ্গের সমস্ত নেতাকে ছাড়িয়ে ছাপিয়ে তিনি এত উঁচুতে উঠে যান যে, তিনিই বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে পরিগণিত হন। তিনি কখন, কিভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ হলেন তার একটা ইতিহাস আছে। সে ইতিহাসটা আমরা এখানে বলার চেষ্টা করবো।
১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের কথা। এসময় শেখ মুজিবের জন্য একটা যুৎসই খেতাব বা বিশেষণ উদ্ভাবন করা প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রয়োজনটা যাঁর চিন্তায় প্রথম অনুভূত হলো, তিনি হলেন ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগ নেতা, রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক। মুজিব-পুত্র শেখ কামাল আবার তাঁর বন্ধু। শেখ কামালের সঙ্গে তাঁদের বাসায় যাতায়াত করতে করতে শেখ মুজিবকে নিয়ে তাঁর মনে একটা বাড়তি আবেগ, অতিরিক্ত আকর্ষণ এবং দুর্বলতা সৃষ্টি হয়। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব যখন চট্টগ্রামে লালদিঘি ময়দানের জনসভায় ৬ দফা ঘোষণা করছিলেন, সেসময় সেই জনসভায় উপস্থিত চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার স্কুল ছাত্র রেজাউল হক মুশতাক শেখ মুজিবের বক্তৃতা শুনে সেদিনই তাঁর পরম ভক্ত হয়ে যান। মুশতাক তখন মুসলিম হাই স্কুলের ছাত্র। স্কুল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত জি.এস ও নগর ছাত্রলীগ নির্বাহী কমিটির কনিষ্ঠতম সদস্য। সেই মুশতাক ৬৭ খ্রিস্টাব্দে এসএসসি পাস করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন।
ঢাকা তখন আন্দোলনের দুর্গ। ৬ দফার ভিত্তিতে বাঙালির জাগরণ শুরু হয়েছে এবং রাজপথ হরতাল, সভা, মিছিল, স্লোগানে উত্তপ্ত হয়ে খৈ এর মতো ফুটছে। আন্দোলনের উত্তপ্ত পরিবেশে ঢাকা কলেজে পড়তে যাওয়া মুশতাকের রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকলো। রাজপথের আন্দোলনের স্রোতে ভেসে গেলেন তিনি। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরার জন্য রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক ও তাঁর বন্ধু শেখ কামাল যৌথভাবে একটা বুলেটিন প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। বুলেটিনের নামকরণ করা হয় ’প্রতিধ্বনি’। মোহাম্মদ আমিনুর রহমান সম্পাদিত এ বুলেটিনে তৎকালীন ছাত্র আন্দোলনের খবরাখবরের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঘটনাবলীও প্রকাশিত হতো। রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক সে সময়, যে কথা আমরা আগে বলছিলাম, শেখ মুজিবের নামের সাথে একটা বিশেষণ প্রয়োগের ভাবনা শুরু করেন। সেই চিন্তার ফলশ্রুতিতে শেখ মুজিবের জন্যে যুৎসই খেতাব হিসেবে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি তিনি তাঁর এক নিবন্ধে লেখেন। ৩ নভেম্বর ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ঢাকা কলেজ শাখার প্যাডে ছদ্মনামে চার পৃষ্ঠাব্যাপী এক রাজনৈতিক প্রবন্ধে শেখ মুজিবের নামের সাথে প্রচলিত বিভিন্ন বিশেষণের পাশাপাশি সর্বপ্রথম ‘বঙ্গবন্ধু’ বিশেষণটি লিখিত আকারে ব্যবহার করেন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান, দলীয় নেতা-কর্মীদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসামিশ্রিত আন্তরিক সম্বোধনে ‘মুজিব ভাই’, ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে প্রথম ৬ দফা ঘোষণা করার পর চট্টল শার্দুল এমএ আজিজ তাঁকে নতুন এক উপাধিতে ভূষিত করলেন। সেদিন থেকে মুজিব ভাই হয়ে গেলেন ‘বঙ্গশার্দুল’ শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮-তাঁর বঙ্গশার্দুল লকব টিকে রইলো দু’বছর।
মুশতাক বেশ কিছুদিন ধরেই ভাবছিলেন, ৬ দফা আন্দোলন ও আগরতলা মামলা থেকে শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা যেখানে বাড়তে বাড়তে আকাশছোঁয়া উচ্চতায় উপনীত হচ্ছিলো, তাতে বঙ্গশার্দুল উপাধি তাঁকে ঠিক ধারণ করতে পারছিলোনা। এমন কোন যুৎসই উপাধি উদ্ভাবন করা দরকার, যে উপাধি নতুন পরিস্থিতিতে বহুগুণ বর্ধিত শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা ধারণ করতে পারে। এক বছর পর যখন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুবের তখ্তে তাউস তাসের ঘরের মত উড়ে গেল এবং শেখ মুজিবুর রহমান এক মহানায়ক, মহাবীরের ন্যায় কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে বেরিয়ে আসলেন বাইরে; সেই পরিস্থিতিতে ১৯৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) তাঁর সম্মানে আয়োজিত গণসংবর্ধনায় ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করলেন। সেদিন থেকে শেখ মুজিব হয়ে গেলেন ‘বঙ্গবন্ধু’।
শেখ মুজিবের জন্য যুৎসই উপাধি উদ্ভাবনে মুশতাকের মৌলিক চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। এতদিন পর্যন্ত বাংলাদেশে অসাধারণ লোকপ্রিয়তা অর্জনকারী নেতা বা মনীষীদের নামের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য ‘বাঘ’ বা ‘শের’ কিংবা “সিংহ” উপাধি বেছে নেওয়া হতো। যেমন ‘শের-ই-বাংলা’ এ কে ফজলুল হক, ‘বাংলার বাঘ’ স্যার আশুতোষ মুখ্যোপাধ্যায়, ‘চট্টল শার্দুল’ এম এ আজিজ, ‘সফিনা-ই-ইলম’ মওলানা আবুল হাসান, ‘শেখ-এ-চাটগাম’ কাজেম আলী মাস্টার ও তদীয় পুত্র ‘শের-ই-চাটগাম’ একরামুল হক, ‘চট্টল গৌরব’ মহিম চন্দ্র দাশ, ‘চট্টল কেশরী’ জহুর আহমদ চৌধুরী’ ইত্যাদি। আবার ‘দেশ’, ‘জাতি’ বা ‘জনগণ’-এর উদাহরণ টেনেও কিছু পদবি সৃষ্টি হয়েছে। যেমন ‘দেশবন্ধু’ চিত্তরঞ্জন দাশ, ‘দেশপ্রিয়’ জে এম সেনগুপ্ত, ‘লোকমান্য’ তিলক, ‘কায়েদে আজম’ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ‘শের-ই-পাঞ্জাব’ সাইফুদ্দিন কিচলু, ‘কায়েদে মিল্লাত’ লিয়াকত আলী খান, ‘মাদারে মিল্লাত’ ফাতেমা জিন্নাহ, ‘সীমান্ত গান্ধী’ খান আবদুল গফফার খান, ‘শেরে কাশ্মীর’ শেখ আবদুল্লাহ। তুলনায় কৌলিক পদবি বা গুণ আরোপ করে সৃষ্ট পদবিগুলোকে মনে হয় নির্দোষ। যেমন ‘মহাত্মা’ গান্ধী, ‘পণ্ডিত’ মতিলাল নেহরু ও ‘পণ্ডিত’ জওহরলাল নেহরু, ‘রাষ্ট্রগুরু’ সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ইত্যাদি।
এবার শেখ মুজিবের জন্য রেজাউল হক মুশতাকের উদ্ভাবিত খেতাব নিয়ে আলোচনা করা যাক। বঙ্গ শব্দটিকে কমন রেখে তার সঙ্গে দু’অক্ষরের এমন একটি সাধারণ, অটেপৌরে শব্দ তিনি জুড়ে দিলেন, সেটাই হয়ে গেল অসাধারণ, অতুলনীয়, অমোঘ এক খেতাব। ‘বঙ্গবন্ধু’ এই শব্দবন্ধ কত সহজ, অথচ কত গভীর, গম্ভীর এবং কত ভারি। মানুষের হৃদয়রাজ্যে প্রবেশের রূপকথার সোনার কাঠি রূপার কাঠি, মানুষের মন জয় করার এক ব্রহ্মাস্ত্র। এখানে রেজাউল হক মুশতাক অনন্য। সকল খেতাবকে টেক্কা দিয়ে তাঁর ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে গেলো এক শাশ্বত, চিরকালীন খেতাব। ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দের মধ্যে যে দ্যোতনা, আর কোন বিকল্প শব্দ দিয়ে সেই ব্যঞ্জনা আনা যেত না। আমার মনে হয়, খেতাব চয়ন করার সময় মুশতাক সাহেব এ বিষয়টাকেও হয়তো মনে রেখেছিলেন যে, খেতাবটি হতে হবে ‘মানবিক’, ‘দৈনন্দিন’, ‘ঘরোয়া’, যার মধ্য দিয়ে বাংলার সাধারণ মানুষের মহৎ আবেগ, হৃদয়ানুভূতি, কল্পনা, আকাঙ্ক্ষা আত্মসাৎ করে অমরত্বের দাবিদার হবে। শেখ মুজিব, তাঁর সৃষ্টি বাংলাদেশ এবং তাঁর লকব ‘বঙ্গবন্ধু’-এসব অমরত্বের মহিমায় উদ্ভাসিত। ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাবের সঙ্গে জনাব রেজাউল হক মুশতাকও অমর হয়ে রইলেন। যতদিন ‘বঙ্গবন্ধু’ বেঁচে থাকবেন, মুশতাক সাহেবও ততদিন বেঁচে থাকবেন তাঁর ছায়াসঙ্গী হয়ে।
বাঙালির সঙ্কটে-সংগ্রামে, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ চিরকাল সাহস ও সংকল্পের প্রেরণা জুগিয়ে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’-ই ছিলো রণাঙ্গণে মুক্তিযোদ্ধাদের রণধ্বনি।
রেজাউল হক মুশতাক প্রতিধ্বনিতে যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন তার নাম ছিল ‘আজব দেশ’, তাঁর ছদ্মনাম ছিল ‘সারথী’। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসের ইস্যুতে ‘প্রতিধ্বনি’ বুলেটিনে ঐতিহাসিক ৬-দফা পুনর্মুদ্রণের সময় সর্বপ্রথম ‘বঙ্গবন্ধু’ আনুষ্ঠানিকভাবে ছাপার অক্ষরে আত্মপ্রকাশ ঘটে। তখন অবশ্য ছোট হেডিংয়ে অখ্যাত এক পত্রিকায় ব্যবহৃত ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ঢাকার ছাত্র মহলের একাংশ ছাড়া তেমন অন্য কারো নজর কাড়েনি। গুরুত্ব পায় ঠিক তখনই, যখন বাঙালি জাতীর জাগরণের সব স্রোতধারা এক মোহনায় মিলেমিশে একাকার, যখন শেখ মুজিব বিদ্রোহী বাংলার মুকুটহীন সম্রাট। তৎকালে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, তোফায়েল আহমেদ ও ১৯৬৯-এর ছাত্র নেতৃত্বের সকলেরই কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।
১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিব বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। ৬৯ এর ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে গণসংবর্ধনায় ছাত্র জনতার পক্ষ থেকে ডাকসু’র তৎকালীন ভিপি তোফায়েল আহমেদ, শেখ মুজিবুর রহমানকে নতুন উপাধিতে ভূষিত করলেন রেজাউল হক মুশতাক উদ্ভাবিত ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দ প্রয়োগ করে।
মুশতাকই শেখ সাহেবের জন্য তাঁর উদ্ভাবিত উপাধির কথা তোফায়েল আহমদকে জানিয়েছিলেন। আর তিনি প্রথম সুযোগেই লক্ষ জনতার হর্ষধ্বনির মধ্যে শেখ সাহেবকে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই উপাধিতে ভূষিত করেন, বরণ করে নেন।
ইতিহাস যেন তাঁর অপেক্ষাতেই ছিলো। কখন একজন আসবেন যিনি ইতিহাস সৃষ্টি করবেন। ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি উদ্ভাবন করে মুশতাক ইতিহাস নির্মাণ করলেন। কিন্তু তিনিও তখন হয়তো বুঝতে পারেননি, কালে তাঁর উদ্ভাবিত এই বঙ্গবন্ধু উপাধি বাংলার রাজনীতিতে কী জাদুকরী প্রভাবের উৎস হয়ে উঠবে। বঙ্গবন্ধু একটি আদর্শের নাম, একটি চেতনার নাম, একটি দর্শনের পরিচয়জ্ঞাপক প্রতীকায়িত নাম। এ প্রসঙ্গে পরলোকগত জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক তাঁর প্রিয় ছাত্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং বঙ্গবন্ধুর কেবিনেটের শিক্ষা মন্ত্রী অধ্যাপক ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী স্মরণে প্রদত্ত স্মারক বক্তৃতায় যা বলেছিলেন, তা উদ্ধৃত করার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। ‘Bangladesh : State of the Nation’ শিরোনামে প্রদত্ত একই বক্তৃতায় অধ্যাপক রাজ্জাক বঙ্গবন্ধুর প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেন,- ‘He was by love possessed for that bit of the world that we call Bangladesh. Such love can be dangerous as it proved to be for Bangabandhu. This obsessive possessive passion tends to render one blind to everything else, particularly when the love is requitted. From 25th March 1971 to 10th January 1972 Bangabandhu is totally absent from the scene where unequal forces are locked in a deadly struggle. Bangabandby and Bangabandhu alone is the symbol round which the adherents of the forlorn cause group themselves. And that is no accident. In those dark days, in that testing time, among the millions who would constitute the nation, there was no misunderstanding and there was no ambiguity. Bangabandhu alone was the symbol.’
১৯৬৯ থেকে বাংলার রাজনীতি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে একটি চরম পরিণতির মুখে ধাবিত হয়েছিলো। সেই পরিণতি হলো স্বাধীনতা। ৭০-এর নির্বাচনে ধস নামানো বিজয় অর্জন করে আওয়ামী লীগ বাংলার জনগণের একমাত্র প্রতিনিধিত্বশীল দল হয়ে উঠলো। অতঃপর ‘স্বাধীনতা’ বাংলার জনগণের দৃষ্টিসীমার মধ্যে প্রতিভাত হতে থাকলো। সাতই মার্চ রেসকোর্সে বজ্রকণ্ঠের ভাষণে বঙ্গবন্ধু জনগণের সেই বহুআকাঙ্ক্ষিত ‘স্বাধীনতা’ ঘোষণা করলেন।
‘প্রতিধ্বনি’-তে প্রকাশিত রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক এর প্রবন্ধের ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি পরবর্তীকালে ছাত্রলীগের বিভিন্ন লিফলেট, প্রচারপত্র ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হতে থাকে। রাজনৈতিক মঞ্চে বক্তাগণ তাঁদের বক্তৃতায় ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি উচ্চারণ করতে থাকেন। ‘বঙ্গবন্ধু’র জীবনীও প্রথম রচনা করেন জনাব রেজাউল হক মুশতাক। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে তিনি বঙ্গবন্ধু’র জীবনী বিষয়ে একটি পুস্তিকা প্রণয়ন করেন। ২৪ পৃষ্ঠার পুস্তিকাটির নাম ছিল ‘এই দেশেতে জন্ম আমার’। প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন কালাম মাহমুদ। এই পুস্তিকাটি ‘বঙ্গবন্ধু’ জীবনী বিষয়ক প্রথম রচনা। এই পুস্তিকা প্রকাশের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা বদিউল আলম ও রায়হান ফিরদাউস মধুও যুক্ত ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু জেল থেকে বের হয়ে আসার পর মুশতাক সাহেব পুস্তিকাটি নিয়ে তাঁর হাতে দিলে বঙ্গবন্ধু খুশিতে এত বেশি উচ্ছ্বসিত ও আপ্লুত হয়ে উঠেছিলেন যে, তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না ছাত্রলীগের ছেলেরা এত ভালো প্রকাশনা করতে পারে। কারণ তখন পর্যন্ত আকর্ষণীয়, দৃষ্টিনন্দন বই, ম্যাগাজিন, ব্যানার, লিফলেট, স্যুভেনির প্রকাশে ছাত্র ইউনিয়নেরই একচেটিয়া এখতিয়ার ছিলো। তিনি মুশতাককে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এটা তোমরা বের করেছো ? মুশতাক যখন বললেন জি, আমরাই বের করেছি, বঙ্গবন্ধু তখন অবাক বিস্ময়ে বলে উঠেন—আমার ছাত্রলীগের ছেলেরা এত ভালো বই বের করতে পারে। আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না। তারপর তিনি মুশতাককে তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa