
বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙানো অপরাধ নয়—এটি দায়িত্ববোধ, ইতিহাস ও জাতিসত্তার প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক:
একজন শিক্ষিকার বরখাস্তের ঘটনাকে ঘিরে জাতীয় মূল্যবোধ ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
মো.কামাল উদ্দিন
শুরুতেই প্রশ্ন? ছবিটি টাঙানো ছিল শ্রদ্ধার প্রতীক, না কি শাস্তিযোগ্য অপরাধ? পিরোজপুর জেলার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষিকা শামীমা ইয়ারছমিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি নিজ কক্ষে টাঙানোর “অপরাধে” বরখাস্ত হয়েছেন।
এই সংবেদনশীল ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন সামাজিক, নৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতি আমাদের বর্তমান প্রজন্মের অবস্থানও যেন নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমে খবরটি প্রকাশের পর গোটা দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। যারা বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙানোকে ‘রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড’ বা ‘অপরাধ’ হিসেবে দেখছেন, তাদের প্রতি প্রশ্ন রেখে বলতে হয়—এই দেশের স্বাধীনতার স্থপতির ছবি যদি একজন শিক্ষক তার নিজ অফিসে টাঙান, সেটিকে কি কোনো রাজনৈতিক অবস্থান বলা যায়? নাকি সেটি ইতিহাসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীল নাগরিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ?
শামীমা ইয়ারছমিনের বক্তব্য—’আমি যা করেছি, তা ছিল আমার কর্তব্য’। শিক্ষিকা শামীমা ইয়ারছমিন দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙিয়েছেন তার বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ ও শ্রদ্ধাবোধ থেকে। এটিকে তিনি কোনো রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখেন নি। বরং শিক্ষকের দায়িত্ব হিসেবে তিনি চেয়েছেন ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে।
এই ঘটনার ভেতর দিয়ে উঠে এসেছে বৃহত্তর এক সামাজিক প্রশ্ন? যেখানে একজন নারী শিক্ষক, যিনি মূল্যবোধ শেখান, তিনিই যদি অন্যায় আচরণের শিকার হন, তাহলে আমাদের নৈতিক ভিত্তি কোথায় দাঁড়িবে? আইনি প্রেক্ষাপট—ছবিটি টাঙানো কি আইনসম্মত ছিল? ১. সরকারি নির্দেশনা ও আইন: ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে, যেখানে বলা হয়—
“সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি যথাযথভাবে স্থাপন করতে হবে।”
২. উচ্চ আদালতের রায়:
২০২০ সালের ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন—”বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙানো সংবিধান অনুযায়ী সব প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক।”
পরবর্তী সময়ে, ২০২১ সালের আরেকটি রায়ে আদালত বলেন— “আদালত কক্ষে, সরকারি অফিসে এবং সকল কর্মস্থলে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি টাঙাতে হবে।” সুতরাং, শামীমা ইয়ারছমিন কোনো আইন ভঙ্গ করেননি, বরং একটিকে যথার্থভাবে পালন করেছেন। বরং বরখাস্তকারী প্রশাসনের কর্মকাণ্ডই প্রশ্নবিদ্ধ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কী অবস্থান?
যদিও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এখনো এটি বাধ্যতামূলক নয়, তবে সরকার নির্দেশনা দিয়ে উৎসাহ দিয়ে থাকে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে, যেখানে ইতিহাস শেখানো হয়, সেখানে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি থাকা শুধু উপযুক্ত নয়—বরং নৈতিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
সাংবাদিকতার দৃষ্টিভঙ্গি—স্বাধীনতা বনাম ইতিহাস বিকৃতি
একজন সাংবাদিক বা মতামত বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে এখানে দুটি স্তর রয়েছে:
এক: ইতিহাস ও জাতির প্রতি শ্রদ্ধা। বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙানো কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচার নয়, এটি একটি ইতিহাস চর্চা। তাঁর ছবি তরুণদের কাছে দেশের আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরে।
দুই: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সীমা। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে এ স্বাধীনতা যেন ইতিহাস বিকৃতির আশ্রয় না নেয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বরখাস্তের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি? এই বরখাস্ত আসলেই কি শুধুই “ছবি টাঙানো”র কারণে? নাকি এর পেছনে রয়েছে প্রশাসনিক অসচেতনতা, রাজনৈতিক বিদ্বেষ কিংবা একটি বিশেষ গোষ্ঠীর চাপ? বরং কেউ যদি জাতির পিতার ছবি সরিয়ে ফেলতেন, তাহলে সেটা হতো আলোচনার বিষয়। কিন্তু যে শিক্ষক ইতিহাসকে সম্মান জানিয়েছেন, তাকে শাস্তি দেওয়া মানেই জাতিকে তার শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা। মূল্যবোধের অবক্ষয় ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকট
শামীমা ইয়ারছমিনের ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—আমাদের শিক্ষা প্রশাসনের মানবিকতা, যুক্তিবোধ ও নৈতিকতার জায়গাগুলো কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। একজন ইতিহাস সচেতন শিক্ষকের এই ধরনের অপমান শুধু ব্যক্তির অপমান নয়, এটি গোটা জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতি চরম অবজ্ঞা।
সাংবাদিক ও আইনগত পরামর্শ (সংক্ষিপ্তভাবে):
সরকারি, আধা-সরকারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙানো আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এখনো বাধ্যতামূলক নয়, তবে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক দায়িত্ব থেকে টাঙানো উচিত।
ইতিহাসের বিকৃতি, বিদ্বেষ ও বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা রোধে রাষ্ট্রের উচিত সচেতন ভূমিকা রাখা। বরখাস্তের সিদ্ধান্ত পূন:র্বিবেচনা করা জরুরি এবং দোষী প্রশাসনিক ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙানো কোনো অপরাধ নয়—এটি ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা, দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং নাগরিক দায়বদ্ধতার প্রতীক। শামীমা ইয়ারছমিনের মতো শিক্ষকরা আমাদের সমাজের বাতিঘর। তাদের দায়িত্বশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে গোটা জাতিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
বঙ্গবন্ধু শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন—তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার, রাষ্ট্রের আত্মা। তাঁর প্রতিকৃতি সরিয়ে দিলে আমরা শুধু একটি ছবি সরাই না, আমরা নিজেদের চেতনাকেও অস্বীকার করি।
এই ঘটনাটি নিছক প্রশাসনিক নয়—এটি জাতির চেতনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তাই এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হওয়া উচিত। বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙানো মানে নিজেকে জাতি হিসেবে সম্মানিত করা—আর তা কখনোই শাস্তিযোগ্য হতে পারে না।
![]()









