- - -

বাসবী বড়ুয়া: এক স্মরণীয় অধ্যায়

Print News

বাসবী বড়ুয়া: এক স্মরণীয় অধ্যায়

¦ সরিৎ চৌধুরী
.
দুরারোগ্য ব্যাধির জীবন যন্ত্রণা
স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বরণের আকুলতা
ডেনমার্কে ইচ্ছা মৃত্যু করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা
অসীম ব্যথাতুর হৃদয়ের কাতরতা
অবশেষে হিমশীতল বরফে ঢাকা
জীবনের পরিসমাপ্তি
মৃত্যু অনিঃশেষ ও শান্তিকামী।

জীবন যন্ত্রণা অনেক সময় স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণে উৎসাহিত করে, তখন বেলা-অবেলায় হাট ভেঙে যায়। বাসবীর জীবনের প্রস্থান স্তিমিত সূর্যের ন্যায়। বিউগলের করুণ সুর বেলা শেষের গান হয়ে বেজে ওঠে জীবনের পরিসমাপ্তিতে। প্রকৃতি তার নিয়মেই আপন করে নিয়েছে বাসবীকে। নিঃশব্দে একটি জীবনের মাত্রা দিয়ে গেলেন বাসবী, হলেন মাত্রামানব।

জ্ঞান-প্রজ্ঞায়, সৃজন-মননে দূরদৃষ্টিময় জীবন শৈলীতে বাসবী ইতিহাসে নিজের অবস্থান নির্ণয় করেছেন। নতুন প্রজন্মের পথক্রমায় শত-সহস্র বছরব্যাপী এ প্রকাশনার মধ্য দিয়ে বাসবী বেঁচে থাকবেন নানান ব্যাপ্তি ও পরিধিতে। এ যেন প্রবাহিত এক জীবন, যা-কিনা সাগর অভিমুখী! সাগরের এক বিন্দু জল নয়, এক বিন্দু জলে পুরো মহাসাগর। সে সাগরের ব্যাপ্তি ও গভীরতায় স্মারকগ্রন্থ ‘বেলা শেষের গান’ প্রকাশিত হয়েছে। মহাসাগরের তরঙ্গমালা আছড়ে পড়বে হয়তো এই বঙ্গের সীমানা অতিক্রম করে সমগ্র বিশ্বে। জীবনের প্রকাশটাই বাসবী এভাবেই করতে চেয়েছিল। বাংলাদেশে এমন বরেণ্য দীপ্তিমান অনেক জন্মেছে। বাসবী তাঁদেরই একজন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের প্রভাষক, ভাষাতত্ত্ব ও লোকসংস্কৃতি গবেষক বাসবী বড়ুয়া ছিলেন এক অনন্য প্রতিভা। তিনি কেবল একজন শিক্ষকই ছিলেন না, বরং ছিলেন একজন নিবেদিত গবেষক, সাহিত্যপ্রেমী ও সংস্কৃতি অনুরাগী। তার জীবন ও কর্ম বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন:-
পটিয়ার তেকোটা গ্রামের কৃতি সন্তান বাসবী বড়ুয়া।১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ মার্চ চট্টগ্রাম শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। মৃত্যু বরণ করেছেন ২৩ জুলাই ২০২১ খ্রিস্টাব্দ।

তার গর্বিত পিতা শিল্পোদোক্তা, প্রয়াত প্রকৌশলী স্বপন কান্তি বড়ুয়া ও মাতা প্রীতি বড়ুয়া। তাঁর পিতা ছিলেন একজন সফল রাজনীতিবিদ এবং প্যাসিফিক পেপার প্রোডাক্টস লিমিটেড এর এমডি। মানুষের মাঝে তাঁর অবারিত দান ও সাংগঠনিক এবং আন্তর্জাতিক অবস্হান ছিল দারুণ।

অত্যন্ত মেধাবী বাসবীর শৈশব ও কৈশোর জীবন ছিল আনন্দপূর্ণ। প্রতিটি ক্ষেত্রে তার মেধা প্রস্ফুটিত হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণি ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি লাভ। এস এসসিতে ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লা বোর্ডে সম্মিলিত মেধাতালিকায় তৃতীয় স্ট্যান্ড। এইসময় এসএসসিতে কুমিল্লা বোর্ডের মেয়েদের মধ্যে পঞ্চম ও উভয়ের মধ্যে সম্মিলিতভাবে দশম স্ট্যান্ড। অনার্স ও প্রথম মাস্টার্স ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ভারতের দিল্লী জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় হতে দ্বিতীয় মাস্টার্স ও এমফিল করেন। সে ট্রান্সজেন্ডার, নারী শিক্ষা ও নারীদের ক্ষমতায়নের উপর বিভিন্ন গবেষণাপত্র রচনা করেন। লোকসংস্কৃতি, অঁলা, চর্যাপদ নিয়ে তার গবেষণাধর্মী লেখা রয়েছে।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর ভারতের দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয়বার মাস্টার্স ও এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন।

পেশা ও গবেষণা:-
বাসবী বড়ুয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করতেন। তিনি ভাষাতত্ত্ব ও লোকসংস্কৃতি নিয়ে গবেষণায় নিবেদিত ছিলেন। নারী শিক্ষা ও নারীদের ক্ষমতায়ন নিয়ে তার বিভিন্ন গবেষণাপত্র গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। এছাড়াও, চর্যাপদ নিয়ে তার গবেষণাধর্মী লেখাও ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
স্মরণে ‘বেলা শেষের গান’

বাসবী বড়ুয়ার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবরে সরিৎ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয় ‘বাসবী বড়ুয়া স্মারক গ্রন্থ – বেলা শেষের গান’। বইটিতে ৪০ জনের অধিক গুণী লেখক, গবেষক ও প্রকাশকের লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি তার জীবন ও কর্মের উপর ভিত্তি করে রচিত একটি অনন্য সংকলন। তাকে নিয়ে আরও ব্যাপক চর্চা করতে হবে। তার অসংখ্য লেখা গুলো ও গবেষণা এখানে সংক্ষিপ্ত পরিসরে উল্লেখ করতে না পারার জন্য ক্ষমা প্রার্থী।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি:-
গৌরবের বিষয় হলো, ‘বেলা শেষের গান’ বইটি আমেরিকার খ্যাতনামা লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে স্থান পেয়েছে। এটি বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ সোপান হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে বাসবী বড়ুয়ার অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে আরো গভীরভাবে পৌঁছাবে।

সাহিত্য ও প্রকাশনা উদ্যোগ:-
এই প্রকাশনার পেছনে রয়েছে চট্টগ্রামের সরিৎ প্রকাশন ও এর স্বত্বাধিকারী সরিৎ চৌধুরী। সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন। ‘রুচির ভিন্নতা তার প্রধান আকর্ষণ’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি প্রকাশনা জগতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন।

পরিশেষে, বাসবী বড়ুয়ার জীবন ও কর্ম বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা। তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ‘বেলা শেষের গান’ বইটির স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে এর উপস্থিতি বাংলা ভাষার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, তার শিক্ষাদর্শন ও গবেষণা চর্চার উত্তরাধিকারকে আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

লেখক: সরিৎ চৌধুরী
প্রকাশক, সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠক।

⬛

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa