- - -

হাসির আড়ালে লুকানো নীরবতা: সত্যব্রত বড়ুয়ার প্রথম প্রয়াণ দিবসে স্মৃতির গভীর আর্তি

Print News

হাসির আড়ালে লুকানো নীরবতা: সত্যব্রত বড়ুয়ার প্রথম প্রয়াণ দিবসে স্মৃতির গভীর আর্তি

মো. কামাল উদ্দিন

কিছু সংবাদ থাকে, যা কানে পৌঁছায়, কিন্তু হৃদয় তা মানতে চায় না। কিছু বিদায় থাকে, যা ঘটে যায়, কিন্তু মেনে নেওয়া যায় না কোনোভাবেই। আজ থেকে এক বছর আগে এমনই এক অবিশ্বাস্য সংবাদ শুনেছিলাম—সত্যব্রত বড়ুয়া নেই! সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, যেন শব্দগুলো ভুল, সংবাদটি মিথ্যে, অথবা সময় নিজেই কোনো নিষ্ঠুর রসিকতা করছে।
সত্যদা—আমাদের প্রিয় রম্য লেখক, হাসির কারিগর, শব্দের জাদুকর—তিনি কি সত্যিই নেই?
এই প্রশ্নটি আজও আমার ভেতরে ঘুরপাক খায়।
যে মানুষটি প্রতিনিয়ত মানুষকে হাসাতেন, জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে হালকা করে দিতেন তাঁর লেখার বাঁকানো কথায়, সেই মানুষটি চলে যাবেন—এতটা নীরবে, এতটা নিঃশব্দে—এটা কি বিশ্বাস করা যায়?
না, যায় না। আজও যায় না।
সত্যব্রত বড়ুয়া ছিলেন এমন একজন মানুষ, যার কলমে ছিল এক অদ্ভুত শক্তি—তিনি কাঁদাতেন না, কিন্তু হাসির ভেতর দিয়ে মানুষের বেদনা ছুঁয়ে যেতেন। তাঁর রম্যরচনা ছিল নিছক বিনোদন নয়, বরং সমাজের প্রতিচ্ছবি, সময়ের ব্যঙ্গ, জীবনের অদেখা সত্যের এক মৃদু প্রকাশ। তিনি ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি হাসির আড়ালে লুকিয়ে রাখতেন গভীর বোধ, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ আর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা।
আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল কেবল লেখক-সহকর্মীর নয়—ছিল এক আত্মিক সংযোগ। লেখালেখির জগতে আমাদের অনেক স্মৃতি, অনেক গল্প, অনেক সময় একসঙ্গে কাটানো মুহূর্ত জমে আছে। আজ সেগুলোই বারবার ফিরে আসে—মনে করিয়ে দেয়, তিনি ছিলেন, তিনি আছেন—আমাদের ভেতরে, আমাদের স্মৃতিতে।
আমার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন—২০০৮ সাল। আমার প্রথম রম্যরচনার বই “বাঁকা কথা” প্রকাশিত হয়েছিল। সেই বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সত্যদা। আজও সেই দিনটির কথা মনে পড়লে বুক ভরে ওঠে এক অদ্ভুত আবেগে।
তিনি সেদিন শুধু একজন আলোচক ছিলেন না—তিনি ছিলেন একজন অনুপ্রেরণার উৎস, একজন অভিভাবকের মতো পথপ্রদর্শক। তাঁর কথাগুলো, তাঁর হাসি, তাঁর সহজ অথচ গভীর মন্তব্য—সবকিছু আজও আমার ভেতরে বেঁচে আছে।
তিনি যেমন মানুষকে হাসাতেন, তেমনি মানুষকে ভাবাতেনও। তাঁর উপস্থিতি ছিল প্রাণবন্ত, তাঁর কথায় ছিল উষ্ণতা, আর তাঁর আচরণে ছিল এক আন্তরিক মানবিকতা। এমন মানুষ খুব বেশি জন্মায় না—আর জন্মালেও তারা খুব বেশি দিন আমাদের মাঝে থাকে না।
আজ তার প্রথম প্রয়াণ দিবসে দাঁড়িয়ে মনে হয়—সময়ের ব্যবধান শুধু ক্যালেন্ডারে এক বছর বাড়িয়েছে, কিন্তু হৃদয়ের শূন্যতা একটুও কমায়নি। বরং এই শূন্যতা যেন আরও গভীর হয়েছে, আরও নিঃশব্দ হয়েছে।
সত্যদা চলে গেছেন, কিন্তু তিনি রেখে গেছেন তাঁর লেখা—যেখানে আজও মানুষ হাসে, আনন্দ পায়, আবার কখনো অজান্তেই চিন্তা করে। একজন লেখকের আসল অস্তিত্ব তো সেখানেই—তার সৃষ্টির ভেতরে। সেই অর্থে সত্যব্রত বড়ুয়া কখনো হারিয়ে যাননি, তিনি আছেন—প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি বাক্যে, প্রতিটি হাসির মুহূর্তে।
তবুও, ব্যক্তিগতভাবে তার অনুপস্থিতি আমাকে নাড়িয়ে দেয়।
মনে হয়—যদি আরেকবার দেখা হতো, যদি আরেকবার কথা বলা যেত, যদি আরেকবার তার সেই চিরচেনা হাসিটা দেখা যেত!
কিন্তু জীবন সব ‘যদি’-এর উত্তর দেয় না।
আজ আমি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাকে স্মরণ করছি।
আল্লাহ তার আত্মাকে শান্তি দান করুন।
তার জীবনের প্রতিটি সৃষ্টিশীল মুহূর্ত, প্রতিটি হাসির উপহার—সবকিছুর প্রতিদান তিনি যেন পরম শান্তিতে পান।
সত্যদা,
আপনি মানুষকে হাসিয়ে গেছেন,
কিন্তু আপনার বিদায় আমাদের কাঁদিয়ে গেল—
এই কান্না, এই শূন্যতা, এই স্মৃতি—
আমাদের ভেতরে চিরকাল বেঁচে থাকবে।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa