
স্বাস্থ্যসেবায় সমন্বয়হীনতা: মূল্য দিচ্ছেন রোগীরা
আবদুল্লাহ মজুমদার
একটি হাসপাতাল কেবল ইট, পাথর ও কংক্রিটের ভবনের নাম নয়; এটি মানুষের শেষ ভরসার জায়গা। অসুস্থ মানুষ যখন হাসপাতালের দরজায় কড়া নাড়েন, তখন তাঁর কাছে সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে ওঠে সময়, সহমর্মিতা এবং সহজলভ্য সেবা। চিকিৎসার মান যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ সেবাপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া। কারণ একটি রোগীকে অযথা অপেক্ষা করানো, এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে ঘোরানো কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্য না দেওয়া—এসবও এক ধরনের নীরব ভোগান্তি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালের মতো চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালেও রোগীরা প্রায়ই এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন। ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতা সেই বৃহত্তর সংকটেরই প্রতিচ্ছবি।
চট্টগ্রামের অন্যতম বিশেষায়িত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান মা ও শিশু হাসপাতালে একটি সাধারণ ড্রেসিং করাতে গিয়ে একজন রোগীর স্বজনের দীর্ঘ সময় এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে ঘুরতে হওয়া, দায়িত্বপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসারকে না পাওয়া, বারবার অপেক্ষা করতে বাধ্য হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবের কথা শুনে পরদিন আবার আসার পরামর্শ পাওয়া—এসব ঘটনা আমাদের স্বাস্থ্যসেবার একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে আসে। যদি ঘটনাটি সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি শুধু একটি হাসপাতালের প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; বরং রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে আমাদের সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন।
সমস্যা কেবল চিকিৎসক বা নার্সের সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দায়িত্ব বণ্টনের অস্পষ্টতা, সমন্বয়ের ঘাটতি, জবাবদিহির অভাব এবং রোগীকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার দুর্বল সংস্কৃতি। একজন রোগী বা তাঁর স্বজনকে যদি বারবার বিভিন্ন কক্ষে পাঠানো হয়, অথচ কেউ স্পষ্টভাবে জানাতে না পারেন কী করতে হবে, কোথায় যেতে হবে বা কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, তাহলে সেটি চিকিৎসাসেবার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, একটি সাধারণ ড্রেসিংয়ের মতো সেবা পেতেই যদি দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে জরুরি বা সংকটাপন্ন রোগীদের কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়? চিকিৎসাবিজ্ঞানে সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের বিলম্বও রোগীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। তাই হাসপাতালের প্রতিটি স্তরে সময়ানুবর্তিতা, সমন্বয় এবং দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
একই সঙ্গে হাসপাতালের মৌলিক অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বের দাবি রাখে। শৌচাগারে পর্যাপ্ত আলো, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সরঞ্জাম এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের উপস্থিতি কোনো বিলাসিতা নয়; এগুলো একটি আধুনিক হাসপাতালের ন্যূনতম মানদণ্ড।
তবে এটিও সত্য, সরকারি হাসপাতালগুলো প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলায়। সীমিত জনবল ও সীমিত সম্পদের মধ্যেও অসংখ্য চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাই সমস্যার সমাধান কাউকে দোষারোপে নয়; বরং সেবাব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর সংস্কার গ্রহণে।
রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালগুলোতে কার্যকর তথ্যসেবা ডেস্ক চালু করা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, ছোটখাটো চিকিৎসাসেবায় অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি, জবাবদিহি এবং সেবার মান মূল্যায়নের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায়। কারণ একজন রোগীর কাছে চিকিৎসার প্রথম শর্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি নয়; বরং সময়মতো সঠিক সেবা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং মানবিক ব্যবহার। হাসপাতাল যদি মানুষের ভরসার জায়গা হওয়ার বদলে ভোগান্তির প্রতীকে পরিণত হয়, তবে উন্নয়নের সব পরিসংখ্যানই অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাই এখনই প্রয়োজন স্বাস্থ্যসেবাকে কাগজে-কলমের সাফল্যের গল্প থেকে বের করে বাস্তব অর্থে রোগীবান্ধব, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক সেবাব্যবস্থায় রূপান্তর করা। সেটিই হবে একটি কল্যাণরাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয়।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সাহিত্যিক।
![]()









