- - -

বীর মুক্তিযোদ্ধা বাদল সংসদে এবং মাঠে বক্তৃতায় ঝড় তুলতে পারতেন

fb img 1794062433818
Print News

বীর মুক্তিযোদ্ধা বাদল সংসদে এবং
মাঠে বক্তৃতায় ঝড় তুলতে পারতেন

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

আমি সেই সময়ের কথা বলছি, যখন বন্ধুবর আবু জাফর মাহমুদ আমেরিকায় যান নি, সৈয়দ আবদুল মাবুদ লন্ডন প্রবাসী হন নি, সুরজিত বড়ুয়া ব্যাংকক প্রবাসী হন নি, নাওজীস মাহমুদ (মোজাম্মেল হোসেন শামীম), ইফতেখার সেলিম, কাজল, মিজানরা কাস্টম কর্মকর্তা হন নি, কামরুল, মনি, খালেদ নোমান নমী, বশর দেশত্যাগ করেন নি। ভালো মানুষ কামরুল বিদেশেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে চিরতরে আমাদের ছেড়ে চলে যান। বাংলা হোটেলে যাঁরা যাতায়াত করতেন, তাঁদের অনেকের কথা চারদশকের ব্যবধানে ভুলে গিয়েছি, যাঁদের কথা মনে পড়ছে, তাঁরা হলেন— চকরিয়ার ডা. জামাল, অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন, অ্যাডভোকেট মুছা, ইফতি ভাই, সাথী দাশ, আনিস কাদেরী, তিন নুর মোহাম্মদ-স্টিল মিল, বড়পোল এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নুর মোহাম্মদ, ভানু রঞ্জন চক্রবর্তী, বর্তমানে বড় ব্যবসায়ী সীকম-খ্যাত আমিরুল হক, বাঁশখালীর মোস্তফা আলী, চকরিয়ার আফসার ভাই, সীতাকুণ্ডের প্রিয়বন্ধু আবুল কালাম আজাদ ও মোজাফফর, সীতাকুণ্ডের শ্রমিক নেতা ইসহাক কাদের চৌধুরী, বর্তমানে কক্সবাজারে বসবাসকারী বড়পোলের ইউনুস চৌধুরী, পাথরঘাটার মিনু, চকরিয়ার মজনু, রাউজানের আজিম, মোর্শেদ, বন্ধুবর সুশীল বড়ুয়া, প্রভাকর বড়ুয়া ও শ্রীমান বড়ুয়া, আমিনুর রসুল বাবুল, মিরসরাইর রাষ্ট্রদূত ওয়াহিদুর রহমান (ওয়াহিদ সম্পর্কে বলা প্রয়োজন আমি যখন কিছুদিনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছিলাম, তখন ওয়াহিদ আমার সঙ্গে সহমত হয়েছিলেন এবং আমাকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছিলেন। তিনি আমার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর ভাবী স্ত্রীকেও তিনি আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন, তাঁর হবু স্ত্রী আমার বিয়ের সময় আমার স্ত্রীর জন্য একটি সুন্দর ব্লাউজের কাপড় দিয়েছিলেন; ওয়াহিদের সঙ্গে এমন আন্তরিক সম্পর্কের কথা কিভাবে যেন ইতিপূর্বে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে আমার লেখায় উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছিলাম, এ ঘটনা সম্ভবত দু’বার ঘটেছে; ওয়াহিদ সেজন্য মনে কষ্ট পেয়েছেন, পাওয়ারই কথা, সেজন্য আমি তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি) কবির ও তবারক, পটিয়ার মনসা গ্রামনিবাসী মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম, মোতালেব হোসেন মিন্টু, ডা. মাসুদ, ডা. জসিম, হাটহাজারীর নজরুল ইসলাম (পরে পুলিশের চাকরি নিয়ে এসপি হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন), শ্রমিক নেতা সরওয়ার কামাল, তেল শফি এবং টিঅ্যান্ডটি’র লতিফ। তেল শফি আক্ষরিক অর্থেই তেল বিক্রি করতো, কিন্তু সেজন্য তাঁকে অবহেলা করা ঠিক হবে না। কারণ তেল শফিরাই ছিলেন জাসদের সম্পদ। দুদিকেই ছিলো এমন ডেডিকেটেড লোক। স্টিল মিলের নুর মোহাম্মদ ভাই, সরওয়ার কামাল এবং লতিফও শফির মতো সৎ, ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ নেতা ছিলেন। সাগর গ্রুপেও এমন সৎ, আন্তরিক, অকৃত্রিম, ডেডিকেটেড নেতা ছিলেন। যেমন মনছুর আহমদ শফি, আমানবাজারের সেকান্দর, পটিয়ার স ম ইউসুফ, ইউনুস, ইদ্রিস (পরে সিরাজ শিকদার গ্রুপে গিয়ে শাহাদাত বরণ করে), কালাম, আবুল হোসেন, টুকু, ছগীর, বাহুলীর মাহবুব ও আবদুন নুর, সৈয়দ ভাইয়ের ভাই মাহবুব, হুলাইনের ননীগোপাল ও নুরুল আমিন, করণখাইনের মিলন সেন, এয়াকুবদণ্ডীর ইসহাক, লড়িহরার আবুল হাশেম, দৌলতপুরের পুরাতন কাপড় ব্যবসায়ী কাশেম, আবদুল্লাহ আল মামুন (পরে শ্রমিক নেতা), ছাবের (পরে পুলিশ কর্মকর্তা), লক্ষ্যারচরের রশিদ ভাই, দোহাজারীর কামাল, তাহের, চকরিয়ার তাহের, রফিক, বাঁশখালীর শফি, ইমাম শরীফ, শাহ আলম, আসহাবউদ্দিন, নুর আলী মিয়ার হাটের করিম, বোয়ালখালীর মনমথ, নজরুল, আবদুন নুর, রতন, হোসেন, বনবিহারী, দীপক ও সমর এবং ফটিকছড়ির এয়াকুব প্রমুখ ছিলেন জাসদের প্রাণশক্তি।
সাগর হোটেলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যাঁরা রাজনীতি করতেন, তাঁদেরকে সাধারণভাবে ‘শরীফ গ্রুপ’ নামেই চিহ্নিত করা হতো। যদিও সেখানে এমন সব বিশিষ্ট নেতারও যাতায়াত ছিলো, যাঁরা স্বতন্ত্র মর্যাদা ও দীপ্তিতে উজ্জ্বল ছিলেন। মোখতার ভাই, ছাবের ভাই ও মঞ্জু ভাই’র কথা আগেই বলেছি, মাহফুজ ভাই (ডা. মাহফুজুর রহমান), তারিক ভাই (তারিক মঞ্জুর), গোফরান ভাই (ডা. গোফরানুল হক), অধ্যাপক জাফর আহমদ মোস্তফা, জাকারিয়া ভাই (আ.ই.ম জাকারিয়া চৌধুরী), ইউসুফ ভাই (ডা. আবু ইউসুফ চৌধুরী), সরওয়ার ভাই (মৌলভী সরওয়ার কামাল-সাতকানিয়া), আমিন ভাই (ফজলুল আমিন মাস্টার-নূর আলী মিয়ার হাট), সৈয়দ ভাই, আহমদ নূর ভাই (পটিয়া), ইন্দুদা (ইন্দু নন্দন দত্ত), ওহীদ ভাই (ওহীদুল হক-মিরসরাই), আহাদ ভাই (আবদুল আহাদ-মাদারবাড়ি), মান্না ভাই (মাহমুদুর রহমান মান্না), মাদার্শার কাশেম ভাই ও সেলিম ভাই, কক্সবাজারের কৃষ্ণদা (কৃষ্ণ প্রসাদ চৌধুরী), রামুর ওবায়দুল হক, গর্জনিয়ার তৈয়বুল্লাহ চৌধুরী, বোয়ালখালীর রাজেন্দ্র প্রসাদ চৌধুরী ও আ.হ.ম. নাসিরউদ্দিন, আনোয়ারার সেলিম ভাই, সাতকানিয়ার ইব্রাহিম-বিন খলিলকে সে অর্থে শরীফ গ্রুপ বলা বোধ হয় সমীচীন হয় না। শরীফ গ্রুপ এবং বাদল গ্রুপে বিভক্ত হয়ে চট্টগ্রামে যখন জাসদের রাজনীতির মেরুকরণ ঘটছিলো তখন এমন কেউ কেউ ছিলেন যাঁরা সাগর হোটেল ‘জেয়ারত’ করে আবার বাংলা হোটেলও ‘তওয়াফ’ করতে যেতেন।
যাই হোক, চিন, রাশিয়া, কিউরার বিপ্লবের ইতিহাস অধ্যয়ন এবং মুক্তিযুদ্ধের আগুনে বাদল ভাইয়ের অন্তরে যে বিপ্লবের বহ্নিশিখা প্রজ্বলিত হয়েছিলো, জাসদের শ্রেণি সংগ্রাম ও সামাজিক বিপ্লবের তত্ত্ব তাতে ঘৃতাহুতি দিয়েছিলো। মঈনুদ্দিন খান বাদল প্রদীপ্ত সূর্যের ন্যায় জ্বলে উঠলেন। অনেককাল তাঁকে দেখে আমার মনে হয়েছে, তিনি যেন এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরি-মাঝে মাঝে তার অগ্নি উদগীরণ হয়, তখন তপ্ত লাভার স্রোত নির্গত হয়ে চারপাশটা ভাসিয়ে নিয়ে যায় বিপ্লবের আগুনে। শরীফ ভাই এবং বাদল ভাইকে নিয়ে আমি মনে মনে তুলনামূলক আলোচনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, একজন (শরীফ ভাই) শান্ত, ‘নারায়ণ’-এর ন্যায় স্থিতধী, সমাহিত; আর একজন (বাদল ভাই) অশান্ত, ‘মহাদেব’-এর ন্যায় কুপিত, ভয়ংকর এবং প্রলয় নাচন নটরাজ; একজন বিনীত, নমিত-আরেকজন বেপরোয়া, আগ্রাসী; একজন নিম্নকণ্ঠ-আরেকজন উচ্চকণ্ঠ; একজনের ব্যক্তিত্বের মধ্যে মুগ্ধ করার মতো জাদুকরী সম্মোহন আছে কিন্তু কাছে না গেলে টের পাওয়া যায় না—আরেকজনের ব্যক্তিত্বের দুর্নিবার আকর্ষণ এড়ানো দুঃসাধ্য; ঘরোয়া কর্মীসভা না হলে একজনের বাকবৈদগ্ধ ও জ্ঞানের বহর পরিমাপ করা যায় না— আরেকজনের কণ্ঠ গম্ভীর, ভারি, ওজনদার এবং ডম্বরুর ন্যায় আওয়াজ করতো, গমগম করতো, লালদিঘির জনসভায় মহাসাগরের জলকল্লোলের ন্যায় তাঁর কণ্ঠ থেকে উৎসারিত শব্দবোমা পাশের পুলিশ পাহাড়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে লালদিঘির মধ্যে প্রত্যাগত প্রতিধ্বনি দর্শক-শ্রোতার দেহমনে যেন আগুন ধরিয়ে দিতো।
সাতচল্লিশ বছরের তুমুল চাঞ্চল্যকর, হর্ষ-বিষাদে ভরপুর জীবন যাপন করে যখন তিনি চলতি বছরের চলতি মাসে অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ব্যাঙ্গালোরে দেবী শেঠির নারায়ণ হৃদয়ালয় হাসপাতালে, তখন তিনি খ্যাতির মধ্য গগনে। তখনো তাঁর বিজয় পতাকা উড়ছিলো উর্ধপানে; মৃত্যু থামিয়ে না দিলে আরো কত উঁচুতে তিনি উঠতেন, তা’ অনুমান করতে কল্পনা শক্তিও হার মানে। প্রগতিশীল বাম রাজনীতি করে পূর্ণেন্দু দস্তিদার, সুধাংশু বিমল দত্ত, অধ্যাপক আসহাবউদ্দিন আহমদ, চৌধুরী হারুনুর রশিদ-রা বুর্জোয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত নির্বাচনে জিতে পার্লামেন্ট অব্দি পৌঁছতে পারলেও জনাব বাদলের মতো পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে এতোটা খ্যাতি, এতোটা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেন নি। এতটা আলোচনা, আগ্রহ, কৌতূহল আর কাউকে ঘিরে উপচে পড়তে দেখা যায় নি। এইখানে জনাব মঈনুদ্দিন খান বাদল একটু বিশিষ্ট। কিন্তু বিখ্যাত পূর্বসূরীদের চেয়ে তিনি শ্রেষ্ঠ একথা আমি বলবো না।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন মহাজোট গঠন করে ২০০৮ সালে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেন, তখন জনাব বাদলকেও বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসন থেকে আওয়ামী লীগের টিকিট দিয়ে নৌকায় তুলে নিলেন। জনাব বাদল খুব সহজে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে গেলেন, জাসদ থেকে নির্বাচন করলে যেটা কোনদিনই সম্ভব হতো না। সেই যে তিনি শেখ হাসিনার আস্থা অর্জন করলেন, আর কখনো তা ক্ষুণ্ন হয়নি। নেত্রী আরো দু’বার তাঁকে নৌকার টিকিট দিয়েছেন। দু’বারই তিনি জয়লাভ করেছেন এবং এমপির সম্মান নিয়েই পরলোকে যাত্রার সৌভাগ্য অর্জনের অধিকারী হয়েছেন।
বাদল ভাইয়ের উত্থান মসৃণ ছিলো না। খুব বিসর্পিল পথ বেয়ে, অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি ও প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে লড়াই করে তাঁকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়েছে। প্রথম প্রথম তাঁর টিকে থাকাও কঠিন মনে হয়েছিলো। অন্য কেউ হলে হাল ছেড়ে দিতো। কিন্তু মানুষটার নাম মঈনুদ্দিন খান বাদল বলে কথা, যিনি প্রকৃত হারার আগে হারতে জানতেন না, যাঁর অভিধানে অসম্ভব বলে কোন শব্দ ছিলো না। আমি ইতিমধ্যে নানাভাবে বলতে চেয়েছি, বাদল ভাই খুব জেদী, একরোখা ও নাছোড়বান্দা স্বভাবের মানুষ ছিলেন। ফলে বিরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি নিজের জন্য একটি ইৎবধঃযরহম ংঢ়ধপব তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
চট্টগ্রামে জাসদ রাজনীতির প্রথম দিকে বাদল ভাইয়ের প্রতি কেন্দ্রেরও সুনজর ছিলো না। তখন মনে করা হতো শরীফ গ্রুপই কেন্দ্রের সমর্থনপুষ্ট। এমনকি কেন্দ্র থেকে আসা নেতারাও প্রায় সবাই সাগর হোটেলেই উঠতেন। পার্টি গঠন প্রক্রিয়া যখন শুরু হয়, তখনো শরীফ গ্রুপেরই প্রাধান্য ছিলো।
’৭৪-এর ১৭ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবন ঘেরাওয়ের পর যখন জাসদের উপর অত্যাচারের স্টিম রোলার নেমে আসে, তখন জাসদ আধা আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে যায়। এসময় জাসদের অভ্যন্তরে সশস্ত্র সংগ্রামের চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়। অতঃপর জাসদও অস্ত্রের ভাষায় পুলিশ, রক্ষীবাহিনীর অত্যাচারের জবাব দিতে থাকে। এসময় গণবাহিনী গঠিত হলে বাদল ভাই প্রথমবারের মত জাসদে কিছুটা সুবিধাজনক স্থান করে নিতে সক্ষম হন। বাদল ভাইও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং পুলিশের গুলিতে আহত হলে তাঁর পিতা পুলিশ কর্মকর্তা আহমদ উল্লাহ খান তাঁকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। জাসদ যখন সশস্ত্র উপায়ে সরকারের দমননীতি মোকাবেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেই সময়ের সৃষ্টি ‘গণবাহিনী’। চট্টগ্রামে শরীফ ভাই ও তাঁর অনুসারীরা এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলে ‘গণবাহিনী’ বাদল ভাইয়ের এখতিয়ারে চলে যায়। তিনি চট্টগ্রামে গণবাহিনীর কমান্ডার নিয্ক্তু হন।
প্রসঙ্গক্রমে ওই সময়ের একটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। ১৫ আগস্ট ’৭৫ বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের ঘটনায় আমার মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। জাসদ করলেও আমার মনে হয়েছিলো-সামরিক অভ্যুত্থান এবং সামরিক বাহিনীর হাতে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের ফলে দ্বন্দ্ব পরিবর্তন হয়েছে, সুতরাং রণকৌশল পাল্টাতে হবে। বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ এখন আর আমাদের রাজনীতির শত্রু হতে পারে না। সামরিক বাহিনীই এখন শত্রু, তারাই আমাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হওয়া উচিত। এখন বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ এবং সামরিক বাহিনীর হাত থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম শুরু করতে হবে। সেই উপলব্ধি থেকে আমি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়ে প্রথমে প্রচারাভিযান ও সংগঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের একমাস পর ১৫ সেপ্টেম্বর আমি ও আমার চারজন সহকর্মী প্রচারাভিযানে বের হলে বোয়ালখালী থানার বেঙ্গুরা রেলওয়ে স্টেশন থেকে রাত তিনটার সময় পুলিশ ও বিডিআরের হাতে গ্রেফতার হই। আমরা সেই রাতে সেখানে স্টেশনের দেয়ালে চিকা মারছিলাম। সেখানে প্রহরা ছিলো আমরা জানতাম না। এলাকাটি ছিলো মুসলিম লিগ অধ্যুষিত। তাছাড়া স্টেশন এবং পাশে বেঙ্গুরা লেবেল ক্রসিং হওয়ায় কিছু দোকানপাট ছিলো—যেখানে অত রাতেও চায়ের দোকানে কিছু লোক ছিলো। আমরা লালার হাট থেকে চিকা মেরে মেরে স্টেশনে পৌঁছেছিলাম। প্রহরা এবং দোকানে মানুষের জটলা আমলে না নিয়ে আমরা আমাদের কাজ করছিলাম। ওদিকে আমাদের অগোচরে মুসলিম লীগের কিছু লোক আমাদেরকে ভারতীয় দালাল হিসেবে চিহ্নিত স্থানীয় ধর্মভীরু সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপণ সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত ও সংঘবদ্ধ করতে করতে পুলিশও ডেকে আনে। পটিয়া এবং দোহাহাজারীতে খবর পাঠানো হয়। সেখানে থেকে বিডিআর রওনা হয়। মুসলিম লিগাররা পুলিশ ও উত্তেজিত লোকজন নিয়ে আমাদেরকে ঘেরাও করে ফেলে। পুলিশ আমাদের গ্রেফতার করে, পরে বিডিআর আসে। এরপর বোয়ালখালী থানায় আমাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে শহরে ডিএসবি অফিসে চালন দেওয়া হয়। সেখানে থেকে জেলে, যেখানে তিনবছর আমার যৌবনের সোনালী দিনগুলি অপচিত হয়ে যায়। এই কাজটি বাদল ভাইয়েল সঙ্গে যোগাযোগ রেখে করেছিলাম বলে চার পাঁচ পূর্বে তাঁকে নিয়ে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন আমি বলেছিলাম। বাদল ভাইও সেখানে বক্তব্য রেখেছিলেন, যার সংবাদ চট্টগ্রাম ও ঢাকায় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো।
আমার সঙ্গে যাঁরা গ্রেফতার হয়েছিলেন, তাঁরা হচ্ছেন-আবদুন নূর-লালারহাট, বোয়ালখালী (পরে স্কুল শিক্ষক), মিলন কান্তি সেন-করণখাইন, পটিয়া (বর্তমানে ব্যবসায়ী), নুরুল আমিন- হুলাইন, পটিয়া ও হোসেন-ঘোষখিল, বোয়লখালী।
বাদল ভাই’র রাজনৈতিক প্রতিভা ছিলো, সংগঠন গড়ে তোলার নৈপুণ্য বা ক্ষমতা ছিলো অসাধারণ, দুর্দমনীয় সাহস ছিলো, নিজের বিশ্বাসকে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করার অদ্ভূত ‘অলৌকিক’ ক্ষমতা ছিলো, অসামান্য বাগ্মী ছিলেন, যিনি শুধু কথার জাদুতে মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারতেন। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নেতৃত্বের সহজাত ক্ষমতা ছিলো বলেই তিনি চট্টগ্রামের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেন নি। চট্টগ্রাম জয় করে অচিরেই তিনি দেশ জয় করার মিশনে ঢাকা পৌঁছে গেলেন। চট্টগ্রামের মানুষ এবং জাসদ নেতা-কর্মীদের কাছে মঈনুদ্দিন খান বাদল একজন ভালো নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। কিন্তু দেশ তখনো তাঁকে চিনতো না। ঢাকায় রাজনীতি শুরু করার পর দেখা গেলো, সেখানে জাতীয় নেতাদের ভিড়ে বাদল ভাই হারিয়ে যান নি। স্বতন্ত্র ঔজ্জ্বল্যের দীপ্তি নিয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতেও নিজের স্থান করে নিয়েছেন এবং নিজের জন্য নেতৃত্বের একটি আলাদা আসন তৈরি করে নিতে সক্ষম হয়েছেন।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa