
বড়দল বাজার: অবহেলার রাজনীতি ও হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্য
একটি বাজার শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়। গ্রামীণ ও উপকূলীয় বাংলাদেশে বাজার মানে জীবন, যোগাযোগ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। বাজারকে ঘিরেই গড়ে ওঠে জনপদ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সম্পর্কের জাল। অথচ সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বড়দল বাজারের বর্তমান চিত্র আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়-রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতা কীভাবে একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যকেন্দ্রকে ধীরে ধীরে অকার্যকর করে তুলতে পারে।
দক্ষিণ বঙ্গের একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ মোকাম বড়দল বাজার ছিল কপোতাক্ষ নদনির্ভর একটি সচল বাণিজ্যকেন্দ্র। ‘ছোট কলকাতা’ নামে পরিচিত এই বাজারে একসময় দেশের বিভিন্ন জেলা ও শহর থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন। নদীপথে আসত পণ্য, নদীপথেই ছড়িয়ে পড়ত বাণিজ্যের বিস্তার। আজ সেই বাজার দীর্ঘ অবহেলা, অদূরদর্শী পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে পরিণত হয়েছে বেহাল দশার প্রতীক হিসেবে। বড়দল বাজারের অবক্ষয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়।
এটি দীর্ঘদিনের জমে ওঠা অবহেলার ফল। কপোতাক্ষ নদ ভরাট হয়ে যাওয়ায় নৌপথ বন্ধ হয়েছে-এটি প্রকৃতির দায়। কিন্তু নদী ভরাটের পর বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে না তোলা, বাজার অবকাঠামো আধুনিকায়ন না করা কিংবা ক্রমবর্ধমান জনচাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ না করা-এসব পুরোপুরি মানবসৃষ্ট ব্যর্থতা। বাজারটি বর্তমানে সরকারি পেরিফেরিভুক্ত। নিয়মিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, যে বাজার থেকে সরকার রাজস্ব পায়, সেই বাজারের ন্যূনতম অবকাঠামো উন্নয়নের দায় কার? ভাঙাচোরা রাস্তা, জলাবদ্ধতা, চাঁদনী ঘরের অভাব, পাকা ড্রেন ও শৌচাগারের সংকট-এসব কি কোনো উন্নয়ন রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য? বাংলাদেশে বাজার ব্যবস্থাপনার একটি বড় সংকট হলো-রাজস্ব আদায়কে উন্নয়ন মনে করা।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাজার ইজারা দেওয়া হয়েছে, সরকার টাকা পাচ্ছে, কিন্তু বাজারের ভৌত অবস্থা বছরের পর বছর একই রকম থেকে যাচ্ছে, কখনো আরও খারাপ হচ্ছে। বড়দল বাজার তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বাজারের ভেতরের রাস্তাগুলো এতটাই নাজুক যে পণ্য পরিবহন যেমন কষ্টসাধ্য, তেমনি সাধারণ মানুষের চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় দোকান, বসতঘর ও চলাচলের পথ পানিতে ডুবে যায়। এতে একদিকে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে।
বাজার এলাকায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হয়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। গ্রামীণ হাট ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক উপাদান হলো চাঁদনী ঘর। রোদ-বৃষ্টি থেকে ব্যবসায়ী ও পণ্য রক্ষার জন্য এটি অপরিহার্য। বড়দল বাজারে নিয়মিত হাট বসে, পাইকারি ও খুচরা বেচাকেনা হয়, অথচ হাটুরিয়া ব্যবসায়ীদের জন্য পর্যাপ্ত চাঁদনী ঘর নেই। ফলে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ব্যবসা করতে হয়। এটি শুধু অমানবিক নয়, অর্থনীতিবিরোধীও। যে বাজারে ন্যূনতম সুবিধা নেই, সেখানে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারেন না।
ধীরে ধীরে বাজার তার গুরুত্ব হারায়, বিকল্প বাজার গড়ে ওঠে, আর ঐতিহ্যবাহী বাজারটি পড়ে থাকে অবহেলায়। বড়দল বাজার দীর্ঘদিন ব্যক্তি মালিকানাধীন থাকলেও স্থানীয়দের ত্যাগ ও উদ্যোগে এটি সরকারি ব্যবস্থাপনার আওতায় এসেছে। এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কিন্তু বাজার সরকারি হওয়ার পর উন্নয়নের গতি বাড়ার কথা ছিল। বাস্তবে হয়েছে উল্টো। প্রশাসনিক উদাসীনতায় বাজারটি আজ আরও বেশি সংকটে।
সম্প্রতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার আব্দুল ওয়াহাব মোল্ল্ার নেতৃত্বে বাজারের উন্নয়নের দাবিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, স্থানীয় মানুষ এখনও হাল ছাড়েনি। তারা বাজার বাঁচাতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো-প্রশাসন কি সেই আকাক্সক্ষাকে গুরুত্ব দেবে? সাতক্ষীরা উপকূলীয় জেলা। জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও কর্মসংস্থানের সংকট এখানে নিত্যসঙ্গী।
এই বাস্তবতায় বাজার শুধু বাণিজ্যকেন্দ্র নয়, এটি মানুষের জীবিকার অন্যতম ভরসা। বড়দল বাজারের মতো একটি মোকাম সচল থাকলে আশপাশের হাজারো মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হয়। বাজার উন্নয়ন মানে শুধু দোকানঘর বানানো নয়। এটি কৃষিপণ্য বিপণন, ক্ষুদ্র ব্যবসা টিকিয়ে রাখা, নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি কৌশল। বড়দল বাজারকে অবহেলায় ফেলে রাখা মানে উপকূলীয় অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় স্তম্ভকে দুর্বল করে দেওয়া।
বাংলাদেশে বাজার উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। কোথাও সাময়িকভাবে কিছু করা হয়, কোথাও কিছুই করা হয় না। বড়দল বাজারের ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা জরুরি। এতে থাকতে হবে-টেকসই ঢালাই রাস্তা, পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা,পর্যাপ্ত চাঁদনী ঘর, স্বাস্থ্যসম্মত পাকা শৌচাগার, অগ্নিনিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, এসব কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি সরকারি বাজারের ন্যূনতম মানদন্ড।
উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে বড়দল বাজারের উন্নয়ন কোনো অতিরিক্ত অনুরোধ নয়, এটি তাদের দায়িত্ব। শুধু আবেদন গ্রহণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন, বাজেট বরাদ্দ এবং সময়বদ্ধ বাস্তবায়ন।প্রশাসন যদি সত্যিই রাজস্ব আয় বাড়াতে চায়, তবে বাজারকে ব্যবসাবান্ধব করতেই হবে। উন্নয়ন ছাড়া রাজস্ব টেকসই হয় না-এই বাস্তবতা এখনো না বোঝা গেলে বড়দল বাজারের মতো আরও অনেক ঐতিহ্যবাহী বাজার হারিয়ে যাবে।
বড়দল বাজারের বেহাল দশা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনার সামগ্রিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন হলো-আমরা কি কেবল স্মৃতিচারণেই ঐতিহ্য রক্ষা করব, নাকি বাস্তব উন্নয়নের মাধ্যমে তা টিকিয়ে রাখব? বড়দল বাজার এখন সিদ্ধান্তের মুখে। অবহেলা চললে এটি আরও নিস্তেজ হবে। আর পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে এটি আবারও দক্ষিণ বঙ্গের একটি শক্তিশালী বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের, দায়িত্ব প্রশাসনের-আর প্রত্যাশা মানুষের।
![]()









