
প্রত্যয়-এর উদ্যোগে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

বস্তির সরু গলি, ছোট ছোট ঘর, আর তার ভেতরে বাস করা অজস্র নারীর নিঃশব্দ যন্ত্রণা। এই বাস্তবতার মাঝেই আলোর একটি প্রদীপ জ্বালানোর চেষ্টা করছে কিছু তরুণ-তরুণী। তাদের বিশ্বাস, একজন নারীর সুস্থতা শুধু তার একার নয়, বরং একটি পরিবার, একটি সমাজের ভিত্তি।
“Care for Her, Care for All” — এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া আট জন তরুণ-তরুণীর উদ্যোগে যাত্রা শুরু হয় উন্নয়নমূলক সংগঠন “প্রত্যয় :: Protyoy”-এর। তাদের বিশ্বাস, একজন নারীর সুস্থতা ও মর্যাদার প্রশ্নে নীরবতা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও সহমর্মিতা। সংগঠনটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা হলেন— মাহিন আলম আম্মান, এহতেশাম কবীর তৃ, শোহার্তো আলম প্রান্তি, মো. ফাহিম ইসলাম, ইসরাত জাহান মীম, মোঃ মাহফুজুর রহমান, মুমতাহিনা মিজান এবং আফসানা আক্তার মিমি। সংগঠনের সম্মানিত উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন তরু শাহরিয়ার স্বর্গ, যিনি একজন উন্নয়নকর্মী, গবেষক ও শিক্ষাবিদ।
২৬ জুন, শুক্রবার প্রত্যয়-এর উদ্যোগে রাজধানীর করাইল বস্তিতে অনুষ্ঠিত হলো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সচেতনতামূলক কর্মশালা, যার সাথে আয়োজন করা হয় একটি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পও। এই কর্মশালাটি পরিচালনা করেন ডা. কল্যাণ কৃষ্ণ বর (অর্ণব)— Combined Care Hospital Ltd.-এর পরিচালক, ডা. আজমল হাসপাতালের আইসিইউ ও এনআইসিইউ ইনচার্জ এবং National Debate Federation Bangladesh-এর কো-চেয়ারম্যান। কর্মশালায় তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী তমা বাগচী এবং এবং সংগঠনটির সহ-প্রতিষ্ঠাতারা।
কর্মশালার শুরুতে ডা. অর্ণব নিজেকে এলাকাবাসীর ঘরের ছেলের মতোই একজন ডাক্তার বলে পরিচয় দিয়ে আন্তরিকভাবে আলোচনা শুরু করেন। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে নারীরা নিজেদের যত্নের কথা সবার শেষে ভাবেন, কিন্তু একজন নারী সুস্থ না থাকলে পুরো পরিবারই ভেঙে পড়তে পারে। তিনি প্রজনন স্বাস্থ্যকে সহজভাবে ব্যাখ্যা করেন একজন নারীর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতা হিসেবে, যা মাসিক, গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান এবং যৌন স্বাস্থ্যের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
আলোচনায় তিনি প্রথমে মাসিকের সময়কার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তাঁর মতে, মাসিক কোনো রোগ বা লজ্জার বিষয় নয়, এটি একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এই সময় নোংরা বা ভেজা কাপড় ব্যবহার করলে জরায়ুতে মারাত্মক ইনফেকশন হতে পারে। তিনি পরামর্শ দেন, কাপড় ব্যবহার করলে তা সাবান দিয়ে ধুয়ে রোদে শুকাতে হবে, কখনোই অন্ধকার বা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় শুকানো কাপড় পরা যাবে না, এবং সম্ভব হলে ভালো মানের প্যাড ব্যবহার করা উচিত। এরপর তিনি বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে কথা বলেন। ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া উচিত নয় বলে জোর দিয়ে বলেন তিনি, কারণ এতে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে, অপুষ্টি ও গর্ভকালীন জটিলতা বৃদ্ধি পায়, কম ওজনের শিশু জন্ম নিতে পারে এবং মেয়েদের শিক্ষা ও আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ কমে যায়।
পরিবার পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ডা. অর্ণব বলেন, পরপর দ্রুত সন্তান নিলে মায়ের শরীর ভেঙে যায়, রক্তশূন্যতা দেখা দেয় এবং নবজাতকও দুর্বল হয়ে জন্ম নেয়। তাই একটি সন্তান হওয়ার পর অন্তত ২-৩ বছর সময় দেওয়া উচিত। তিনি জানান, কাছের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা এনজিও ক্লিনিক থেকে বিনামূল্যে বা কম খরচে পিল, ইনজেকশন, কনডোম বা দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি যেমন ইমপ্ল্যান্ট ও কপার-টি নেওয়া যায়, এবং এ বিষয়ে কোনো সংকোচ থাকলে সরাসরি স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
গর্ভকালীন যত্ন নিয়ে তিনি বলেন, গর্ভাবস্থায় অন্তত ৪ বার ডাক্তারের কাছে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা করানো জরুরি। গর্ভবতী মাকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পুষ্টিকর খাবার, বিশেষ করে শাকসবজি, ডাল, ডিম এবং সরকারি হাসপাতালে ফ্রি পাওয়া আয়রন-ক্যালসিয়ামের বড়ি খেতে দিতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত রক্তস্রাব, তীব্র মাথাব্যথা, চোখ ঝাপসা দেখা, শরীর বা মুখ ফুলে যাওয়া, কিংবা প্রচণ্ড জ্বর হলে এক মুহূর্তও দেরি না করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং বাড়িতে দাইয়ের ভরসায় বসে থাকা যাবে না।
সবশেষে তিনি জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সার সচেতনতা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি জানান, ৩০ বছর বয়স হলেই নারীদের সরকারি হাসপাতালে গিয়ে ফ্রি ভায়া (VIA) পরীক্ষা করানো উচিত, যা মাত্র ৫ মিনিটে কোনো ব্যথা ছাড়াই করা সম্ভব এবং আগে ধরা পড়লে এই রোগ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়। তিনি এই পরীক্ষার পর HPV টিকা নেওয়ার পরামর্শও দেন। স্তন ক্যান্সার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্তনে চাকা অনুভব হওয়া, নিপল থেকে রক্ত বা স্রাব নিঃসরণ, অথবা স্তনের আকৃতিতে পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আলোচনার শেষে ডা. অর্ণব উপস্থিত সবাইকে অনুরোধ করেন, রোগ লুকিয়ে না রেখে সরাসরি চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে যোগাযোগ করার জন্য। কর্মশালার শেষ পর্বে উপস্থিত নারীরা তাঁদের নানা প্রশ্ন তুলে ধরেন এবং ডা. অর্ণব ধৈর্য সহকারে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেন।
কর্মশালার পাশাপাশি অনুষ্ঠিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে স্থানীয় বাসিন্দারা বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরামর্শ সেবা গ্রহণ করেন, যা এই উদ্যোগকে আরও কার্যকর ও অর্থবহ করে তোলে। একটি বস্তির ভেতর থেকেই যেন জন্ম নিল একটি ছোট্ট বিপ্লবের বীজ—যেখানে সচেতনতাই হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় ওষুধ, আর ভালোবাসাই হয়ে উঠল সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা।
![]()









