
নারী শিক্ষিকা হেনস্তা: অভিযুক্ত শিক্ষক জিয়ার বিরুদ্ধে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি, দুই দফা শোকজ
নওগাঁর মান্দা উপজেলার পরানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নারী শিক্ষিকাকে কুপ্রস্তাব, হেনস্তা, ব্ল্যাকমেইল ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে আলোচিত সহকারী শিক্ষক (গণিত) জিয়াউর রহমান (জিয়া)-এর বিরুদ্ধে অবশেষে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিধি অনুযায়ী তাকে দুই দফা কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের পর থেকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ওই শিক্ষক এখনও পলাতক রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এর আগে গত ২১ জুন ভুক্তভোগী নারী শিক্ষিকা মান্দা থানায় অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলা হওয়ার পর থেকেই অভিযুক্ত শিক্ষক আত্মগোপনে রয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আখতার জাহান সাথী বলেন, অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষককে বিধি অনুযায়ী দুইবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জানা গেছে, প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন অজুহাতে ওই নারী শিক্ষিকাকে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন অভিযুক্ত শিক্ষক। প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন, সামাজিক ও পেশাগতভাবে ক্ষতির হুমকি এবং ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে বিদ্যালয়ে একটি সালিস বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় অভিযুক্ত শিক্ষক প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেও কিছুদিন পর আবারও একই ধরনের আচরণ শুরু করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষিকার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১০ জুন বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবনের তৃতীয় তলার বারান্দায় নবম শ্রেণির ক্লাসে যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের সামনেই তার পথরোধ করে হেনস্তা করেন জিয়া। পরে প্রধান শিক্ষক এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। এর এক সপ্তাহ পর বিদ্যালয়ের সামনে প্রকাশ্যে তাকে জুতাপেটা করার চেষ্টা করা হয়। উপস্থিত অন্য শিক্ষকরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি সামাল দিলে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।
পরবর্তীতে নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষিকা থানায় মামলা দায়ের করেন। তার দাবি, মামলা করার পর থেকেই মোবাইল ফোন ও অনলাইনের মাধ্যমে তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত ভয়ভীতি, ব্ল্যাকমেইল ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনার প্রতিবাদে পরানপুর উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় এলাকাবাসী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। মানববন্ধনে বক্তারা অভিযুক্ত শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তারা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি প্রতিষ্ঠান থেকে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু অভিযুক্ত শিক্ষক আচরণ পরিবর্তন না করায় ভুক্তভোগী শিক্ষিকা প্রশাসনের আশ্রয় নেন। পরে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
মান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, ভুক্তভোগী শিক্ষিকার দায়ের করা মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষক ঘটনার পর থেকে পলাতক থাকায় তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।
এদিকে তদন্ত কমিটি গঠন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হওয়ায় ভুক্তভোগী শিক্ষিকা ও স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
![]()









