- - -

দূরের দেশ কাছের মানুষঃ “স্বপ্নময় এক সন্ধ্যার মমিতা : আলো, সংগীত আর এক অমলিন অনুভূতির গল্প

Print News

দূরের দেশ কাছের মানুষঃ
“স্বপ্নময় এক সন্ধ্যার মমিতা : আলো, সংগীত আর এক অমলিন অনুভূতির গল্প

-মো.কামাল উদ্দিন

জীবনের ভাঁজে ভাঁজে এমন কিছু দিন জমা হয়ে থাকে, যেগুলো সময়ের ক্যালেন্ডারে একটি সাধারণ তারিখ হলেও হৃদয়ের অ্যালবামে হয়ে ওঠে একেকটি দীপ্ত অধ্যায়। ২০২০ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি—সংযুক্ত আরব আমিরাতের সেই সন্ধ্যাটি আমার জীবনে ঠিক তেমনই এক স্মৃতির নাম, যেখানে বাস্তবতা আর স্বপ্ন এক অদ্ভুত সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল।
রাস আল খাইমাহর এক অভিজাত পাঁচতারকা হোটেল—বাহ্যিক জাঁকজমক যেন ভেতরের আয়োজনের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সোনালি আলোয় ঝলমল করা ঝাড়বাতি, নরম সংগীতের সুর, সুবাসিত পরিবেশ—সব মিলিয়ে এক রাজকীয় আবহ। সেই আয়োজন শুধু একটি অনুষ্ঠান ছিল না, বরং ছিল পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষদের এক সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। আরব অতিথিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, তাদের আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের মিশেলে পরিবেশে এক আলাদা মাত্রা যোগ হয়েছিল।
রাশিয়ান সৌন্দর্যের শীতল দীপ্তি, তুর্কি নারীদের গভীর চোখের ভাষা, ভারতীয় ও পাকিস্তানি নারীদের রঙিন প্রাণচাঞ্চল্য—সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত বিশ্বমানচিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল। এরা সবাই শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, আত্মবিশ্বাসী—নিজ নিজ পরিচয়ে উজ্জ্বল। তাদের হাসি, কথাবার্তা, চলাফেরা—সবকিছুতেই ছিল একধরনের পরিশীলিত সৌন্দর্য।
কিন্তু এই রঙিন ভিড়ের মাঝেই, হঠাৎ করেই আমার দৃষ্টি থেমে গেল একজনের ওপর—মমিতা।
প্রথম দেখাতেই তার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না। তার হাসি ছিল না কেবল ঠোঁটের; সেটি ছিল তার আত্মার ভাষা। যেন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা কোনো ক্লান্ত ভোর হঠাৎ সূর্যের প্রথম আলোয় প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত গভীরতা—যেন সেখানে জমে আছে অসংখ্য গল্প, কিছু বলা, কিছু না বলা, কিছু হয়তো কখনোই বলা হবে না।
তার চুলের এলোমেলো খোঁপা, মাঝে মাঝে হাত দিয়ে ঠিক করে নেওয়ার ভঙ্গি—এই ছোট ছোট অঙ্গভঙ্গিগুলোতেই ছিল এক অসাধারণ স্বাভাবিকতা। কোনো কৃত্রিম সাজসজ্জা নয়, কোনো অতিরিক্ত আড়ম্বর নয়—তবুও তিনি ছিলেন সবার মাঝে সবচেয়ে আলাদা, সবচেয়ে উজ্জ্বল।
পরিচয়টা হয়েছিল খুব স্বাভাবিকভাবে—কথার সূত্র ধরে, হাসির টানে। জানতে পারলাম, তিনি বোম্বে থেকে এসেছেন, তবে জীবনের একটি দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন আমেরিকায়। তার ইংরেজি উচ্চারণে ছিল আন্তর্জাতিক পরিমার্জনা, কিন্তু তাতে বিন্দুমাত্র অহংকার ছিল না। বরং তার প্রতিটি কথায় ছিল আন্তরিকতা, সহজতা—যেন তিনি কথা বলছেন না, বরং অনুভূতি ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
তিনি একজন সংগীতশিল্পী। কথার ফাঁকে যখন তিনি গান গাইলেন, তখন চারপাশের কোলাহল যেন মুহূর্তেই থেমে গেল। তার কণ্ঠে ছিল মায়া, আবেশ, একধরনের অদৃশ্য টান—যা মানুষকে থামিয়ে দেয়, শুনতে বাধ্য করে। আর তার নাচ? সেটি ছিল যেন জীবনের ছন্দের এক নিখুঁত প্রতিফলন—প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল আত্মবিশ্বাস, প্রতিটি ভঙ্গিমায় ছিল সৌন্দর্যের স্বাক্ষর।
সেই সন্ধ্যায় আমি শুধুই একজন দর্শক ছিলাম না—আমি ছিলাম একজন অনুসন্ধানী, একজন গল্পসন্ধানী সাংবাদিক। কিন্তু মমিতার ক্ষেত্রে মনে হয়েছিল, আমি কোনো গল্প খুঁজছি না; বরং গল্প নিজেই আমাকে খুঁজে নিয়েছে।
এক পর্যায়ে আমি তাকে একটি সাক্ষাৎকারের অনুরোধ জানালাম। তিনি হাসিমুখে সম্মতি দিলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বললেন তার জীবনের কথা, সংগীতের প্রতি তার ভালোবাসা, বিভিন্ন দেশে কাটানো অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতির ভিন্নতা আর মানুষের মিল। তার প্রতিটি বাক্য ছিল চিন্তাশীল, পরিমিত—কিন্তু তাতে ছিল না কোনো অভিনয়; ছিল একেবারে সত্যিকারের মানুষ হওয়ার সাহস।
সেই সাক্ষাৎকারের সময় আমি অনুভব করেছিলাম—ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই নারী শুধু একজন শিল্পী নন; তিনি একজন জীবনশিল্পী, যিনি নিজের জীবনকেই এক শিল্পে পরিণত করেছেন।
রাত যত গভীর হচ্ছিল, পরিবেশ ততই যেন ব্যক্তিগত হয়ে উঠছিল। আলো একটু ম্লান, সুর একটু ধীর, কথাবার্তা একটু ঘনিষ্ঠ। একসময় দেখলাম, তার হাতে হাইনিকেন বিয়ারের গ্লাস—হাসতে হাসতে গল্প করছেন, জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলোকে উপভোগ করছেন একেবারে নিজের মতো করে। তার মধ্যে কোনো সংকোচ ছিল না, কোনো ভান ছিল না—তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিজের মতো।
আমি হয়তো তখন ব্লু লেবেলের গ্লাস হাতে বসে আছি, কিন্তু সত্যি বলতে, আমার মন তখন অন্য এক নেশায় ডুবে ছিল। সেই নেশা ছিল না পানীয়ের, ছিল এক অদ্ভুত আকর্ষণের—যার নাম মমিতা।
সাংবাদিকতা ও টেলিভিশন উপস্থাপনার জীবনে আমি বহু মানুষের সংস্পর্শে এসেছি, বহু মুখ দেখেছি, বহু গল্প শুনেছি। দুবাই সফরে আমার পরিচয় অনেকেই চিনতেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি, অসংখ্য সাক্ষাৎকার ধারণ করেছি। কিন্তু এই একটি সন্ধ্যা, এই একটি মানুষ—সবকিছুর মাঝেও আলাদা হয়ে রইলো।
কেন? এই প্রশ্নের উত্তর আজও পুরোপুরি খুঁজে পাইনি।
হয়তো তার মধ্যে ছিল একধরনের নির্মলতা, যা আজকের পৃথিবীতে বিরল। হয়তো তার হাসিতে ছিল এমন এক সত্য, যা মিথ্যার ভিড়ে আলাদা করে চোখে পড়ে। অথবা হয়তো, তিনি ছিলেন সেই মানুষদের একজন যারা কারো জীবনে হঠাৎ করেই এসে একটি স্থায়ী ছাপ রেখে যায়, কোনো প্রতিশ্রুতি ছাড়াই, কোনো দাবি ছাড়াই।
আজ এতদিন পরও, যখন সেই ছবিটির দিকে তাকাই—আমার নিজের হাতে তোলা—মনে হয়, সেটি কেবল একটি ছবি নয়। সেটি একটি সময়ের দরজা, যা খুললেই আমি ফিরে যাই সেই সন্ধ্যায়, সেই আলোয়, সেই সংগীতে, সেই হাসিতে।
মমিতা—সে হয়তো আজ কোথায় আছে, কেমন আছে, জানি না। কিন্তু আমার স্মৃতির ভেতর সে এখনো ঠিক সেভাবেই আছে—একটি উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত, অনির্বচনীয় অনুভূতির নাম হয়ে।
সে শুধু একজন মানুষ নয়—সে এক সন্ধ্যার রূপকথা, এক জীবনের অপ্রকাশিত অধ্যায়, এক অদ্ভুত মায়ার অন্য।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa