- - -

জাল সনদের ছায়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখল: বোয়ালখালীর বিতর্কিত সাংবাদিক মোহাম্মদ আলীর মুখোশ উন্মোচিত

Print News

জাল সনদের ছায়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখল: বোয়ালখালীর বিতর্কিত সাংবাদিক মোহাম্মদ আলীর মুখোশ উন্মোচিত

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার উত্তর গোমদণ্ডী উচ্চবিদ্যালয়ে অ্যাডহক কমিটির সভাপতি পদে নিয়োগ পাওয়া তথাকথিত সাংবাদিক মোহাম্মদ আলীর জাল সনদের সত্যতা যাচাইয়ের পর অবশেষে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড তাকে অব্যাহতি দিয়েছে। এই ঘটনা শুধু একটি বিদ্যালয়ের সভাপতির অপসারণ নয়—এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, এবং সাংবাদিকতার সুনামহানির বিরুদ্ধে এক প্রামাণ্য প্রতিবাদ হয়ে উঠেছে।
৬ আগস্ট বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক মো. আবুল কাসেম স্বাক্ষরিত এক আদেশে জানানো হয়, মোহাম্মদ আলীর অনার্স সনদটি জাল বলে প্রমাণিত হয়েছে। এর আগে ৪ আগস্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইলিয়াস উদ্দিন আহমেদ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির সদস্যরা সাউদার্ন ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট সনদের সত্যতা যাচাই করেন, যা সরাসরি জাল বলে চিহ্নিত হয়।
অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এই মোহাম্মদ আলী কেবল একজন জাল সনদধারী নন—তিনি একটি মাদক মামলায় জেল খেটেছেন বলেও জানা গেছে। আরও বিস্ময়ের বিষয়, এমন একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ও রিপোর্টার্স ফোরামের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেছেন! কেবল তাই নয়, নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করেছেন প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতির পদে জাল সনদ: আইন কী বলে? বাংলাদেশে জাল সনদ ব্যবহার একটি অপরাধ, যা দণ্ডবিধির ৪৬৫, ৪৬৮, ৪৭১ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। দণ্ডবিধি ৪৬৮ ধারা অনুযায়ী, যদি কেউ প্রতারণার উদ্দেশ্যে জাল সনদ তৈরি বা ব্যবহার করে, তাহলে সর্বোচ্চ ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। দণ্ডবিধি ৪৭১ ধারা অনুযায়ী, জাল সনদ knowingly ব্যবহার করা হলে তা প্রকৃত সনদের মতোই অপরাধ বিবেচিত হয়। সুতরাং মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে কেবল পদচ্যুতি নয়— ফৌজদারি মামলা ও সাজা হওয়া অত্যাবশ্যক। শিক্ষা বোর্ড কী ব্যবস্থা নিতে পারে? শিক্ষা বোর্ডের হাতে রয়েছে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা। এর মধ্যে রয়েছে—স্থায়ীভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যেকোনো পদ থেকে বহিষ্কার,জাল সনদের তথ্য তদন্ত করে মামলা দায়েরের জন্য প্রশাসনের কাছে সুপারিশ,যে কমিটির প্রস্তাবে তাকে সভাপতি করা হয়েছিল সেই কমিটির ভূমিকা পর্যালোচনা ও বাতিল,সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সতর্কীকরণ নোটিশ ও প্রশাসনিক নজরদারিতে রাখা, একজন ‘সাংবাদিক’ কিভাবে হয়ে উঠলো শিক্ষা লুণ্ঠনকারী?
এই প্রশ্নটাই এখন মুখ্য।
একজন মাদক মামলায় দণ্ডিত, জাল সনদধারী ব্যক্তি—যিনি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে পরিচিত মহলে সহজে প্রবেশ করতে পেরেছেন, তিনি কীভাবে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হয়ে যান? উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে বহু জায়গায় অসৎ প্রভাব বিস্তার, রাজনৈতিক লবিং, ও তথ্য গোপন করে মনোনয়ন আদায়ের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ও রিপোর্টার্স ফোরামের দায়িত্বে থাকা প্রশ্নবিদ্ধ এই ব্যক্তি কিভাবে এতদূর? এই প্রশ্নের জবাব দিতে হলে আমাদের নিজেদের পেশা—সাংবাদিকতার ভেতরেই তাকাতে হবে। কিছু সুবিধাবাদী, আত্মস্বার্থে নিমজ্জিত ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে এমন অপরাধীদের আশ্রয় দেয়। তাদের মধ্যে তৈরি হয় একধরনের সাংবাদিকতার ছদ্মবেশী মাফিয়া চক্র, যারা কলমের দায় নয়—ক্ষমতার দম্ভ বয়ে বেড়ায়। এখানে শুধু মোহাম্মদ আলী একা দায়ী নন, দায়ী সেই পরোক্ষ প্রশ্রয়দাতারাও, যারা তাকে পদে বসিয়েছে, এবং এতদিন চোখ বন্ধ করে থেকেছে। সমাপ্তি নয়, এই উন্মোচন হোক সূচনা
মোহাম্মদ আলীর অপসারণ কোনো বিজয় নয়—এটি লজ্জা, এটি শিক্ষা, এবং এটি আমাদের জন্য এক চেতনা জাগানিয়া দৃষ্টান্ত। এখনই সময়, সাংবাদিক সমাজকে আত্মশুদ্ধি করতে হবে। প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে চাই শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা। সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে অপরাধীদের জায়গা দেওয়া বন্ধ না হলে, সমাজে সাংবাদিকতার প্রতি সম্মান শুধু কমবে না—সন্দেহ ও বিতৃষ্ণার চোখে দেখা হবে আমাদের সবাইকে। আজ বোয়ালখালীর এক বিদ্যালয়ে মোহাম্মদ আলীর মুখোশ খুলেছে—আগামীকাল যেন আর কাউকে এই কুখ্যাত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে না হয়।
এটাই হোক আমাদের সামাজিক, পেশাগত ও নৈতিক অঙ্গীকার।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa