
জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও টেকসই পুনর্বাসন এখন সময়ের দাবি
‘জলবায়ু উদ্বাস্তু ৮ হাজার পরিবার সাতক্ষীরা শহরে জলাবদ্ধতার নতুন ফাঁদে’ বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনের মর্মানুযায়ীÑ সাতক্ষীরা শহরে এখন প্রায় ৭০হাজার মানুষ বাস করছেন বিভিন্ন বস্তিতেÑ যাদের অধিকাংশই জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তারা এসেছেন নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, কিংবা জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে। কেউ এসেছেন গাবুরার নদীপাড় থেকে, কেউ বা আশাশুনির বিলাঞ্চল থেকে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে শহরেও তাদের জন্য নেই নিরাপদ আশ্রয়, বরং তারা পড়েছেন এক দুর্যোগ থেকে আরেক দুর্যোগে।
সাতক্ষীরা শহরের এই বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন চরম মানবিক সংকটে—বৃষ্টি হলেই ঘরে পানি ওঠে, ভেঙে পড়ে স্যানিটেশন ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির অভাবে ছড়িয়ে পড়ে রোগ। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, সীমিত সক্ষমতা নিয়ে পৌরসভা কিছু উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু এতেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
এই জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য কোনো সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় নীতিমালা নেই। এটাই সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য। ৮,৫০০ পরিবার, ৩৫ হাজারেরও বেশি মানুষ বছরের পর বছর ধরে বস্তিতে মানবেতর জীবন যাপন করলেও এখনো রাষ্ট্র তাদের “নাগরিক” হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেনি। অথচ প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনায় তাদের কথা থাকা উচিত ছিল।
এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণÑ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও টেকসই পুনর্বাসন কৌশল। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে যদি সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত না করা হয়, তারা কখনোই সরকারি সুবিধা, সেবা বা সহায়তার আওতায় আসতে পারবে না। একইসঙ্গে শহর পরিকল্পনায় তাদের জন্য নিরাপদ বাসস্থান, সুপেয় পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।
জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি এতো ভয়াবহ যে, মানুষকে ভেলায় ভর করে চলাচল করতে হচ্ছে। এর কারণ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, নদী-খাল খননে অনিয়ম, দখলদারি ও অকার্যকর স্লুইস গেট। এই পরিস্থিতি শুধু একটি শহরের দুর্দশা নয়, বরং জলবায়ু অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির একটি ভয়াবহ চিত্র।
আমরা মনে করি, এখনই সময় একটি ‘জলবায়ু অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা নীতি’ প্রণয়নের, যাতে বাস্তুচ্যুত মানুষদের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, পুনর্বাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়। এছাড়া স্থানীয় সরকার, সিভিল সোসাইটি ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন কাঠামো গঠনও জরুরি।
জলবায়ু উদ্বাস্তুদের সমস্যাকে শুধু মানবিক দৃষ্টিতে নয়, উন্নয়ন, পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের জায়গা থেকে দেখতে হবে। শহরকে প্রস্তুত না করে হাজার হাজার উদ্বাস্তু মানুষকে এখানে ঠেলে দেওয়া মানে শুধু শহরের উপর চাপ বাড়ানো নয়, বরং একটি সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীকেও প্রতিনিয়ত হুমকির মধ্যে ফেলে দেওয়া।
আমরা চাই, রাষ্ট্র যেন এই সংকটকে উপলব্ধি করে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচয় দেয়। নয়তো সাতক্ষীরার এই জলাবদ্ধ শহর হবে ভবিষ্যতের অনেক শহরের প্রতিচ্ছবিÑযেখানে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের আশ্রয় নেই, অধিকার নেই, ভবিষ্যৎ নেই।
![]()









