- - -

চট্টগ্রামী কথা : ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীকী ভাষ্য – “সারেং–শুঁটকি–দরগা” : চাটগাঁর সভ্যতা-সূত্র

Print News

চট্টগ্রামী কথা : ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীকী ভাষ্য – “সারেং–শুঁটকি–দরগা” : চাটগাঁর সভ্যতা-সূত্র
————————————-
সোহেল মো. ফখরুদ-দীন
—————————————-

“সারেং, শুঁটকি, দরগা—তিনে মিলে চাটগাঁ।”
— আহমেদ আমিন চৌধুরী, (ইতিহাস রচয়িতা, চাটগাঁইয়া ভাষা গবেষক ও সংরক্ষক)।
চট্টগ্রাম শুধু একটি ভূখণ্ড নয়—এটি একটি সভ্যতা। এই সভ্যতার আত্মপরিচয়কে এক বাক্যে ধরতে পারার বিরল কৃতিত্ব দেখিয়েছেন ইতিহাসবিদ আহমেদ আমিন চৌধুরী তাঁর উক্তিতে—
“সারেং, শুঁটকি, দরগা—তিনে মিলে চাটগাঁ।”
এই উক্তি একটি কাব্যিক অলংকার নয়, বরং চট্টগ্রামের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আধ্যাত্মিক ইতিহাসের একটি প্রতীকী মানচিত্র।
যেমন “গঙ্গা–যমুনা–সরস্বতী” উত্তর ভারতের সভ্যতার তিন প্রবাহ, তেমনি “সারেং–শুঁটকি–দরগা” চাটগাঁর তিন মৌলিক স্তম্ভ।
১. সারেং : সমুদ্রসভ্যতার পরিচয়:
“সারেং” শব্দটি কেবল একটি নৌযানের নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিকে বোঝায় না। এটি চট্টগ্রামের হাজার বছরের নৌবাণিজ্যিক সভ্যতার সংকেত।
আরব, পারস্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ, জাহাজ চলাচল, বন্দরের বিকাশ এবং নাবিকজীবন—এই সবকিছুর ঐতিহাসিক স্মারক এই একটি শব্দ।
চট্টগ্রাম যে একটি বিশ্বমুখী বন্দরনগরী, তার পরিচয় সারেং ধারণ করে।
২. শুঁটকি : শ্রম ও লোকজ অর্থনীতি:
শুঁটকি চট্টগ্রামের খাদ্যসংস্কৃতির চেয়েও বড় কিছু—এটি উপকূলীয় অর্থনীতির ভাষ্য।
জেলে, মাছধরা, শুকানো, হাট-বাজার, পরিবার ও শ্রমের যে চক্র—তাতে গড়ে উঠেছে চাটগাঁর সাধারণ মানুষের জীবন।
শুঁটকির ঘ্রাণে আছে – সমুদ্রের লবণ, ঘামের ইতিহাস, এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের সংগ্রাম।
৩. দরগা : আধ্যাত্মিক সভ্যতার কেন্দ্র :
চট্টগ্রামের পরিচয়ের তৃতীয় স্তম্ভ দরগা।
দরগা শুধু ধর্মীয় স্থান, সমাধি নয়—এটি মানবিক ও নৈতিক সভ্যতার কেন্দ্র।
সুফি-সাধক ও ওলিয়াদের দরগা চট্টগ্রামকে দিয়েছে সহনশীলতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও দরিদ্রবান্ধব সামাজিক চেতনা।

IMG 20260115 WA0260 300x243
চট্টগ্রামের ইসলাম কেবল আচার নয়—এটি মানবিক সুফিবাদী সংস্কৃতি। সভ্যতার ত্রিবেণী
এই তিন উপাদান একত্রে চট্টগ্রামকে করেছে—
একদিকে বাণিজ্যের বন্দর,
অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষের শহর,
আর গভীরে সুফিবাদী মানবিক সমাজ।
এই কারণেই আহমেদ আমিন চৌধুরীর উক্তিটি একটি সভ্যতা-সংজ্ঞা। আহমেদ আমিন চৌধুরী : ইতিহাসের উত্তরাধিকার। আহমেদ আমিন চৌধুরী (১৫ জানুয়ারি ১৯৫০ – ৮ এপ্রিল ২০২১) ছিলেন, চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ভাষার একনিষ্ঠ গবেষক। তিনি কিংবদন্তি ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরীর সন্তান এবং তাঁর গবেষণা-উত্তরাধিকার বহনকারী। বাংলাদেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হয়েও তিনি ইতিহাসচর্চা থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি ১৬টি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করে চট্টগ্রামের ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি ছিলেন
রাষ্ট্রের দায়িত্বে একজন শৃঙ্খলাবাহক,
আর ইতিহাসের ক্ষেত্রে একজন নির্ভীক প্রহরী।
১৫ জানুয়ারি তাঁর জন্মদিন। দি একাডেমি অব হিস্ট্রি বাংলাদেশ (ইতিহাসের পাঠশালা) এবং
চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র (সিএইচআরসি)
এই মহান ইতিহাসসাধককে ২০২৬ সালের জন্মদিনে জানাচ্ছে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
চাটগাঁর সভ্যতা যতদিন বাঁচবে,
“সারেং–শুঁটকি–দরগা” ততদিন তার আত্মার ভাষা হয়ে থাকবে।
——–
লেখক : সোহেল মো. ফখরুদ-দীন,
সভাপতি, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র (সিএইচআরসি), বাংলাদেশ।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa