
ঘরের আলো জ্বলে, শ্রমিকের অধিকার অন্ধকারে
আবদুল্লাহ মজুমদার
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। চট্টগ্রামের কোনো এক বাসাবাড়ির রান্নাঘরে চুলা জ্বলে উঠেছে। ঘুমজড়ানো চোখে কেউ হাঁড়ি চাপাচ্ছেন, কেউ ঝাড়ু দিচ্ছেন, কেউ থালাবাসন ধুচ্ছেন। একটু পর শিশুকে ঘুম থেকে তুলতে হবে, স্কুলের প্রস্তুতি নিতে হবে। বাড়ির বয়স্ক মানুষটির ওষুধের সময়ও মনে রাখতে হবে। পরিবারের অন্যরা যখন দিনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তাঁর দিনের অনেকটা কাজ ইতোমধ্যে শেষ। অথচ দিন শেষে এই মানুষটির নিজের কর্মঘণ্টার হিসাব নেই, নিশ্চিত ছুটি নেই, মজুরির নিশ্চয়তা নেই; অনেক সময় নেই নিরাপদে অভিযোগ করার সাহসটুকুও। অন্যের ঘরকে প্রতিদিন সচল রাখা এই শ্রমজীবী মানুষের অধিকারই যেন পড়ে থাকে সেই ঘরের দরজার আড়ালে।
এ বাস্তবতা বদলানো জরুরি। কারণ গৃহকর্মী ‘কাজের লোক’ নন; তিনি শ্রমিক। তাঁর কর্মস্থল কারখানা বা অফিসের বদলে কোনো বাসাবাড়ি—এটিই কেবল পার্থক্য। তাই ঘরের ভেতরে শ্রম দিলেই তাঁর শ্রমের মূল্য, মর্যাদা ও অধিকার ঘরের দরজার বাইরে পড়ে থাকতে পারে না।
বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এ গৃহকর্মীদের ‘শ্রমিক’-এর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। দীর্ঘদিনের অদৃশ্য শ্রমকে আইনি স্বীকৃতির আওতায় আনার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাতেই হবে। তবে আইনে নাম যুক্ত হওয়াই শেষ কথা নয়। বরং আসল প্রশ্ন এখন—এই স্বীকৃতি গৃহকর্মীর জীবনে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনবে?
বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী অ্যাড. এম এন মোস্তফা নুরের কাছে গৃহকর্মীদের বেতন-ভাতা ও কর্মঘণ্টা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আইন অনুযায়ী শ্রমঘণ্টা সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা। প্রয়োজন অনুযায়ী এই আট ঘণ্টা চার ঘণ্টা করে দুই ভাগেও ভাগ করা যেতে পারে।’
কিন্তু বাস্তবতা কী বলছে? বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ—বিলসের গবেষণায় দেখা গেছে, আবাসিক গৃহকর্মীদের অনেকে দৈনিক ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেন। ৮৭ শতাংশ সাপ্তাহিক ছুটি পান না এবং এক-তৃতীয়াংশের বেশি দৈনিক ১২ ঘণ্টারও বেশি কাজ করেন। কাজের মধ্যে বিরতি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে মাত্র ৪৬ শতাংশের।
এখানে শুধু কর্মঘণ্টার প্রশ্ন নয়; প্রশ্ন হলো জবাবদিহির। একজন গৃহকর্মী যদি নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি কাজ করেন, অতিরিক্ত শ্রমের মূল্য কে নির্ধারণ করবে? ছুটি না দিলে তাঁর প্রতিকার কী? আর এসব বিষয় তদারকই বা করবে কে?
গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে সমস্যার বড় অংশ তৈরি হয় লিখিত চুক্তির অনুপস্থিতি থেকে। বিলসের গবেষণায় অংশ নেওয়া কোনো গৃহকর্মীরই আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র বা লিখিত কর্মচুক্তি ছিল না। অধিকাংশের চাকরির শর্ত নির্ধারিত হয় মৌখিকভাবে। ফলে কাজের পরিধি বাড়ানো, কর্মঘণ্টা দীর্ঘ করা, ছুটি না দেওয়া কিংবা মজুরি নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে গৃহকর্মীর হাতে থাকে না কোনো কার্যকর প্রমাণ।
এটি নিছক কাগজপত্রের সমস্যা নয়; এটি ক্ষমতার ভারসাম্যের সমস্যা। লিখিত চুক্তি না থাকলে দুর্বল পক্ষের ওপর শর্ত চাপিয়ে দেওয়া সহজ হয়। তাই প্রতিটি গৃহকর্মীর জন্য কাজের ধরন, কর্মঘণ্টা, মজুরি, ছুটি, চিকিৎসা ও চাকরি শেষ করার শর্ত উল্লেখ করে লিখিত বা ডিজিটাল কর্মচুক্তি থাকা জরুরি।
মজুরির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন। বিলসের গবেষণায় গৃহকর্মীদের গড় মাসিক মজুরি ৫ হাজার ৩১১ টাকা; বিপরীতে গড় মাসিক ব্যয় ১০ হাজার ৮০১ টাকা। ৯৬ শতাংশ জানিয়েছেন, এই আয় দিয়ে তাঁদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন।
তাহলে ‘ন্যায্য মজুরি’ বলতে আমরা কী বুঝব? শুধু প্রচলিত বাজারদর? নাকি কর্মঘণ্টা, কাজের ধরন, দায়িত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে? একজন গৃহকর্মী যদি রান্না থেকে শুরু করে শিশুর দেখাশোনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও বয়স্ক মানুষের পরিচর্যা—সবই করেন, তাহলে তাঁর শ্রমের মূল্যও দায়িত্ব অনুযায়ী নির্ধারিত হওয়া উচিত। স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন নিশ্চিত করতে গিয়ে অন্য একজনের শ্রমকে ন্যূনতম মূল্যে আটকে রাখা কোনোভাবেই ন্যায্যতার সঙ্গে যায় না।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় নির্যাতন। বিলসের গবেষণায় ৬৭ শতাংশ গৃহকর্মী মানসিক নির্যাতন, ৬১ শতাংশ মৌখিক হয়রানি এবং ২১ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। অধিকাংশই আবার নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেন না। চাকরি হারানোর ভয়, অসহায়ত্ব, আইনি অজ্ঞতা এবং সামাজিক অবস্থান তাঁদের নীরব থাকতে বাধ্য করে।
চট্টগ্রামের একটি ঘটনা এ বাস্তবতার নির্মম দিকটি সামনে আনে। নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটিতে ২০১২ সালে রুটি পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় এক নারী গৃহকর্মী গুরুতর নির্যাতনের শিকার হন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। মামলা ও অভিযোগপত্র দাখিলের পরও বিচার শেষ হতে প্রায় ১৪ বছর লেগেছে। ২০২৬ সালে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ মামলাটিতে অভিযুক্ত নারীকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
বিচার হয়েছে—এটি স্বস্তির। কিন্তু প্রায় ১৪ বছরের বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা আমাদের আরেকটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—দরিদ্র ও প্রান্তিক একজন শ্রমিকের জন্য ন্যায়বিচারের অপেক্ষা কি এত দীর্ঘ হওয়া উচিত?
আর শিশু গৃহকর্মীদের বিষয়টি তো আরও স্পর্শকাতর। ২০২৪ সালে ঢাকার ১২টি থানার এলাকায় ৩৫২ জন শিশুগৃহকর্মীকে নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, তাঁদের ৯৭ শতাংশই মেয়ে শিশু। প্রায় অর্ধেক কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অতিরিক্ত কাজের চাপ, শারীরিক আঘাত, মারধর ও মৌখিক নির্যাতনের ঘটনাও উঠে এসেছে গবেষণায়।
শিশুশ্রম বন্ধের কথা আমরা বহু বছর ধরে বলছি। কিন্তু শুধু স্লোগানে শিশুশ্রম বন্ধ হবে না। দরিদ্র পরিবারকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা, শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের শনাক্ত করে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুর হাতে মজুরি তুলে দেওয়া হচ্ছে কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—কেন একটি শিশু শ্রমে যাচ্ছে?
চট্টগ্রামের জন্য এ প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। নগরে কত গৃহকর্মী কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে কতজন শিশু, কতজন আবাসিক, তাঁদের কর্মঘণ্টা ও মজুরি কত—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য স্থানীয় তথ্যভান্ডার কোথায়? সমস্যা কত বড়, তা না জেনে কার্যকর নীতি তৈরি করা সম্ভব নয়।
তাই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, স্থানীয় প্রশাসন, শ্রম অধিদপ্তর, নারী ও শিশু বিষয়ক দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করা যেতে পারে। একই সঙ্গে গৃহকর্মীদের জন্য সহজ ও নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা, আইনি সহায়তা এবং জরুরি সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫’ রয়েছে। এখন প্রয়োজন নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নতুন আইনি স্বীকৃতিকে বাস্তব অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। সরকারকে যেমন দায়িত্ব নিতে হবে, তেমনি নিয়োগকর্তাকেও বুঝতে হবে—ন্যায্য মজুরি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, ছুটি, চিকিৎসা ও সম্মান কোনো অনুগ্রহ নয়; এগুলো শ্রমের ন্যায্য পাওনা।
সবশেষে পরিবর্তন করতে হবে আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা গৃহকর্মীর শ্রম চাই, কিন্তু তাঁর অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাই না—এই দ্বৈত মানসিকতা আর চলতে পারে না। একটি বাসাবাড়ি ব্যক্তিগত পরিসর হতে পারে; কিন্তু সেখানে কর্মরত একজন মানুষের শ্রম ও মর্যাদা ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।
রাত গভীর হলে চট্টগ্রামের ব্যস্ত নগরী ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে। একে একে নিভে যায় বাসাবাড়ির আলো। সারাদিন অন্যের ঘর গুছিয়ে, রান্না করে, শিশুকে সামলে কিংবা বৃদ্ধের পাশে থেকে ক্লান্ত শরীরটিও তখন হয়তো কোনো ছোট্ট কোণে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকে সেই গৃহকর্মীর। আগামী ভোরে আবার উঠতে হবে, আবার অন্যের ঘর সচল করতে হবে। অথচ তাঁর নিজের জীবনে হয়তো এখনো নেই একটি নিয়োগপত্র, নিশ্চিত ছুটি, ন্যায্য মজুরির নিশ্চয়তা কিংবা নির্ভয়ে কথা বলার অধিকার। যে নগরের হাজারো পরিবার তাঁর শ্রমে স্বস্তিতে দিন কাটায়, সেই নগর কি তাঁর অধিকার নিশ্চিত করার দায় এড়িয়ে যেতে পারে? পারে না। কারণ গৃহকর্মীকে শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর এখন আর কাগজে অধিকার লিখে রাখাই যথেষ্ট নয়—সেই অধিকার পৌঁছে দিতে হবে ঘরের ভেতর, মানুষের জীবনে। ঘরের দরজা ব্যক্তিগত হতে পারে, কিন্তু সেই দরজা বন্ধ হলেই কোনো শ্রমিকের অধিকার বন্ধ হয়ে যেতে পারে না।
লেখক: সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষক।
![]()









