
আমি পাগল হতে চাই
– মো. কামাল উদ্দিন
এবারের কান্ড জ্ঞানহীন আমার পাগলামি লেখা। আমি পাগল হইতে চাই! এ বিষয়ে কারও মনে যদি কোনও সংশয় থাকে অনুগ্রহ করে এ পাগলামি লেখা পড়বেন না। যদি পড়েন, তাহলে আমার মতো পাগলামি করবেন না।
এক পাগল তাঁর বাড়ির রাস্তার দিকের বারান্দায় বসে একটি জলভরা (পানিভরা) গামলায় ছিপ ফেলে মাছ ধরছিলেন। পথ দিয়ে যেতে যেতে এই দৃশ্য দেখে কৌতুহলী একজন জিজ্ঞাসা করলেন,‘মশায়’ ক’টা ধরা পড়ল? এর উত্তরে ওই পাগল দাঁত খিঁচিয়ে জবাব দিয়েছিলেন আপনাকে নিয়ে তিনটে। এর আগে আরো দুটো বোকা ধরেছি! ওই ভদ্রলোক লজ্জায় জিব কেটে বলেছিলেন কী বলেছেন দাদা, বারান্দায় গামলার মধ্যে মাছ আসবে কী করে? পাগল নাকি? পাগল দু’ রকম। রাস্তায় পাগল ও ঘরের পাগল। আমি কেন পাগল হতে চাই তা পরে বলব। তবে আমার পাগল হওয়ার ইচ্ছা পোষণ অনেক আগের। সংগত কারণে আমার ইচ্ছা পূরণ হয় নাই। তবে অনেক পাগলদের সাথে আমার সখ্যতা রয়েছে। যেমন আমাদের চেরাগী পাহাড়ের নুর মিঞা পাগলের পাগলামি দেখলে আমার ভীষণ লোভ হয়, পাগল সাজতে। নুর মিঞা পাগলের বয়স সম্ভবত ২৮ থেকে ৩০ বছর হবে। তবে তাঁর বাড়ি কোথায় কেউ জানে না। গাজা দিয়ে বিড়ি বানিয়ে খেয়ে রাজা সেজে রাস্তায় পড়ে থাকে। কোনও চিন্তা ভাবনা নেই তাঁর। আমার সাথে নুর মিঞা পাগলার সখ্যতা রয়েছে। মাঝে মাঝে তাঁকে নিয়ে আহার করি। যাক বাবা অনেক কথা। তবে সবকথা পাগলামি নয়। পাঠককুল আমি কেন পাগল হইতে চাই তাঁর কাহিনিতে যাওয়ার আগে আমার এক পরিচিত জনের কথা জানি তিনি পাগল হতে গিয়ে কি কি সমস্যায় পড়েছেন। নগর বিশ্রুত এক মদ্যপের কথা অনেকেই জানেন। তিনি প্রতি সন্ধ্যায় গ্লাসে একটু একটু করে পানীয় ঢালতেন, আর অল্প পরেই কাঁদতে শুরু করতেন। আমার কী যে হয়েছে যত খাই তবুও কিছুতেই নেশা হয় না। অল্প খাওয়ার পরেই তাঁর এই দুঃখ শুরু হত এবং তারপরে ক্রমশ খেয়ে যেতেন। ফলত নেশা বেড়ে যেত, আর নেশা হয় না বলে আরও বিলাপ জুড়ে দিতেন। যখনই নটবর হালদারের কথা মনে পড়ল আমার সঙ্গে সঙ্গে পাগল হওয়ার কাহিনিটি মনে পড়ে যায়। নটবর হালদার পাগল হতে চেয়েছিলেন। তাকে কে যেন বলেছিল কাকের মাংস খেলে মানুষ পাগল হয়ে যায়। বহু কষ্টে তিনি একটি কাক সংগ্রহ করেছিলেন। তারপর যথারীতি সেটাকে কেটে মাংস রান্না করে খেয়েছিলেন। খেতে কেমন লেগেছিলেন তিনি ভালো জানেন। কিন্তু তারপর থেকে দৈনিকই তিনি যেভাবে হোক একটি করে কাক ধরে এনে তাঁর মাংস খেতেন। আর কেবলই আক্ষেপ করতেন। কী করে যে পাগল হব বলুন দেখি? কাকের মাংস খেলে নাকি পাগল হয়? কত যে কাকের মাংস খেলাম ধরতে গেলে প্রতিদিনই একটা করে কাক রান্না করে খাচ্ছি কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না আমার।
নটবর বাবুর কিছু হল না বটে কিন্তু নটবর বাবুর পাড়ার লোকেরা পাগল হয়ে উঠলেন। জবাই করা কাকের পালক রাস্তায় ফেলে দিতেন বিশ্বজগৎ সংসারের যেখানে যত কাক ছিল নটবর বাবুদের পাড়ায় এসে চেঁচামেচি শুরু করে দিল। আর সে কী চেঁচামেচি। হাজার হাজার কাকের চিৎকার কান পাতা যায় না। ছাদে কাক প্রত্যেক জানালার আলসের কাক। র্যাম্পপোষ্টের আষ্টেপৃষ্টে কাক সব তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। কাকের চিৎকার ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা কিছু শোনা যাচ্ছে না। আর যত কোলাহল বাড়ছে দূর দূরান্ত থেকে আরো কাক চেঁচাতে চেঁচাতে ছুটে আসছে।
দিনের পর দিন এই রকমই চললো। পাড়ার লোকেরা অস্থির, শুধু নটবর বাবুই ভ্রুক্ষেপ নেই। বহু লোক পাড়া ছেড়ে চলে গেল। পাড়ার মধ্যে দু’টো স্কুল বন্ধ হয়ে গেল। ওই পাড়ার বাড়িভাড়া কমতে কমতে দুই কামরার
ফ্ল্যাট পনেরো শত টাকা এসে দাঁড়ালো। পাড়ার দু-একজন প্রভাবশালী লোক ওপরের মহলে নালিশ জানাল। কিন্তু তাঁরা কেউই কিছু করতে সক্ষম হলেন না। কোথাও কোনও আইন নেই যার বলে কাকের মাংস খাওয়ায় বা রাস্তায় কাকের ফালক ফেলায় বাধা দেওয়া যেতে পারে। একজন পরামর্শ দিলেন। পশুক্লেশ নিবারণী সমিতির কাছে যাবার কিন্তু পশুক্লেশ সমিতি কী করবে? তাঁরা একটা চিঠি দিলেন নটবরবাবুকে। কাকের মতন এমন নিরীহ পাখিতে প্রত্যহ হত্যা করা অতি গর্হিত কাজ। অন্তত আপনার মতো সদাশয় ব্যক্তির পক্ষে!
নটবর বাবু পরদিনই জবাব দিলেন, আমি মোটেই সদাশয় নই। আমাকে খ্যাপাাবেন না মশায়রা। আমি পাগল হতে চাই। তাই কাকের মাংস খাই। আর কাক মোটেই নিরীহ পাখি না, তাহলে তাদের অত্যাচারে আমাদের পাড়ার লোকেরা বাড়ি ছেড়ে চলে যেত না। তাছাড়া বহুদিন ধরে মানুষ হাঁস-মুরগি এসব কেটে খাচ্ছে। আগে সেটা প্রতিরোধ করুন, তারপর আমাকে বলবেন। বলা বাহুল্য, এরপর পশুক্লেশ নিবারণী সমিতি আর একটুও এগোয়নি তবে পাড়ার লোকের পীড়পীড়িতে থানা থেকে একদিন লোক এসেছিলো। ঠিক একদিন নয় দু’দিন এসেছিলো। একদিন দিনের বেলায় কিন্তু সেদিন কাকের ভিড় ঠেলে হরিপদ জমিদার এবং তার সঙ্গীরা নটবর বাবুর পাড়ায় ঢুকতে না পেরে ফিরে যায়। পরের দিন সন্ধ্যা বেল্য়া এল।
কিন্তু পুলিশেই বা কী করবে? তারা নটবর বাবুকে অনেক রকম ভয় দেখান তিনিও নাছোড়বান্দা। ভয়পাবার লোক নন। আর পুলিশের কী ক্ষমতা আছে এ ব্যাপারে। কেউ আত্মহত্যা করার চেষ্টা করছে তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু কেউ পাগল হওয়ার চেষ্টা করছে তার জন্যে ধরে নিয়ে যাওয়ার বিধান কোনও পুলিশ সংহিতায় নেই। নটবর বাবুর মতো পাগল হওয়ার জন্য আমিও কাকের মাংস খাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও কাকের চেঁচামেচির ভয়ে কাকের মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকছি । কিন্তু বর্তমান দেশের অবস্থার নিরিকে পাগল হয়ে যাচ্ছি, যেমন- দেশের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ফরমালিন, টে-ারবাজি, চাঁদাবাজি, গুম হত্যা,রাহাজানি, অপহরণ, নারী ধর্ষণ, খাদ্যদ্রব্যের মুল্যের উর্ধ্বগতি ও জানমালের নিরাপত্তাহীনতাসহ বহুবীদ সমস্যার কারণে পাগল হওয়ার চেষ্টা ব্যর্তীত পাগল হয়ে যাচ্ছি। তবে এমপি মন্ত্রী বানার জন্য এবং র্যাব, পুলিশ কর্তৃক সাধারণ মানুষ হত্যার রহস্য উদঘাটনের জন্য, দুর্নীতিবাজদেরকে চিহ্নিত করে প্রকাশ্য শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য পাগল হতে চাই। পাগলের কোনও দোষ নেই। কথায় আছে- “পাগলে কি না বলে , ছাগলে কি না খাই” আমার শেষ ইচ্ছা আমি পাগল হবো। পুরো দেশের পাগলদেরকে নিয়ে পাগল সম্মেলন করব। পাগলের পাগলামির মাধ্যমে দেশকে পাগল মুক্ত করব। পরিশেষে ছোট একটি পাগল কাহিনি বলে শেষ করব। এক মন্ত্রী পাগলা গারদ পরিদর্শন করতে গিয়ে জরুরী প্রয়োজনে মন্ত্রী থানায় ফোন করলেন, মন্ত্রী বললেন, ওসি সাহেব আমি পাগলাগারদ থেকে মন্ত্রী বলছি। তখন ওসি মন্ত্রীকে বললেন, এই পাগল তুই আমার ফোন নম্বর কোথার থেকে পাইচ্ছ? মন্ত্রী বললেন ওসি সাহেব সত্যিই আমি মন্ত্রী বলছি। ওসি আমি জানি ঐখানে যারা যায় তাঁরা নিজেকে মন্ত্রী মন্ত্রী মনে করে। যাক বাবা কোনও ভাবে একবার পাগল হতে পারলে মন্ত্রী হওয়া যাবে।
লেখক-সাংবাদিক,প্রাবন্ধিক , গবেষক, মহাসচিব, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম,
![]()









