- - -

বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে মিলল না রাষ্ট্রীয় সম্মান!

img 20261106 wa0206~2
Print News

বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে মিলল না রাষ্ট্রীয় সম্মান!

 

“​স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে প্রশাসনের অবহেলা- ব্রাহ্মণপাড়ায় সমালোচনার ঝড়”

​একাত্তরের রণাঙ্গনে যিনি বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীন মানচিত্র, মৃত্যুর পরে সেই বীর মুক্তিযোদ্ধার কপালে জুটেছে কেবল প্রশাসনিক উদাসীনতা আর নিদারুণ অবহেলা। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা এই বীর সেনানিকে শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বা ‘গার্ড অব অনার’ না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে। কুয়াশাঘেরা এক গোধূলিলগ্নে রাষ্ট্রীয় সম্মানহীন দাফন সম্পন্ন হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছে এলাকাবাসী, যা নিয়ে পুরো কুমিল্লাজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
​বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার (৭৮) দীর্ঘ কর্মজীবনে যোগাযোগ ও আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। বার্ধক্যের শেষ দিনগুলো তিনি ঢাকায় ছেলের কাছে কাটিয়েছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকার মাটিতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ওই দিনই ঢাকায় প্রথম জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ ব্রাহ্মণপাড়া সদর ইউনিয়নের মহালক্ষীপাড়া গ্রামে আনা হয়। পৌঁছাতে পৌঁছাতে সাড়ে ৫টা বেজে যাওয়ায় শোকার্ত পরিবার ও এলাকাবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকেন—যদি বীরের এই শেষ যাত্রায় রাষ্ট্রীয় সালাম ও গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও প্রশাসনের কোনো কর্ণপাত মেলেনি।
​মরহুমের ভাই শাহজাহান আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম আমার ভাইকে শেষ সম্মানটুকু জানিয়ে চিরবিদায় দিতে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। আমরা আজ লজ্জিত—যে মানুষটি ৯ মাস অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে এই দেশকে স্বাধীন করল, সে তার প্রাপ্য সম্মানটুকুও পেল না!”
​স্থানীয় মহালক্ষীপাড়া গ্রামের আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মোল্লা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া না গেলেও অন্তত প্রশাসনের লোক এসে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে যেতে পারত, কিন্তু তাও করা হয়নি। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সহযোদ্ধার এমন অমর্যাদা সহ্য করার মতো নয়।”
​ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইদ্রিস মিয়া মাস্টার জানান, প্রশাসনের সাথে তারা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করে গার্ড অব অনার ও সশস্ত্র সালামের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্নী ইসলামের সাফাই, “সন্ধ্যার পর নাকি গার্ড অব অনার দেওয়া যায় না।”
​ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহিরুল হক বলেন, “আমি মরহুমের জানাজায় উপস্থিত ছিলাম। তাঁকে গার্ড অব অনার না দেওয়ায় পুরো এলাকায় তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।”
​এদিকে ব্রাহ্মণপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ফারুক হোসেন জানান, “আমরা গার্ড অব অনারের জন্য পুরো এক পিকআপ পুলিশ পাঠিয়েছিলাম এবং পুলিশ লাইন থেকে বিউগলের সুর বাজানোর জন্য দলও এসেছিল। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ উপস্থিত না থাকায় পুলিশ একা গার্ড অব অনার দিতে পারেনি। তবে আমরা জানাজায় অংশ নিয়েছি।”
​সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, অভিযুক্ত ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুন্নী ইসলাম সাফাই গেয়ে বলেন, “সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া হয় না। তারপরও আমরা প্রস্ততি নিয়েছিলাম, কিন্তু ঢাকা থেকে লাশ আনা নিয়ে দ্বিধা ছিল। মাগরিবের পর কেউ আমার সাথে যোগাযোগ করেনি, তাই দেওয়া সম্ভব হয়নি।” তিনি সাংবাদিককে এক অদ্ভুত অনুরোধ জানান—বিষয়টি যেন ব্রাহ্মণপাড়া তথা কুমিল্লার ‘মান-সম্মানের প্রশ্ন’ তুলে সংবাদে প্রকাশ করা না হয়।
​একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার নিথর দেহ নিয়ে প্রশাসনের এমন লুকোচুরি, দায়িত্বহীনতা আর অজুহাতের সংস্কৃতি কেবল একটি পরিবারকেই নয়, কলঙ্কিত করেছে পুরো জাতিকে।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa