- - -

ভেলুয়া সুন্দরী ও আমির সওদাগরের ভালোবাসার অমর প্রেমকাহিনী 

Print News

ভেলুয়া সুন্দরী ও আমির সওদাগরের ভালোবাসার অমর প্রেমকাহিনী

 

ভেলুয়ার সৌন্দর্যের ঝলকে অন্ধ আর দিওয়ানা হওয়া যেকোনো কঠিন হৃদয়ের পুরুষেরও নিয়তি। মহেশখালীর শাপলাপুরের মানিক সওদাগরের একমাত্র ছেলে আমির সওদাগরেরও সেই দশা হয়েছিল। আমির সওদাগর তৈলন্যা নগরের পাহাড়ে এসেছিল শিকার করতে। নদীর ধারের সেই রাজ্যের রাজা মনুহর আর ময়না সুন্দরীর একমাত্র কন্যা ভেলুয়া। ঘটনাচক্রে ১২ বছর বয়সী ভেলুয়ার প্রিয় কবুতরটিকে তির নিক্ষেপে হত্যা করে আমির সওদাগর। ক্ষুব্ধ ভেলুয়ার সাত ভাই তাকে বেঁধে নিয়ে আসে ভেলুয়ার কাছে। আর তখনই আমির সওদাগর ভেলুয়ার রূপে দিশা হারায়। আমিরের মনের অবস্থা কেমন, তার বিবরণ মেলে মুন্সি মোয়াজ্জম আলীর পুঁথিতে।

নানা ঘটনার পর অবশেষে ভেলুয়ার মন পায় আমির। বিয়েও হয় তাদের। ভেলুয়াকে নিয়ে আমির চলে যায় শাপলাপুরে। বিয়ের পর ভেলুয়াকে রেখে বাণিজ্যযাত্রায় বেরিয়ে পড়ে আমির সওদাগর। তবে বাণিজ্যের জন্য যাত্রা করেও আমিরের পিছুটান কাটে না। অনেকটা পথ ভুল করেই তার তরি নিজের ঘাটে এসে ভেড়ে আবার। গভীর রাতে নিদ্রিত ভেলুয়ার কাছে সে যায় সবার অজান্তে। ভেলুয়া ভাবে, বুঝি স্বপ্নই দেখছে সে। স্বামী তার ফিরে এসেছে স্বপ্নের মধ্যে। প্রেমের জোয়ারে ভেলুয়াকে ভাসিয়ে তাকে আবার নিদ্রিত রেখে সওদাগর বেরিয়ে পড়ে।

পরদিন সকালে ভেলুয়ার ঘরের দরজা খোলা দেখে আমির সওদাগরের বোন ও মা ভেলুয়ার প্রতি অবিশ্বাসী হওয়ার অভিযোগ আনে। রাতের স্বপ্ন যে সত্যি ছিল, তা ভেলুয়া জানত না। প্রহেলিকায় পড়ে যায় সে। যত্নে গড়ে তোলা প্রেমের পবিত্রতা বুঝি খান খান হয়ে ভেঙে পড়ে।

নিজেকে অসতী আর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী ভাবতে শুরু করে ভেলুয়া। একদিন কলসি হাতে জল আনতে নদীতে গেলে কাট্টলীর সওদাগর ভোলার নজরে পড়ে যায় সে। আমিরের মতোই ভোলা সওদাগর প্রেমে অন্ধ হয়ে যায় প্রথম সাক্ষাতেই। নদীর ঘাট থেকে ভেলুয়াকে অপহরণ করে ভোলা নিয়ে যায় তার কাট্টলীর বাড়িতে। সেখানে সে ভেলুয়াকে বোঝায়, তার স্বামী আমির সওদাগর মারা গেছে। কোনো উপায় না দেখে ভেলুয়া ভোলা সওদাগরের কাছ থেকে ছয় মাসের সময় নেয়। তার বিশ্বাস ছিল যে, এই ছয় মাসেই হয়তো স্বামী ফিরবে। স্বামীর শোকে–তাপে আর অপেক্ষায় ভেলুয়া রোগশয্যা নেয়।

এর মধ্যে শাপলাপুরে আমির ফিরে এসে ভেলুয়াকে দেখতে না পেয়ে বিবাগি হয়। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। টোনা বারুই নামের এক বাউলের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে গানবাজনায় মনোনিবেশ করে। তবে এর মধ্যে একসময় শুনতে পায়, কাট্টলী নগরের ভোলা সওদাগরের বাড়িতেই আছে তার প্রেয়সী ভেলুয়া।

এরপর সৈন্যসামন্ত নিয়ে ভোলা সওদাগরের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় আমির। রক্তক্ষয়ী সেই যুদ্ধে ভোলার মৃত্যু হয় আর আমির ফিরে পায় তার স্ত্রী ভেলুয়াকে। তবে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। রোগজর্জর ভেলুয়াকে নিয়ে শাপলাপুরে ফিরে আসে আমির সওদাগর।

পাহাড়তলী স্টেশনের নিকটে ভেলুয়ার দিঘি বর্তমানেও রয়েছে। বর্তমান চট্টগ্রাম শহরের খুলশীর পশ্চিমে কাট্টলীর অবস্থান। ভেলুয়া পালাগানের সারেঙ্গ বাদক টোনাবারুইয়ের বাড়ি বর্তমান রাঙ্গুনিয়া থানার সৈয়দ নগর। সেখানে টোনা বারুইয়ের ভিটা এখনো বর্তমান আছে। চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানার সরাইপাড়া নামক স্থানে পালায় বর্ণিত মুনাপ কাজীর কাছারিঘর ছিল। সরাইপাড়ার পার্শ্ববর্তী এলাকা এখনও কাজীপাড়া নামে খ্যাত। এখানে মুনাপ কাজীর নামে দিঘিও আছে। কুড়াল্যামুড়া নামক পাহাড়টি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত। তৎকালীন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ছিল কুড়াল্যামুড়া পাহাড়। কুড়াল্যামুড়া পাহাড়ের উত্তর–পূর্বে কর্ণফুলী নদীর পানির ভয়াবহ ঘূর্ণিপাক ছিল, যা কাউখালী ঘূর্ণিপাক নামে বেশ পরিচিত ছিল। ভেলুয়ার পালার আমির সওদাগর এই কাউখালী ঘূর্ণিপাকেই ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলে একাধিক প্রমাণ পাওয়া যায়।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa