- - -

ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অসোক স্তম্ভের আবিস্কার

Print News

ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতীক অসোক স্তম্ভের আবিস্কার

ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু

 

জার্মানে জন্ম গ্রহণকারী বিশ্ব প্রসিদ্ধ প্রকৌশলী, বাস্তুকার এবং পুরাতত্ববিদ Frederick Oscar Ortel (১৮৬২ – ১৯৪২) সারনাথের প্রতি এতই আসক্ত ছিলেন যে, পরবর্তী সময়ে তিনি ইংল্যান্ডে নিজের ঘরের নামই রেখেছিলেন ‘সারনাথ।’

১৯০৪-১৯০৫ সালের ডিসেম্বর মাসের কনকনে শীতের দিন ছিল। তিনি বারাণসীর প্রকৌশলী পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। নিকটস্থিত সারনাথ হল প্রাচীন ঐতিহাসিক পুরাতাত্ত্বিক স্থল। যেখানে ২৫০০ বছর পূর্বে তথাগত বুদ্ধ তাঁর প্রথম ধম্মোপদেশ প্রদান করেছিলেন। সে স্মৃতিকে ধারণ করতে সম্রাট অসোক সেখানে গড়ে তুলেছিলেন ধাম্মিক অনেক স্থাপনা। কালের গর্ভে সেগুলি মাটির নীচে চাপা পড়েছিল। ১৯০৪ সালে তিনি সারনাথ খননকার্যের অনুমতি পেয়ে ১৯০৫ সালে খোদাই কার্য শুরু করেছিলেন। শীতের দিনে খননকার্য চলাকালীন ফ্রেডরিক অস্কার ওরটেল মহোদয়ের নেতৃত্বে খনন কাজ চলছিল। খনন করতে করতে এক স্থানে তাঁর দৃষ্টি আকৃষ্ট হল।

সেখানে তিনি দেখতে পেলেন চারিদিকে গর্জনরত চারি মুখ বিশিষ্ট সিংহ স্তম্ভ। এরূপ আকৃতি দেখে তিনি ভাব বিভোঢ় হয়ে পড়েছিলেন। কেননা তখনও পর্যন্ত পূর্বে তিনি কখনও এরূপ চতুর্মুখ সিংহের আকৃতি কোথাও দেখেননি। যে আকৃতিতে চার সিংহ একইরূপে হুবহু নির্মাণ করা হয়েছে। এরূপ সিংহ শীর্ষককে প্রকৌশলী ফ্রেডরিক অস্কার ওরটেল সারনাথে স্থাপিত যাদুঘরে সুরক্ষার জন‍্য রেখে দিয়েছিলেন।

এখন তাঁর রুচি খননকার্যে আরও অনেক বেড়ে গেল। তখন সেখানে তিনি যে স্তম্ভটি পেয়েছিলেন, তা ছিল পূর্ণ সিংহ স্তম্ভেরই খণ্ডিত অংশ।

তাঁর দ্বারা প্রাপ্ত অন‍্যান‍্য পুরাকীর্তি সমূহের ছবি তিনি ইংল‍্যাণ্ডে কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ব এবং মানব বিজ্ঞান বিষয়ক সংগ্রহালয়কে দান করেছিলেন। ১৯২৮ এর কাছাকাছি সময় পর্যন্ত তিনি ইংল‍্যান্ডের ট্রেডিংটনে বসবাস করেছেন। কিন্তু তিনি সারনাথের প্রতি এতই প্রভাবিত ছিলেন যে, সারনাথকে তিনি ভুলতে পারছিলেননা। তাই তিনি স্বীয় ঘরের নামকরণই করেছিলেন ‘সারনাথ।’

স্বীয় বৃদ্ধাবস্থায় তিনি পুন একবার সারনাথে আসার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু ভগ্ন স্বাস্থ‍্যের কারণে তাঁর সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। এরূপ অপূর্ণ ইচ্ছা নিয়েই অবশেষে ১৯৪২ সালে ইহলোক ত‍্যাগ করেন। সম্রাট অসোক কর্তৃক খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় অব্দে নির্মিত এ সিংহ স্তম্ভকে (Lion Capital) ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারী সরকারীভাবে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতীকরূপে ব‍্যবহারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। সেদিনই বাবা সাহেব বোধিসত্ব ড. ভীমরাও আম্বেদকর (১৮৯১-১৯৫৬) প্রণীত সংবিধান অনুমোদিত হয়ে ভারত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করেছিল। এ সিংহ স্তম্ভও বাবা সাহেবের প্রচেষ্টায় সংবিধানে রাষ্ট্রীয় প্রতীকরূপে স্থান লাভ করেছিল।

আমরা প্রথমত: অনেক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এমন এক মহানায়ক ফ্রেডরিক অস্কার ওরটেলের প্রতি যিনি ছিলেন একজন পুরাতাত্ত্ববিদ, প্রকৌশলী, ইতিহাসবিদ এবং যিনি সারনাথ খনন করে সম্রাট অসোকের বিলুপ্ত হওয়া গৌরবশালী সিংহ স্তম্ভ পুনরুদ্ধার করে পৃথিবীর সামনে এনে দিয়েছেন, যা পরে ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতীকরূপে বাবা সাহেব ড. আম্বেদকরের দ্বারা স্বীকৃতি লাভ হয়েছে। অতীতের হারিয়ে যাওয়া গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও পুরাকীর্তিকে যাঁরা অনেক সততা সহকারে আবিস্কার করে পুনরায় স্থাপন করতে অশেষ অবদান রেখেছেন, সে সকল মহান মনীষীদেরকে আজ শ্রদ্ধাপূর্ণ কৃতজ্ঞতা চিত্তে স্মরণ করছি। ইতিহাস তাঁদের কখনও ভুলতে পারবেনা।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa