- - -

চাতরী গ্রামের মল্লবংশ ও মধ্যযগের কবি নওয়াজিশ খান

Print News

চাতরী গ্রামের মল্লবংশ ও মধ্যযগের কবি নওয়াজিশ খান

জামাল উদ্দিন

 

আনোয়ারা উপজেলার অন্যতম একটি গ্রামের নাম চাতরী। বর্তমান সময়ের প্রসিদ্ধ বাজার চৌমুখনী চেনে না এমনলোক নেই বললেই চলে। এই বাজার সংলগ্ন পূর্বপাশের লোকালয়টির নাম চাতরী গ্রাম। এই গ্রামে যারা বসবাস করেন তাঁরা হলেন গৌররাজ্য থেকে আগত বকসি মল্ল ও চিকন মল্লের বংশধর। এই বংশের সবচেয়ে গর্বের ইতিহাস হলো- তারা মধ্যযুগের কবি নওয়াজিশ খানের বংশধর।
কবি মোহাম্মদ নওয়াজিশ খান বিখ্যাত পারস্য উপাখ্যান অবলম্বনে ‘গুলে বকাওলী’ নামক একখানি কাব্য রচনা করেন। উক্ত গ্রন্থের বহুস্থানে তাঁর বংশের পরিচয় লিপিবদ্ধ আছে। তাতে বকসি মল্ল নামে এক প্রতিপত্তিশালী লোকের নাম দেখা যায়, তিনি দেয়াঙের বাসিন্দা বলে কবির বর্ণনায় উল্লখ করেছেন। উক্ত বকসি মল্লের সাহা বিবি নামে এক কন্যা ছিল, ছিলিম মড়ল (মোড়ল) নামে অপর এক ধনাঢ্য লোকের সরিপ মোড়ল নামে এক ছেলের সাথে সাহা বিবির বিয়ে হয়। সাহা বিবির গর্ভে সরিপ মোড়লে পাঁচ ছেলে হয়, বিরহিম (ইব্রাহিম?) হিরাগাজি, গজমত, গাভুর ঠাকুর ও মহব্বত। অন্যদিকে আলাল মোড়লের ছেলে গাজি মল্লের সঙ্গে বাঁশখালী ইলসাগ্রামের সিরাজ কাস্তাকের মেয়ের বিয়ে হয়। তাদের ঔরসে বিনানু নামে এক মেয়ের জন্ম হয়। এই বিনানুর সঙ্গে সরিপ মোড়লের ছেলে বিরহিম (ইব্রাহিম?) এর বিয়ে হয়, বিনানুর গর্ভে মোহাম্মদ এয়ার নামে এক ছেলের জন্ম হয়। এই এয়ার মোহাম্মদ দেয়াঙ থেকে সাতকানিয়া থানার আমিরাবাদ গ্রামে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। এয়ার মোহাম্মদের ছেলে কবি নওয়াজিশ খান। দেয়াঙের বকসি মল্ল কবি নওয়াজিশ খানের চতুর্থ পূর্ব পুরুষ। কথিত আছে যে, কবি নওয়াজিশ খান ১৬৩৮ সালে সাতকানিয়া থানায় জন্মগ্রহণ করেন। ১২৭ বছর বয়সে ১৭৬৫ সালে পরলোক গমন করেন। কবির সাক্ষ্য মতে, তিনি সাতকানিয়ার আমিরাবাদ গ্রামে জন্ম নেন। আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ সংগৃহীত কবি নওয়াজিশ খানের “গুলে বকাওলী” পুঁথিখানির কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিম্নে উদ্ধৃত করা হল –
ছিলিম মড়ল নামে সবে পাএ চিন \
তান সুত সরিপ মড়ল (মোড়ল) গুণধর।
সেহ ভাগ্যবন্ত ছিল মহীর উপর \
বকসী মল্ল নামে এক আছিল দিআঙ্গে।
ধনে মানে গুণে জ্ঞানে প্রীতি সভা সঙ্গে \
তান সুতা রূপযুতা সাহা বিবি নাম।
সরিপে শুনিল যদি রূপের উপাম \
ঘটক দিলেক বকসী মড়লের স্থান।
বোলে মোকে তোমা রূপ কন্যা কর দান \
পরিপাক রূপে কুলে পাইআ জামাতা।
নিজ ধন ভাঙ্গিআ দিলেক নিজ সুতা \
পালিল জামাতা সুতা অন্ন বস্ত্র দিআ।
রাখিলেক মুরু-পুত্র তেহেন মানিআ \
সরিপ মল্লের গৃহে হৈল পঞ্চ সুত।
এক একে বলবন্ত অতি অদভূত \
বিরহিম নামে হিরা গাজি গজমত।
গাভুর ঠাকুর আর নামে মহব্বত \
গুণজ্ঞানে এসব আছিল কথ দিন।
দৈবগতি চারি লোক হৈল জীবহীন \
বিরহিম কিঞ্চিত রোগেএ বেআপিতে।
তেকারণে সতত না জাএ দূর ভিতে \
এবে কহি আলাল মড়ল নাম জার।
সেহ ভাগ্যবস্তু দাতা প্রদান সভার \
তান সুত গাজি মল্ল অতি শুদ্ধচিত।
আপ্ত পর সব সঙ্গে অধিক পীরিত \
ইল্সা গ্রামে সিরাজ কান্তক (?) মহামতি।
ধনে মানে অতি ধন্য করিল বসতি \
তান সুতা গাজি মল্লে কৈল পরিণয়।
দুই দিকে ধন্য ধন্য আছিল নিশ্চয় \
সেই ঘরে এক সুতা যুক্ষণে জন্মিল।
বিনানু করিআ নাম যতনে রাখিল \
সরিপের সুত বিরহিম রোগবন্ত।
তেকারণে আর্তিকরি বিহা না করন্ত \
গাজি মল্লে তাহানে জামাতা পোষে নিল।
কুলীন পাইআ নিজ সুতা সমর্পিল \
কিবা রোগী কিবা ভোগী খ্যাত *
উত্তম লোকের সবে করএ আদর \
বিরহিম ঔরসে বিনানু গর্ভে স্থিতি।
মোহাম্মদ এয়ার নামে হইল সন্ততি \
মোহন্ত পুরুষ সেই ভাগ্যবন্ত ছিল।
(শ্বেতাম্বর?) নিজ অঙ্গে * পৈরিল \
শাস্ত্র আদি * * সে পরম তত্ত¡সার।
শিক্ষা করি রাখিলেক ঘটে আপনার \
যুক্তি সার করিলেক ভাবি নিজ মতি।
আমীর আবাদ স্থানে করিতে বসতি \
বহু বন কাটি * কৈল পরিষ্কারে।
বহু সুখে বঞ্চিলেক সে দেশ মাঝারে \
ধরে * * ধর্ম্মী দাতা ছিল অনুদিন।
পঞ্চক্ষণ সেবা হৃদে পভু ভাবে লীন \
পীর মুরিদ খেলাফত কৈল সার।
শুদ্ধচিত্ত মোহাম্মদ এয়ার খোন্দকার \
তাহান প্রথম সুত নামে দওলত।
শাস্ত্র শিক্ষা পিতা হোন্তে লৈল খেলাফত \
তাহান কনিষ্ঠ মুঞি নো আজিস নাম।
অল্প শাস্ত্র অল্প বুদ্ধি অল্প জথ কাম \
শ্রীযুত আতাওল্লা মুলবী সুজান।
খেলাফত মুরিদ হইনু তান স্থান \
মোহর কনিষ্ট ভাই ছিল বলবন্ত।
আবদুলমজিদ নামে হাফিজ মোহন্ত \
কণ্ঠাগ্রেতে ফোর্কান পড়িত অনুদিন।
চল্লিশ বরিষে সেহ হৈল জীবহীন \
জন্মি আছি এতিম ভাই মা বাপের ঘরে।
সবেথু আদর বাপে করিলেক মোরে \
ছিলিম খাঁ সরিপ বিরহিম শুন আর।
মোহাম্মদ এআর নোআজিস খন্দকার \
প্রচারি কহিতে পাির এই ছ সবিন (?) \
কবি নওয়াশিজ খান ‘জোরওয়ার সিংহ কীর্তি’ নামে আরও একটি পুঁথি রচনা করেন। শায়েস্তা খাঁ’র ছেলে প্রধান সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খানের চট্টগ্রাম বিজয়ের পরে আধুখান এবং লক্ষণ সিংহ (লছমন সিংহ) নামক দু’জন হাজারি মনসবদার শঙ্খ নদীর তীরে দোহাজারিতে সীমান্ত রক্ষায় নিযুক্ত হন। জোরওয়ার সিংহ লক্ষণ সিংহের (লছমন সিংহের) পুত্র। কবির বর্ণনায় মনে হয় যে, তিনি জোরওয়ার সিংহের সমসাময়িক। সুতরাং ধরে নেয়া যায় যে, কবি নওয়াজিশ সতের শতকের শেষপাদে জীবিত ছিলেন।
কবি নওয়াজিশ খান তার ‘গুলে বকাওলী’ নামক কাব্যে নিজেকে দেয়াঙের বকসি মল্লের পরবর্তী চতুর্থ পুরুষ বলে পরিচয় দিয়েছেন। এখন আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে দেয়াঙের সেই স্বনামধন্য ব্যক্তি বকসি মল্ল কে ? কি তার পরিচয় ? দেয়াঙের চুচারী গ্রাম বা আনোয়ারা থানার আজকের চাতরী গ্রামে ‘বকসি মল্লের দিঘি’ নামক প্রাচীন এক ভরাট দিঘি এখনো বকসি মল্লের স্মৃতি ধারণ করে আছে। বকসি মল্লের একমাত্র ছেলের নাম ‘চিকন মল্ল’। চিকন মল্ল, এতই প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন যে, এক পর্যায়ে পিতা বকসি মল্লের চেয়েও তিনি অধিক খ্যাতি ও সুনাম অর্জন করেছিলেন। ফলে পরবর্তী বংশধররা চিকন মল্লের বংশধর বলেই বহুল পরিচিত। চাতরী ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন চৌধুরী ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান শামশুদ্দিন আহমদ চৌধুরী ও চেয়ারম্যান এয়াকুব আলীসহ চিকন মল্লের চার ছেলের বংশধররা চাতরী গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বর্তমানে বসবাস করে আসছেন। উল্লেখ্য যে, চাতরী গ্রামের পূর্ব নাম ছিল বাহারচড়া। পরবর্তী নাম চুচারী। চুচারী ফারসি শব্দ, যার অর্থ স্বাস্থ্যকর স্থান। তাঁর বংশধরদের কাছ থেকে জানা যায়, তাঁদের বংশের পূর্ব পুরুষ ‘বকসি মল্ল’। ১৫৭৫ সালে দুর্ভিক্ষ ও মহামারিতে গৌড়রাজ্য ধ্বংসস্তুপে পরিণত হলে বকসি মল্ল সপরিবারে দেয়াঙে চলে আসেন। তিনি শঙ্খ নদীর তীর থেকে আনোয়ারার মাঝপথ দিয়ে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে জুলদা পর্যন্ত এক বিশাল সড়ক নির্মাণ করেন। জনসাধারণের যাতায়াতের সুবিধার্থে নির্মিত উক্ত সড়কটি ‘বকসির জাহাল’ বা বকসির রাস্তা নামে বিদ্যমান ছিল। এমনকি বিলীন হয়ে যাওয়া উক্ত সড়কের কোন কোন স্থানের নাম ‘বকসির জাহাল’ নামে পরিচিত। বকসি মল্লের বহু অমর কীর্তি চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন জায়গায় এখনও বিরাজমান। কবি নওয়াজিশ খানের সাক্ষ্যে জানা যায়, ‘মড়ল’ রাজ প্রদত্ত এক সম্মানসূচক উপাধি ছিল। ‘মণ্ডল’ শব্দজাত-অপভ্রংশে ‘মড়ল’ হয়েছে সন্দেহ নেই। ‘মড়ল’ শব্দই পরে মল্ল রূপে পর্যবসিত হয় বলে মনে হয়। ‘বকসি মল্ল’ তাঁর প্রকৃত কোন নাম নয়। বকসি ও মল্ল দু’টিই তাঁর রাজকীয় উপাধি। ‘বকসি মল্ল’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতির কারণে তাঁর প্রকৃত নাম হারিয়ে যায়। তাঁর বংশধররাও বকসি মল্লের প্রকৃত নাম কি তা বলতে পারে না। তাঁদের পূর্বপুরুষ সূত্রে শুনে এসেছেণ তাঁরা বকসি মল্ল ও তাঁর পুত্র চিকন মল্লের বংশধর।
চাতরী গ্রামে বকসি মল্লের বংশ পরিচয়- বকসি মল্ল- চিকন মল্ল- আরব মল্ল- ঠাকুর চাঁদ মল্ল- আলী মল্ল -আনিসমল্ল- বারিশ মল্ল -নওয়াজিশ মল্ল- সামার মল্ল – জিন্নাত আলী মল্ল। এ বংশেরই পরবর্তী প্রজন্মই চাতরী গ্রামের অর্ধাংশ জুড়ে বসবাস করে আসছেন।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa