- - -

রুটির টুকরো নয়, কাঠগড়ায় আমাদের বিবেক

img 20261003 wa0020
Print News

রুটির টুকরো নয়, কাঠগড়ায় আমাদের বিবেক

আবদুল্লাহ মজুমদার

শিশুটির ছোট্ট শরীরটি বারবার সরে যাচ্ছিল। নিজেকে বাঁচানোর ব্যর্থ চেষ্টা। আর তার ওপর একের পর এক বেল্টের আঘাত। মিরপুর-১-এর সেই দৃশ্য এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি দেখলে চোখ আটকে যায়, বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি তৈরি হয়। একটি শিশু কী করেছে—সেটি নিয়ে নানা কথা আছে, নানা অভিযোগ আছে। কেউ বলছেন, এক টুকরো রুটি চুরি করেছিল সে। আবার সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাকর্মীর দাবি, শিশুটি একটি দোকান থেকে মুঠোফোন চুরি করেছিল। সত্য কোনটি, তা তদন্তেই বেরিয়ে আসবে। কিন্তু ভিডিওতে যে দৃশ্যটি দেখা গেছে, তার সামনে দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই—একটি শিশুর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই কি তার ওপর এভাবে আঘাত করার অধিকার কেউ পেয়ে যায়?

ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তথ্য ছড়িয়েছে, তার সবটুকু এখনো নিশ্চিত নয়। শিশুটি আসলে কী নিয়েছিল, আদৌ কিছু নিয়েছিল কি না—তা তদন্তের বিষয়। পুলিশও বিষয়টি দেখছে। ফলে অনুমানের ভিত্তিতে শিশুটিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি অভিযোগকে হালকাভাবে দেখাও উচিত নয়। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যা-ই হোক, শিশুকে মারধর করার অধিকার কোনো নিরাপত্তাকর্মী, দোকানদার বা অন্য কারও নেই।
এখানেই মূল প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায়—অভিযোগের বিচার কে করবে?

আইন আছে, পুলিশ আছে, আদালত আছে। কোনো শিশু চুরি করেছে বলে সন্দেহ হলে তাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা যেত। পুলিশ তদন্ত করত, প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ করত এবং আইনি প্রক্রিয়ায় বিষয়টির নিষ্পত্তি হতো। কিন্তু প্রকাশ্যে বেল্ট দিয়ে পেটানো কোনো বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে না। বরং অভিযোগের পাশাপাশি নির্যাতনের ঘটনাটিও আইনের প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আমাদের সমাজে ‘চোর ধরেছি’—এই ধারণাটি অনেক সময় মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে বিচারকের আসনে বসিয়ে দেয়। অভিযোগ উঠল, সন্দেহ হলো, তারপর শুরু হলো শাস্তি। কে সত্য বলছে, কী ঘটেছিল, তার প্রমাণ কী—এসব প্রশ্ন যেন পরে আসে। অথচ আইনের শাসনের মূল কথাই হলো, অভিযোগ আর অপরাধ এক জিনিস নয়। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে একজন মানুষকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যায় না। আর সে যদি শিশু হয়, তাহলে বিষয়টি আরও সংবেদনশীলভাবে দেখার প্রয়োজন।

শিশুটির সামাজিক অবস্থানও এখানে বিবেচনার দাবি রাখে। পথশিশুদের জীবন এমনিতেই অনিশ্চয়তায় ভরা। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, আশ্রয়হীনতা ও শিক্ষার সুযোগের অভাব—সবকিছু মিলিয়ে তাদের জীবন প্রতিদিনই নানা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাই কোনো শিশুর ভুল বা অপরাধের অভিযোগকে শুধু ‘অপরাধ’ হিসেবে দেখলে এর পেছনের বাস্তবতাটি অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়।

ধরা যাক, শিশুটি সত্যিই এক টুকরো রুটি নিয়েছিল। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে—কেন? সে কি ক্ষুধার্ত ছিল? তার খাবারের নিশ্চয়তা কোথায়? তার পরিবার আছে কি না, থাকলে তাদের অবস্থা কী? সে স্কুলে যায় কি না? আবার যদি সত্যিই মুঠোফোন চুরির অভিযোগ থাকে, তাহলেও প্রশ্ন আছে—শিশুটি কেন এমন কাজে জড়াল? তার পেছনে কেউ আছে কি না? সে কোনো চক্রের শিকার কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাও জরুরি।

অবশ্যই দারিদ্র্য কোনো অপরাধকে বৈধতা দেয় না। ক্ষুধা থাকলেই চুরি বৈধ হয়ে যায় না। কিন্তু অপরাধের অভিযোগ থাকলেই নির্যাতন বৈধ হয়ে যায়—এমন কথাও আইনে নেই। এই দুই সত্যকে পাশাপাশি রেখেই আমাদের বিষয়টি দেখতে হবে।

আর এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে—অপরাধের বিচার আর অপরাধীর ওপর তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ নেওয়া এক বিষয় নয়। বিচার প্রমাণের ভিত্তিতে হয়, প্রতিশোধ হয় আবেগের বশে। একটি সভ্য রাষ্ট্র বিচারব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে; শক্তির প্রদর্শনের ওপর নয়।

মিরপুর-১-এর ঘটনাটি তাই শুধু একজন নিরাপত্তাকর্মীর আচরণের প্রশ্ন নয়। এটি আমাদের সামাজিক মানসিকতারও একটি আয়না। একটি শিশুর ওপর নির্যাতন চলছিল, আর আশপাশের মানুষ কী করছিলেন? কেউ কি তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন? কেউ কি নিরাপত্তাকর্মীকে থামাতে এগিয়ে এসেছিলেন? নাকি মোবাইল ফোন বের করে ভিডিও করাই হয়ে উঠেছিল প্রধান প্রতিক্রিয়া?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিবাদ হয়েছে। মানুষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু একটি শিশুকে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়। ঘটনাস্থলে থাকা একজন মানুষের মানবিক সাহসই হয়তো যথেষ্ট ছিল।

আমাদের আরও মনে রাখতে হবে, শিশুর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার পরিচয়, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে হবে। তাকে শুধু ‘চোর’ হিসেবে চিহ্নিত করে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। সে যদি সত্যিই অপরাধ করে থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর যদি অভিযোগ অসত্য হয়, তাহলে তার ওপর সংঘটিত নির্যাতনেরও যথাযথ বিচার হওয়া প্রয়োজন। দুই ক্ষেত্রেই শিশুর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।

এই ঘটনার সঙ্গে আরও একটি বড় সামাজিক প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। আমরা অনেক সময় ছোট অপরাধের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কঠোরতা দেখাতে চাই। কিন্তু বড় ধরনের অনিয়ম, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে দেখি। অবশ্য অপরাধের ধরন ও আইনি প্রক্রিয়া এক নয়। কিন্তু ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিটি সবার ক্ষেত্রেই একই হওয়া উচিত। আইন কারও জন্য কঠোর আর কারও জন্য নমনীয় হয়ে গেলে মানুষের আইনের প্রতি আস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাই মিরপুর-১-এর ঘটনাকে শুধু ‘একটি শিশুকে মারধরের ঘটনা’ হিসেবে দেখলে হয়তো আমরা এর গভীরতর শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হব। এখানে শিশু সুরক্ষা আছে, আইনের শাসনের প্রশ্ন আছে, দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন আছে; আছে আমাদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক বিবেকেরও প্রশ্ন।

একটি শিশু ভুল করলে তাকে থামাতে হবে, প্রয়োজনে আইনের আওতায় আনতে হবে। কিন্তু তাকে পেটানো, অপমান করা কিংবা তার শৈশবকে ভয় ও নির্যাতনের স্মৃতিতে ভরে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। শিশুর ভুল সংশোধনের পথ হতে পারে পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, কাউন্সেলিং ও আইনি ব্যবস্থা; বেল্টের আঘাত নয়।
শেষ পর্যন্ত শিশুটি কী নিয়েছিল—এক টুকরো রুটি, একটি মুঠোফোন, নাকি কিছুই নেয়নি—তার উত্তর তদন্তই দেবে। কিন্তু মিরপুর-১-এর সেই দৃশ্য আমাদের সামনে তার চেয়েও বড় একটি প্রশ্ন রেখে গেছে। বেল্টের আঘাতে কুঁকড়ে যাওয়া ছোট্ট শরীরটির দিকে তাকিয়ে আমরা কি শুধু একজন ‘অভিযুক্ত’কে দেখব, নাকি একজন শিশুকে দেখব? কারণ একটি শিশুর ভুলের বিচার করতে গিয়ে যদি আমরা তার মানবিক মর্যাদাটুকুও কেড়ে নিই, তাহলে বিচার হয়তো হলো না—বরং আমাদের নিজেদের বিবেকই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গেল। আর সেই কাঠগড়ায় প্রশ্ন একটাই—আইনের হাতে বিচার থাকবে, নাকি দুর্বল মানুষের শরীরে শক্তির আঘাতকেই আমরা বিচার বলে মেনে নেব?

আবদুল্লাহ মজুমদার
লেখক-সাংবাদিক
মুঠোফোন: ০১৭৭৯-৮৬৫৬৭৮

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa