- - -

রক্তাক্ত পরিসংখ্যান, নীরব রাষ্ট্র, অদম্য কলম: সাংবাদিকতার সামনে এক অগ্নিপরীক্ষা

Print News

রক্তাক্ত পরিসংখ্যান, নীরব রাষ্ট্র, অদম্য কলম: সাংবাদিকতার সামনে এক অগ্নিপরীক্ষা

–মো কামাল উদ্দিন

২০২৫ সাল—একটি বছর, যা কেবল ক্যালেন্ডারের বারোটি মাস নয়, বরং সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক ভারী, রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে থাকবে। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর—এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই অন্তত ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এই সংখ্যা শুধু একটি রিপোর্ট নয়, এটি একটি আর্তনাদ—একটি পেশার, একটি বিবেকের, একটি সমাজের।
এই ৩৮১ জনের প্রতিটি নামের পেছনে রয়েছে একটি গল্প—কেউ হুমকির মুখে কলম ধরেছেন, কেউ হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থেকেও সত্যের কথা ভেবেছেন, কেউ মামলা মোকাবিলা করতে করতে নিজের জীবনের স্থিতি হারিয়েছেন। অন্তত ২৩ জন সাংবাদিক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারা নির্যাতিত, হয়রানির শিকার কিংবা হুমকিপ্রাপ্ত হয়েছেন। এটি শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে একটি বিপজ্জনক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়—যেখানে প্রশ্ন তোলাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন অন্তত ২০ জন সাংবাদিক। ভাবুন, একজন মানুষ যখন সত্য লিখতে বসেন, তখন তার সামনে শুধু তথ্য নয়, মৃত্যুর ছায়াও দাঁড়িয়ে থাকে। এটি কি কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে?
প্রকাশিত সংবাদ বা মতামতের কারণে ১২৩ জন সাংবাদিককে মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই মামলাগুলো অনেক সময় আইনের ন্যায়বিচারের জন্য নয়, বরং ভয় দেখানোর একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেন বলা হচ্ছে—“লিখো, কিন্তু আমাদের মতো করে লিখো; বলো, কিন্তু আমাদের অনুমতি নিয়ে বলো।”
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ১১৮ জন সাংবাদিক সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন। তারা শুধু কলম হাতে ছিলেন, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে লাঠি, অস্ত্র, হিংস্রতা। এই বৈপরীত্যই আমাদের সময়ের নির্মম বাস্তবতা।
তিনজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। চারজনের লাশ উদ্ধার হয়েছে রহস্যজনকভাবে। এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়। এগুলো একটি ভয়াবহ বার্তা বহন করে—সত্য বলার মূল্য অনেক বড়, কখনো কখনো জীবনের চেয়েও বড়।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অনেকেই ১৯৭১ সালের কথা মনে করছেন। তখনও সত্যকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা হয়েছিল, তখনও কলম ও কণ্ঠকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। ইতিহাসের সেই নির্মমতা আজ ভিন্ন রূপে ফিরে এসেছে কি না—এই প্রশ্ন এড়ানো যায় না। কারণ পদ্ধতি বদলালেও উদ্দেশ্য একই—সত্যকে নিয়ন্ত্রণ করা, মানুষের জানার অধিকার কেড়ে নেওয়া।
তবে এই আলোচনায় একটি কঠিন সত্য উপেক্ষা করা যাবে না। সাংবাদিকতার ভেতরেও রয়েছে বিভাজন। সবাই একই আদর্শে বিশ্বাস করেন না। কিছু সাংবাদিক আছেন, যারা সত্যের পথে না হেঁটে ক্ষমতার ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। তারা কলমকে অস্ত্র বানাননি, বরং তা দিয়ে তৈরি করেছেন তোষামোদের মঞ্চ। তারা সত্যের অনুসন্ধান করেননি, বরং ক্ষমতার প্রশংসা লিখেছেন।
এই চাটুকার পরিবেষ্টিত সাংবাদিকতা পেশাটিকে দুর্বল করেছে। তারা প্রমাণ করেছে, কলম যদি বিবেকহীন হয়, তবে তা সমাজের জন্য বিপজ্জনক। তারা নিজেদের নিরাপদ রাখতে চেয়েছেন, কিন্তু এর বিনিময়ে হারিয়েছেন পেশার মর্যাদা, হারিয়েছেন মানুষের বিশ্বাস।
ইতিহাস সাক্ষী—যারা সত্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাদের শেষ পরিণতি কখনোই সম্মানজনক হয়নি। সময় তাদের নাম মুছে দিয়েছে, অথবা তাদের দাঁড় করিয়েছে মানুষের অবজ্ঞার সামনে। আজ যারা একই পথে হাঁটছেন, তাদের জন্যও ভবিষ্যৎ খুব আলাদা কিছু অপেক্ষা করছে না। কারণ সাংবাদিকতা কোনো দলের দাসত্ব নয়। এটি যদি দাসত্বে পরিণত হয়, তবে তা আর সাংবাদিকতা থাকে না, তা হয়ে যায় প্রচারণার যন্ত্র।
তবুও, সব অন্ধকারের মাঝেও আলো নিভে যায়নি। এখনো অনেক সাংবাদিক আছেন, যারা নির্ভীকভাবে কাজ করছেন। তারা জানেন, এই পথ বিপজ্জনক। তারা জানেন, প্রতিটি লেখা তাদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবুও তারা থামেন না। কারণ তারা বিশ্বাস করেন—সত্য বলা বন্ধ হয়ে গেলে সমাজ অন্ধ হয়ে যাবে।
এই সাহসী সাংবাদিকরাই আজকের দিনের প্রকৃত নায়ক। তারা কোনো মঞ্চের নায়ক নন, তারা নীরব লড়াইয়ের সৈনিক। তাদের অস্ত্র কলম, তাদের শক্তি সত্য, তাদের প্রেরণা মানুষের অধিকার।
একজন সত্যিকারের সাংবাদিক কখনো নিরপেক্ষতার নামে অন্যায়ের পাশে দাঁড়ান না। তিনি নির্ভীকভাবে সত্যের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি জানেন, তার লেখা অনেকের অস্বস্তির কারণ হতে পারে, কিন্তু তিনি তা লিখবেনই—কারণ সেটিই তার দায়িত্ব।
আজকের এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভয়কে অতিক্রম করা। ভয় থাকবে, হুমকি থাকবে, চাপ থাকবে। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝেও যদি কলম থেমে যায়, তবে হারবে শুধু সাংবাদিকতা নয়, হারবে পুরো সমাজ।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা মানে গণতন্ত্রের ওপর হামলা। এটি মানুষের জানার অধিকারকে আঘাত করা। এটি একটি জাতিকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা।
আমাদের সমাজকে বুঝতে হবে—সাংবাদিকদের নিরাপত্তা শুধু সাংবাদিকদের বিষয় নয়, এটি পুরো জাতির বিষয়। কারণ সাংবাদিকরা যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারেন, তবে সত্য চাপা পড়ে যাবে, আর মিথ্যা জায়গা দখল করবে।
আজ প্রয়োজন এক নতুন অঙ্গীকার। সাংবাদিকদের জন্য, সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য। এই অঙ্গীকার হলো—সত্যকে কোনোভাবেই থামানো যাবে না।
যারা আজ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তারা একা নন। তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। তাদের কণ্ঠকে শক্তিশালী করা আমাদের দায়িত্ব। তাদের লড়াইকে আমাদের লড়াই হিসেবে গ্রহণ করা আমাদের দায়িত্ব।
আর যারা এখনো চাটুকারিতার পথে হাঁটছেন, তাদের জন্য এই সময় একটি সতর্কবার্তা। সময় বদলায়, ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু সত্য কখনো বদলায় না। আজ আপনি যে ক্ষমতার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, কাল সেই ক্ষমতাই আপনাকে অস্বীকার করতে পারে। কিন্তু আপনি যদি সত্যের পাশে দাঁড়ান, তবে ইতিহাস আপনাকে মনে রাখবে।
কথা একটাই—
সাংবাদিকতা কোনো চাকরি নয়, এটি একটি অঙ্গীকার।
এই অঙ্গীকার ভাঙা যায় না, বিক্রি করা যায় না, ভয় দেখিয়ে থামানো যায় না।
কলমের কালি যদি কখনো শুকিয়ে যায়, তবে তা রক্তে ভিজে আবার লিখতে শিখবে।
কারণ সত্যের পথ রুদ্ধ করা যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত থামানো যায় না।
এই সময়ের সাংবাদিকদের জন্য একটাই আহ্বান—
নির্ভীক থাকুন, সৎ থাকুন, সত্যের পথে অটল থাকুন।
কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই দাঁড়ায়, যারা সত্যকে বেছে নেয়।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa