
মান্দায় দক্ষিণ শ্রীরামপুর আইজান বেওয়া নূরানী হাফেজিয়া লিল্লাহ বোর্ডিং মাদ্রাসা ও এতিমখানা’র জমি জবরদখল ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
নওগাঁর মান্দায় ‘দক্ষিণ শ্রীরামপুর আইজান বেওয়া নূরানী হাফেজিয়া লিল্লাহ বোর্ডিং মাদ্রাসা ও এতিমখানা’র জমি জবরদখল, ধানি জমি কেটে অবৈধভাবে পুকুর খনন, গভীর নলকূপ (এসটিডব্লিউ) স্থাপন ও অর্থ আত্মসাতের এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। সাবেক কমিটির কতিপয় নেতার অনিয়ম এবং স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহলের অনৈতিক ভূমি গ্রাসের কারণে ৪৫ বছরের পুরনো এই দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি এখন সম্পূর্ণ হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই ঘটনায় প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ ও আদালতে একাধিক মামলা দায়ের হলেও কোনো প্রতিকার মিলছে না। ফলে স্থানীয় এলাকাবাসী, মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বর্তমান কমিটির কর্মকর্তাদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৭৮ সালে দানপত্র দলিলমূলে (গোবিন্দপুর মৌজার হাল ৪০১ নং খতিয়ান) এলাকার দুই মহিয়সী নারী আয়জান বেওয়া ও রহিমন বেওয়া মাদ্রাসার নামে সাড়ে তিন বিঘা জমি হস্তান্তর করেন। এরপর থেকে দীর্ঘ ৪৫ বছর যাবৎ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষই অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে জমিটি ভোগদখল ও চাষাবাদ করে আসছিল। এই জমির আয় থেকেই চলত এতিম ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণ।
কিন্তু বিপত্তি ঘটে ২০২১ সালে। তৎকালীন পরিচালনা কমিটির প্রচার সম্পাদক আব্দুল মালেক আকন্দ বছরপ্রতি ৭০ হাজার টাকা চুক্তিতে জমিটি চাষাবাদের জন্য লীজ নেন। অভিযোগ রয়েছে, রোপা ধান রোপণের মুখে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর আলম সুকৌশলে ও প্রভাব খাটিয়ে আব্দুল মালেকের কাছ থেকে লীজের মূল কাগজপত্র হাতিয়ে নেন। নিয়ম অনুযায়ী আব্দুল মালেককে হালচাষের ক্ষতিপূরণ বাবদ ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও তা পরিশোধ করা হয়নি। উল্টো মাদ্রাসা কমিটিকে অন্ধকারে রেখে জমিটি নাজমুল হক মিলন নামে এক স্থানীয় ইটভাটা মালিকের কাছে অবৈধভাবে হস্তান্তর করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সাতবাড়িয়া সংলগ্ন ইটভাটার মালিক নাজমুল হক মিলন ভুমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে প্রকৃত তথ্য গোপন করে জমিটি নিজের নামে নামজারি (খারিজ) করে নেন। এরপর তিনি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জমিটি এক আমেরিকা প্রবাসীর নিকট বিক্রি করে দেন। ২০২৪ সালের মে মাসে ওই প্রবাসীর ভাড়াটে লাঠিয়াল বাহিনী জোরপূর্বক জমির পাকা ধান কাটতে এলে এলাকায় চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কায় তৎকালীন সময়ে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেন আব্দুল মালেক আকন্দ।
পরবর্তীতে নবগঠিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম সুজা সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) শারমিন জাহান লুনার কার্যালয়ে একটি খারিজ বাতিলের আবেদন জমা দেন। বিবাদী পক্ষ শুনানিতে রহস্যজনকভাবে অনুপস্থিত থাকায় তৎকালীন এসিল্যান্ড একতরফা রায় প্রদানসহ বিষয়টি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন। যা বর্তমানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ঝুলে আছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শুধু নামজারি বা বিক্রিই নয়, মাদ্রাসার জমিটি রক্ষায় কোনো স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা না থাকায় প্রভাবশালী চক্রটি এর রূপ পরিবর্তন করে ফেলেছে। মাদ্রাসার ৪০১ নং খতিয়ানের ১৩৪৪ নং দাগের ধানি জমিটি রাতারাতি ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে কেটে অবৈধভাবে বিশাল পুকুর খনন করা হয়েছে। এছাড়া ৪০২ নং খতিয়ানের ১২৯৩ নং দাগের অপর একটি উর্বর জমিতে জোরপূর্বক ও অবৈধ উপায়ে এসটিডব্লিউ (শ্যালো টিউবওয়েল) স্থাপন করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে দখলদাররা।
স্থানীয়রা জানান, জমিটি চিরতরে হাতিয়ে নিতে প্রতিপক্ষ আলতাফ হোসেন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেছিলেন। সম্প্রতি বিজ্ঞ আদালত দীর্ঘ শুনানি শেষে মামলাটি খারিজ করে দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে গত কয়েক মাস আগে মাদ্রাসার একটি পুরনো গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে আলতাফ হোসেন পুনরায় মাদ্রাসা কমিটির লোকজনকে আসামি করে একটি জিআর ফৌজদারি মামলা ঠুকে দেন। বর্তমানে থানা পুলিশের অধীনে এই মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। হয়রানিমূলক এই মামলার কারণে মাদ্রাসার শিক্ষকরা এখন আইনি লড়াইয়ে ব্যস্ত, যার প্রভাব পড়ছে কোমলমতি এতিম শিশুদের পড়াশোনায়।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, প্রতিপক্ষ আলতাফ হোসেন একেক সময় একেক বিভ্রান্তিকর ও কাল্পনিক দাবি করছেন। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কোনো আইনি পদক্ষেপ নিলে তিনি জমিটি ‘কবলাসূত্রে’ (ক্রয়সূত্রে) নিজের বলে দাবি করেন, আবার নিজে বাদী হয়ে যখন মামলা করেন, তখন কাগজপত্রে তা ‘ওয়ারিশসূত্রে’ প্রাপ্ত বলে উল্লেখ করেন। তাঁর এই স্ববিরোধী কাগজপত্রের কারণে জালিয়াতির বিষয়টি স্পষ্ট।
মাদ্রাসা কমিটির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম সুজা ও প্রচার সম্পাদক আব্দুল মালেক আকন্দ যুগান্তরকে বলেন, “এটি আল্লাহর ঘর ও এতিমদের সম্পত্তি। আইনি সুরাহা না পাওয়ায় আমরা অসহায়। চলতি মৌসুমে মাঠের ধান তুলতে গেলে প্রতিপক্ষের লোকজন আমাদের প্রকাশ্যে খুন-জখমের হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। এ বিষয়ে মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সহ প্রশাসনের একাধিক উচ্চপদস্থ দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েও আমরা কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না।”
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত ইটভাটা ব্যবসায়ী নাজমুল হক মিলনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে প্রতিপক্ষের আলতাফ হোসেন সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “উল্লেখিত দাগে মাদ্রাসার কোনো জমি আছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ যদি টেবিল টকে সঠিক ও বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারে, তবে আমরা জমি ছেড়ে দেবো।”
মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির বর্তমান সভাপতি রাশেদ ইকবাল বলেন, “বিগত সময়ের উপদেষ্টা আকবর সাহেব এসব অনিয়মের বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন। মূলত উনিই ক্ষমতার অপব্যবহার করে জমিগুলো মিলনের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে আদালতে তীব্র আইনি লড়াই চলছে। আমরা আমাদের সম্পত্তি ফিরে পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
এ ব্যাপারে মান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
![]()









