- - -

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: নীরব কূটনীতি, অনুত্তরিত প্রশ্ন ও রাষ্ট্রের দায়

img 20261003 wa0020
Print News

মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: নীরব কূটনীতি, অনুত্তরিত প্রশ্ন ও রাষ্ট্রের দায়

 

আবদুল্লাহ মজুমদার

একটি মৃত্যুদণ্ডের খবর কখনো কখনো একটি পরিবারের শোকের সীমানা ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা তেমনই এক বাস্তবতা সামনে এনেছে। স্বজনেরা হয়তো এখনো জানতে চাইছেন, তাঁদের প্রিয়জনদের সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, কীভাবে এগিয়েছিল বিচারপ্রক্রিয়া, আর কেন সাজা কার্যকরের আগে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন বিষয়টি জানতে পারেনি। এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল দুই পরিবারের জন্য নয়; বিদেশে অবস্থানরত লাখো বাংলাদেশির নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত, তা বোঝার জন্যও জরুরি।

সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁদের নাম নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার বলে জানানো হয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে তদন্ত শেষে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। আদালত অভিযোগ প্রমাণিত বলে রায় দেন, তাআজিরের অধীনে মৃত্যুদণ্ড দেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর রাজকীয় আদেশে সাজা কার্যকর করা হয়। তবে প্রকাশিত বিবৃতিতে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, ঘটনাস্থল হিসেবে উল্লেখ করা মসজিদের পরিচয়, গ্রেপ্তারের সময় এবং বিচারপ্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানানো হয়নি। ফলে ঘটনার মৌলিক কিছু দিক এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়।

এই তথ্যগত ঘাটতি থেকেই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম: ঠিক কী অপরাধে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল? বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ মিশনের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের একটি বার্তায় ব্যভিচারের অভিযোগের কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবৃতিতে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ নেই। ফলে ওই অভিযোগকে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। অভিযোগ, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য—এই তিনটির মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। ন্যায়বিচার নিয়ে দায়িত্বশীল আলোচনা করতে হলে অনুমানের পরিবর্তে বিচারিক নথি, অভিযোগের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের ওপর নির্ভর করতে হবে।

মক্কা মুসলমানদের কাছে পবিত্রতম স্থানগুলোর একটি। সেখানে মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের অভিযোগ সৌদি আরবের আইন ও সামাজিক বাস্তবতায় গুরুতর হিসেবে বিবেচিত হওয়া স্বাভাবিক। সে দেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের স্থানীয় আইন মেনে চলতে হয়। কিন্তু কোনো দেশের আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন পরস্পরবিরোধী নয়। বিশেষত মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে অভিযোগের প্রকৃতি, প্রমাণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, আইনজীবীর সহায়তা এবং আপিলের প্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশ্য তথ্য সীমিত হলে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় দেওয়ার পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ নথি চাওয়াই দায়িত্বশীল অবস্থান।

ঘটনার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনকে অবহিত করা হয়নি বলে বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার-এর ১৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটনার স্বীকৃতি ও তথ্য চেয়ে যোগাযোগ করেছিল। ১৭ অক্টোবর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ সরকার সৌদি আরবের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পররাষ্ট্রসচিবের সঙ্গে সৌদি রাষ্ট্রদূতের বৈঠকেও বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে। তবে ওই বৈঠককে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রদূতকে তলব বলা হয়নি। অর্থাৎ বাংলাদেশ কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে; কিন্তু ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর তখনো পাওয়া যায়নি।

এখানে আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়টিও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও সৌদি আরব—উভয় দেশই কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের পক্ষভুক্ত। কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদে বিদেশে আটক বা হেফাজতে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে নিজ দেশের কনস্যুলার কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ এবং সহায়তার অধিকার নিয়ে বিধান রয়েছে। তবে এই বিধানের প্রয়োগ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি, কর্তৃপক্ষের করণীয় এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণের ওপর। শুধু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশকে না জানানোর তথ্যের ভিত্তিতে কনভেনশন লঙ্ঘিত হয়েছে—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। বরং জানতে হবে, দুই ব্যক্তি কখন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তাঁদের কনস্যুলার অধিকার সম্পর্কে জানানো হয়েছিল কি না, তাঁরা যোগাযোগের অনুরোধ করেছিলেন কি না এবং বাংলাদেশি মিশনকে কোনো পর্যায়ে তথ্য দেওয়া হয়েছিল কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে ঘটনাটি মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক দায়িত্ব এখানেই শেষ নয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে শুধু ঘটনার বিবরণ নয়, মামলার প্রাসঙ্গিক নথি, বিচারিক সিদ্ধান্ত, আপিল বা রায় চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়া এবং কনস্যুলার যোগাযোগের বিবরণও চাওয়া উচিত। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মিশনের কাছ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন নেওয়া প্রয়োজন—কখন তারা প্রথম ঘটনাটি জানতে পেরেছে, কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন প্রয়োজন। এ অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য কাউকে আগাম দায়ী করা নয়; বরং তথ্যের ভিত্তিতে দায়িত্ব ও সম্ভাব্য ঘাটতি নির্ধারণ করা।

এ ঘটনায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের আরেকটি মাত্রা রয়েছে—মৃতদের পরিবার। পরিচয় ও নাগরিকত্বের আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া জরুরি। ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মরদেহ প্রত্যাবাসনের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ চলছিল। তবে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার নিশ্চিত তথ্য ছাড়া মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে দাবি করা উচিত নয়। স্বজনদের অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পরিচালনা করা মানবিক দায়িত্বের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। সরকারকে নিয়মিতভাবে পরিবারগুলোকে অগ্রগতি জানাতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। তাঁদের শ্রম দেশের অর্থনীতি,বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং অসংখ্য পরিবারের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। এই বাস্তবতায় প্রবাসী নাগরিকদের সুরক্ষা কেবল বিদেশগমন-পূর্ব প্রশিক্ষণ বা স্থানীয় আইন সম্পর্কে সচেতনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। দূতাবাস ও কনস্যুলেটের জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা, আইনি সহায়তার সুযোগ, আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের প্রক্রিয়াও কার্যকর হতে হবে। বিদেশে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হলে একজন নাগরিকের নিজ দেশের সহায়তা পাওয়ার প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়। সে কারণেই প্রবাসী সুরক্ষাব্যবস্থাকে প্রতিক্রিয়াশীল নয়, আগাম প্রস্তুতিনির্ভর করে তোলা জরুরি।

বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ক শ্রমবাজার, বাণিজ্য, ধর্মীয় যোগাযোগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পর্কের স্বার্থে সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে নীরব থাকা প্রয়োজন—এমন ধারণা কূটনীতির উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সুসম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা, স্বচ্ছ যোগাযোগ এবং প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সদিচ্ছা। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়ার আগে উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য বা আইন লঙ্ঘনের চূড়ান্ত অভিযোগ তোলাও অনুচিত। বাংলাদেশের প্রয়োজন সংযত কিন্তু দৃঢ় অবস্থান—যেখানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্ব স্বীকার করা হবে, আবার নাগরিকের জীবন, বিচারপ্রক্রিয়া ও কনস্যুলার অধিকারের প্রশ্নও যথাযথ গুরুত্ব পাবে।

এখন বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি স্পষ্ট করণীয় রয়েছে। প্রথমত, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অভিযোগ ও বিচারিক সিদ্ধান্তের প্রাসঙ্গিক নথি সংগ্রহ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গ্রেপ্তার থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর পর্যন্ত কনস্যুলার যোগাযোগের বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা চাইতে হবে। তৃতীয়ত, মৃতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং মরদেহ প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিদেশে গুরুতর মামলায় আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে দ্রুত তথ্য পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক যোগাযোগব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে হবে। প্রয়োজনে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে নাগরিকদের সহায়তার জন্য একটি সুস্পষ্ট আন্তমন্ত্রণালয়ভিত্তিক কার্যপদ্ধতিও তৈরি করা করা যেতে পারে।

মক্কার এই ঘটনা নিয়ে জনমনে শোক, উদ্বেগ ও প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের পরিপক্বতা প্রকাশ পায় শুধু প্রতিক্রিয়ায় নয়, বরং প্রতিক্রিয়ার পর সে কতটা নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করে, দায়িত্ব নির্ধারণ করে এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে ব্যবস্থা নেয়, তার মধ্য দিয়ে। দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। কিন্তু সেই তথ্য সংগ্রহ, পরিবারকে সহায়তা এবং নাগরিক সুরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা পর্যালোচনা করার দায়িত্ব এখনই পালন করা সম্ভব। বিদেশে একজন বাংলাদেশির জীবন ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু কূটনৈতিক চিঠি পাঠানোতে শেষ হতে পারে না। সেই দায়িত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হলো—সত্য উদ্‌ঘাটন, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে আরেকটি পরিবারকে একই অনিশ্চয়তার মুখে পড়া থেকে রক্ষা করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বিশ্লেষক।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa