- - -

বয়সসীমা নয়, আইন পেশার অধঃপতনের জন্য দায়ী বার কাউন্সিল: মনজিল মোরসেদ

img 20261031 wa0275
Print News

বয়সসীমা নয়, আইন পেশার অধঃপতনের জন্য দায়ী বার কাউন্সিল: মনজিল মোরসেদ

 

আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। বার কাউন্সিলের একটি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০৩০ সাল থেকে আইনজীবী হওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে গণবিজ্ঞপ্তিও দিয়েছে বার কাউন্সিল। বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্যোগের উদ্দেশ্য ও বাস্তবতা, আইন পেশার মানোন্নয়ন এবং বার কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিয়ে দ্য লিগ্যাল পোস্ট বিডিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। তার মতে, আইন পেশার অধঃপতনের মূল কারণ বয়সসীমার অভাব নয়; বরং বার কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দুর্বলতা।

আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের উদ্যোগের বিষয়ে মনজিল মোরসেদ বলেন, প্রথমেই বলা প্রয়োজন, এটি এখনো কোনো আইন নয়। বার কাউন্সিলের একটি কমিটির সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাব। আইন হিসেবে কার্যকর করতে হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। বিষয়টি মন্ত্রণালয় ও সরকারের উচ্চপর্যায়েও বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। আইনমন্ত্রী এ উদ্যোগকে সমর্থন করেছেন বলে শুনেছি। তবে আইন প্রণয়নের আগে এর যৌক্তিকতা ও প্রভাব ভালোভাবে পর্যালোচনা করা উচিত।খবর বাপসনিউজ ও আইবিএননিউজ।তিনি বলেন, বয়সসীমা নির্ধারণের পক্ষে যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তা হলো—আইন পেশায় নতুন আসা ব্যক্তিদের মান ও যোগ্যতা নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছে। আদালত অঙ্গনে আইনজীবীদের পেশাগত মানের অবনতি ঘটেছে। কিন্তু এ সমস্যার জন্য শুধু নতুন প্রার্থীদের দায়ী করা যায় না। যাদের হাতে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির দায়িত্ব, সেই বার কাউন্সিলের দায়িত্বও এখানে রয়েছে।

আইন পেশার মানের অবনতির জন্য বার কাউন্সিলকে দায়ী করে তিনি বলেন, বার কাউন্সিল আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ। কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া বার কাউন্সিলের দায়িত্ব। কিন্তু আমরা কি দেখেছি, সাম্প্রতিক সময়ে পেশাগত অসদাচরণের জন্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আইনজীবীর সনদ বাতিল হয়েছে? বিভিন্ন সময়ে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, ধর্ষণ, এমনকি হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগও এসেছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের হলরুমে একজন আইনজীবী আরেকজনকে কলম দিয়ে আঘাত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। এ ঘটনায় অভিযোগ করা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ধরনের ঘটনা পেশার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা যদি নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে, তাহলে পেশার মান কীভাবে বজায় থাকবে?

সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে মনজিল মোরসেদ বলেন, একটা সময় সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে যথেষ্ট যাচাই-বাছাই হতো। ব্যারিস্টার এম আমীর উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদসহ জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সময়েও পেশাগত মান ও যোগ্যতার বিষয়টি গুরুত্ব পেত। তখন সুপ্রিম কোর্ট বারে একসঙ্গে হাজার হাজার সদস্য অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মতো ঘটনা দেখা যায়নি।

তিনি আরও বলেন, পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনা ও বার কাউন্সিলের নির্বাচনে ভোটের হিসাব থেকে বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে সদস্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের অনেকের যোগ্যতা ও পেশাগত প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন আছে। এভাবে যাচাই-বাছাই ছাড়া সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর ফলে সুপ্রিম কোর্ট বারের পেশাগত পরিবেশ ও মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর দায় সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না।

মনজিল মোরসেদ বলেন, বয়সসীমা নির্ধারণ করলেই যে পেশার মান বাড়বে, তা মনে করি না। ৩৫ বছরের কম বয়সী হলেই একজন প্রার্থী যোগ্য হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার ৩৫ বছরের বেশি বয়সী হলেই কেউ অযোগ্য হয়ে যাবেন, সেটিও ঠিক নয়। আইন পেশা একটি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ পেশা। এখানে বয়সকে প্রধান বিবেচ্য করা কতটা যুক্তিসংগত, তা ভেবে দেখা দরকার।

তিনি বলেন, যে বিচারিক সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ টেনে বয়সসীমার কথা বলা হচ্ছে, সেটির বক্তব্যও সঠিকভাবে বুঝতে হবে। সেখানে মূলত আইন শিক্ষার মান, দুই বছরের কোর্স এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থের বিনিময়ে সনদ দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষার মান ও যোগ্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সনদ দেওয়ার পরও প্রার্থীর যোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই করার সুযোগ রয়েছে। এমসিকিউ পরীক্ষার পাশাপাশি মৌখিক পরীক্ষার ক্ষেত্রেও কঠোর মানদণ্ড থাকা দরকার।

আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে মনজিল মোরসেদ বলেন, প্রথমত, বার কাউন্সিলকে কার্যকর নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আইনজীবীদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আসে, সেগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। দলমত নির্বিশেষে পেশাগত অসদাচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

দ্বিতীয়ত, আইনজীবীদের তালিকাভুক্তির পর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকা উচিত। আগে এনরোলমেন্টের পর আইনজীবীদের একটি কোর্স করতে হতো। এখন সেই ব্যবস্থা নেই। একজন নতুন আইনজীবীকে যথাযথ প্রশিক্ষণ না দিয়ে পেশায় যুক্ত করলে তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশিত দক্ষতা পাওয়া কঠিন।

তৃতীয়ত, তালিকাভুক্তির পরীক্ষায় যোগ্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। শুধু এমসিকিউ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই হবে না, মৌখিক পরীক্ষাসহ সব পর্যায়ে প্রার্থীর প্রকৃত দক্ষতা ও পেশাগত উপযুক্ততা যাচাই করতে হবে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে জরুরি হলো নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বার কাউন্সিল যদি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, তাহলে পেশার মানোন্নয়ন সম্ভব। বয়সসীমা নির্ধারণ করে একদিকে প্রবেশের পথ সীমিত করা হলো, কিন্তু অন্যদিকে পেশায় থাকা অযোগ্য বা অসদাচরণে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে সমস্যার সমাধান হবে না।

আমি মনে করি, বয়সসীমা নয়, বার কাউন্সিলের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির কারণেই আইন পেশার অধঃপতন ঘটেছে। তাই অন্য কোনো বিষয়ের ওপর দায় চাপানোর আগে বার কাউন্সিলকে নিজের দায়িত্ব পালনে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সংস্কারের মূল লক্ষ্য।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa