- - -

পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশ

Print News

পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশ

মো: কামাল উদ্দিন

উড়ন্ত পাখি আর ঘুরন্ত মানুষের মত পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা আমার একান্ত। আমার পৃথিবী ভ্রমণের স্বাদ থাকলেও কিন্তু সাধ্যের রয়েছে সীমাবদ্ধতা। তবুও অল্প সাধ্য ও ভাগ্যের বদৌলতে পুরো পৃথিবীর অল্প ক’টি দেশ ভ্রমণের সৌভাগ্য হয়েছে। তবেে কউ যদি প্রশ্ন রাখেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দর এবং পর্যটন উপযোগী দেশ কোনটি? তাহলে অবলীলায় বলতে হয় আমার সেই সোনার বাংলাদেশ। আমার মাতৃভূমি হিসেবে বাংলাদেশকে সর্বসুন্দর এবং শ্রেষ্ঠ বলছিনা। আমার মত যারা ভ্রমণপিয়াসী তারা এক বাক্যে স্বীকার করবেন যে আমাদের দেশের ন্যায় পর্যটন সমৃদ্ধ দেশ পৃথিবীতে কমই পরিলক্ষিত হয়।
পর্যটন শিল্পে আমার দেশের একটা সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। শুধু বর্তমান সময়ে নয়, শত শত বৎসর পূর্বেও আমাদের দেশ পৃথিবীর অন্যতম পর্যটন সম্পন্ন দেশ ছিল। বর্তমান দুনিয়ায় যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নতি বিশ্বকে খুবই ক্ষুদ্র ও কাছাকাছি করে তুলেছে। এমন একটি সময় ছিল যখন পৃথিবীতে বর্তমানকালের মতো উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সফলতা আসেনি। তখন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল পর্যটকরাই। পর্যটকরাই বিভিন্ন দেশ ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপন করতেন। সে সময় আমাদের এই উপমহাদেশের সাথে ইউরোপ, আফ্রিকা, চীনসহ বিভিন্ন দেশের যোগাযোগ স্থাপনে পর্যটকরাই প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন।
আমেরিকা আবিষ্কারের সূচনা করেছিলেন পর্যটক কলম্বাস। গ্রীক দেশিয় একজন পর্যটক যার নাম ছিল হোরোডটাস, তিনি সর্বপ্রথম এই উপমহাদেশে আগমন করেছিলেন। ভাস্কোদা গামা সুদূর স্পেন থেকে আফ্রিকা ঘুরে সমুদ্র পথে ভারতবর্ষে আসেন। হিউয়েন সাং এবং ফাহিয়েন নামক দু’জন পরিব্রাজক চীন থেকে বঙ্গদেশে আসেন অতি প্রাচীনকালে। এরপর ১৩৩৩ খ্রিষ্টাব্দে আসেন বিশ্বখ্যাত মৃর পরিব্রাজক ইবনে বতুতা। ভাষা, সংস্কৃতি, সভ্যতা সর্বোপরি জাতি-জনগোষ্ঠীর বহুমাত্রিক আচার আচরণের চলমান অভিধানের ভূমিকা পালন ছাড়াও আন্ত:দেশিয় বা মহাদেশিয় সংযোগ স্থাপনকারী ছিলেন পর্যটকরা। নদী পথের আবিষ্কারসহ নানা বিষয়ে তারা অবদান রাখেন। ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে বঙ্গদেশ তথা বর্তমান বাংলাদেশ সম্পর্কে যা লিপিবদ্ধ করেছেন তা আমাদের সাহিত্য জগতের অনবদ্য সংযোজন ছাড়াও ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিলরূপে সর্বজন স্বীকৃত। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত দেশিয় শিল্প আভ্যন্তরীণ বা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ সময়ে সীমিত সংখ্যক ধনী, সৌখিন অভিজাত ব্যক্তিবর্গ দেশ-বিদেশে চিত্ত বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে পর্যটন ব্যবহৃত হতো। কিন্তু বিগত চার দশকে এ অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে যা পরবর্তীতে পর্যটন শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এ শিল্প বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন দেশের মধ্যকার সামাজিক ও অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। সাথে সাথে দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধির ব্যাপারেও গুরুত্ব লাভ করছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে পর্যটকদের আগমন ঘটে। দ্রাবিড়, আর্য, মঙ্গোল, পারসি, তুর্কি, আফগান, পর্তুগীজ এবং সর্বশেষে ইংরেজসহ সবাই ছুটে এসেছিল এ ছোট্ট সবুজ ছায়াঘেরা শান্ত সমতল ভূমিতে। কেউ এসেছিল বাণিজ্যের জন্য, আবার কেউ এসেছিল আক্রমণকারী হিসেবে কেউ এসেছিল ধর্মপ্রচারের মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে। তবে ইবনে বতুতা (১৩৪৫), নিকোলাস পিজেন্টো এবং লুসাই ভাটোমেনাস (১৫০৩), কাইজার ফেডরিক (১৫৬৫), ব্রালফকিচ মোথোন্ড (সপ্তদশ শতাব্দী), সেবাস্তিন ম্যানরিক (১৬৪০) এর মতো বিখ্যাত পর্যটকেরা এসেছিলেন এদেশের মানুষকে জানতে, মানুষের বিস্ময়কর প্রতিভাকে আবিষ্কার করতে। তখন কোন পর্যটক বিভাগ, বিপণন বা বাজারজাতকরণের উন্নততর প্রক্রিয়া ছিল না। এরপরও হাজারো পর্যটকের আগমন ঘটেছিল এদেশে। তুর্কি আফগান ও পারস্যের শাসকগণ এদেশকে ভালবেসে এখানে বসতি স্থাপন করেন এবং হয়ে যান এদেশেরই মাটির অংশ। ইবনে বতুতাসহ অন্য পর্যটকগণ বাংলাদেশকে এমন সুন্দর দেশ আর কোথাও দেখেননি বলে অভিহিত করলেও মোগল শাসকরা এদেশকে বসবাসের উপযোগী স্থান হিসেবে মেনে নিতে পারেনি।
মোগলদের দৃষ্টিভঙ্গীতে বাংলাদেশের প্রাচুর্যের পাশাপাশি প্রতিকূল আবহাওয়া ও অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা বসবাসের অনুপযোগীতার স্বাক্ষর বহন করে। বাংলাদেশের প্রাচুর্যের অহংকার আর ঐতিহ্যোর গর্ব বিদেশি শাসক-শোষক গোষ্ঠীর হাতে লুণ্ঠিত ও ধ্বংস হয়েছে যুগ যুগ ধরে। কিন্তু তারপরও যা অবশিষ্ট আছে তার প্রসার ও উন্নয়নের জন্য হতে পারে সম্ভাবনার স্বর্ণদ্বার। যোগাযোগ ব্যবস্থার বিস্ময়কর উন্নয়ন সাধিত হওয়ার ফলে পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে দেশের জনসাধারণের মধ্যে অধিকতর জনসংযোগ সাধন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাবধারার বিনিময় এবং সর্বোপরি আন্তর্জাতিক সৌহার্দ, সহযোগিতা, বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ উপলব্ধি সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করেছে। জাতিসংঘের উদ্যোগে পর্যটন শিল্পের জন্য যথোপযুক্ত প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন প্রদান করার লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালে বিশ্ব পর্যটন সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশও এ সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশ।
এছাড়া ইউএনডিপি, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ, ইউনেস্কো, ইইসি, এসকাপ, এডিবি ইত্যাদি আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক এবং বহুজাতিক সংস্থা নানা প্রকার আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতার মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নে ক্রমবর্ধমান হারে সহায়তা প্রদান করে আসছে। পর্যটন শিল্পে বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মানবজাতির ইতিহাসের ক্রমবর্ধমান ধারা, বিভিন্ন সভ্যতার উৎপত্তি, দেশ, মহাদেশ, দ্বীপ, উপদ্বীপের সন্ধান লাভ বিভিন্ন প্রকার আবিষ্কার ইত্যাদির মূলে রয়েছে পর্যটন।
আদিম অধিবাসীরা খাদ্যের চাহিদা পুরণের লক্ষ্যে শিকারের সন্ধানে দূর-দূরান্তে ঘুরে বেড়ানোর সময় অজ্ঞাতসারে নতুন নতুন স্থানে গিয়ে হাজির হতো। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে জাহাজ চালনা করে সমুদ্রপথে হাজির হয়েছে নতুন ভূখন্ডে। পশু পালকেরা প্রয়োজনীয় তৃণভূমির সন্ধানে গবাদি পশু ও মেষ পাল নিয়ে হাজির হয়েছে নতুন চারণভূমিতে। অথচ এগুলোকে তারা কোনোদিন নতুন আবিষ্কার মনে করেনি। এভাবে নীল, ইউফ্রেটিস, টাইগ্রীস, সিন্ধু, গঙ্গা, হোয়াংহো প্রভৃতি নদীর উপত্যাকায় গড়ে ওঠা পৃথিবীর আদিম সভ্যতার মূলে রয়েছে পর্যটন। এভাবে আদিকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মনাব জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে পর্যটন।
অধুনা বিশ্বে পর্যটনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কদর ও এদেশের প্রতি ভিনদেশিদের আকর্ষণ অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশের পূর্ব ইতিহাস পর্যালোচনা করলে সেখানেও পর্যটনের অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা যায়। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির বঙ্গ বিজয়ের শুরুতে বঙ্গ অঞ্চল The Hellish paradish নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের রাজত্বকালে পাঠানরা এ ভূখন্ডে এসে এখানকার জীবনযাত্রা, ধনভান্ডার ও অন্যান্য বিষয়ের প্রতি আভিভূত হয়ে এ অঞ্চলকে paradish of dominions নামে অভিহিত করেন এবং এখানেই স্থায়ী বসতি স্থাপনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। Lotus Eaters প্রমুখ বঙ্গভূমিতে এমনই সৌন্দর্যের সন্ধান পান যে, তারা তাদের মাতৃভুমি তথা জন্মস্থানের কথাও ভুলে গিয়েছিলেন। বঙ্গভূমির উর্বর মৃত্তিকা, মৃদু মন্দা হাওয়া, আঁকা-বাঁকা নদী, সবুজ নীলিমা, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের নানারকম দৃশ্য এ সবকিছুই তাদের কাছে প্রকৃতির স্বকীয় দান বলে মনে হয়েছিল। তাঁরা তাঁদের স্ত্রী-পুত্র ক্রীতদাস বা দাসদাসীসহ এ ভূখন্ডেই থেকে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। বিখ্যাত পরিব্রাজক ফ্রান্সিস বার্নিয়ার বঙ্গভূমিতে এসে মন্তব্য করেন Bangala has hundred gates open for entrance, but one for departur অধিকাংশ ইউরোপীয়ান বণিকরা এদেশ সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করেন।
আজকের বাস্তব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে পরিপূর্ণ পর্যটন শিল্পে রূপ দিতে হলে বাংলাদেশের পর্যটনসমূহকে উন্নত বিশ্বের আধুনিক পর্যটনের মতো করে সাজাতে হবে। বিদেশি পর্যটকদের খাওয়া থাকার নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। বিশেষ করে কক্সবাজার, সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্থানসমূহের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

লেখক- সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক,টেলিভিশন উপস্থাপক।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa