- - -

ডাক বিভাগ: সাফল্য-ব্যর্থতার সন্ধিক্ষণে

Print News

ডাক বিভাগ: সাফল্য-ব্যর্থতার সন্ধিক্ষণে

আবদুল্লাহ মজুমদার

একসময় ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি ছিল একেকটি পরিবারের প্রতীক্ষার সুর। দুপুরের নিস্তব্ধতা ভেঙে সেই ঘণ্টা বেজে উঠলেই উঠোনে অপেক্ষা করতেন মা, বারান্দায় এসে দাঁড়াতেন বাবা, আর শিশুরা ছুটে যেত গেটের দিকে। হয়তো এসেছে প্রবাসে থাকা সন্তানের চিঠি, চাকরির নিয়োগপত্র, পরীক্ষার ফল, কিংবা প্রিয়জনের হাতে লেখা কয়েকটি শব্দ। একটি খামের ভেতর শুধু কাগজ থাকত না; থাকত ভালোবাসা, উদ্বেগ, আশ্বাস, স্বপ্ন আর সময়ের স্পর্শ। প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতিতে সেই দৃশ্য আজ অনেকটাই স্মৃতির অংশ। কিন্তু চিঠির ব্যবহার কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে ডাক বিভাগের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। বরং পরিবর্তিত বাস্তবতায় এই শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানটি নতুন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অতীতের গৌরব, বর্তমানের সংকট এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে একসূত্রে গাঁথতে পারলেই ডাক বিভাগ আবারও জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

ডাক বিভাগ একটি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান। যোগাযোগব্যবস্থা, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, বাণিজ্য, শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা এবং সামাজিক সম্পর্কের বিকাশে এর ভূমিকা সুদীর্ঘ ও সুপ্রতিষ্ঠিত। প্রযুক্তির বিকাশে যোগাযোগের ধরন বদলে গেলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে ডাক বিভাগের গুরুত্ব এখনও বহুলাংশে অটুট। তাই ডাক বিভাগকে কেবল অতীতের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং বর্তমান বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজনের আলোকে এর ভূমিকা নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি।

ভারতীয় উপমহাদেশে সংগঠিত ডাক ব্যবস্থার সূচনা হয় শের শাহ সূরির শাসনামলে। তিনি দীর্ঘ সড়কপথ নির্মাণের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ডাকচৌকি স্থাপন করেন, যাতে প্রশাসনিক সংবাদ দ্রুত আদান-প্রদান করা যায়। পরবর্তীকালে মুঘল শাসকেরা সেই ব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারিত করেন। তবে আধুনিক ডাক প্রশাসনের ভিত্তি গড়ে ওঠে ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে। ডাকটিকিট, নিবন্ধিত ডাক, মানি অর্ডার, পার্সেল সেবা এবং ডাক সঞ্চয় ব্যাংকের মতো সেবা চালুর মাধ্যমে ডাক বিভাগ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭১ সালে ডাক বিভাগ নতুন রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠিত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের প্রশাসনিক যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সরকারি কার্যক্রম সচল রাখা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক বিভাগের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়নে ডাকঘরের উপস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে একটি কার্যকর যোগাযোগের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেছে।

ডাক বিভাগের গুরুত্ব কখনোই শুধু চিঠি পরিবহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সরকারি গেজেট, আদালতের সমন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, আন্তর্জাতিক ডাক আদান-প্রদান, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক, ডাক জীবন বীমা এবং অর্থ প্রেরণ—এসব ক্ষেত্রেও ডাক বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কার্যক্রমে ডাক বিভাগের নির্ভরযোগ্যতা বহু দশক ধরে স্বীকৃত।

ডাকটিকিটের গুরুত্বও কম নয়। একটি ক্ষুদ্র ডাকটিকিটের মধ্যেই একটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, জাতীয় ব্যক্তিত্ব এবং ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটে। অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও ডাকটিকিট কেবল ডাক মাশুলের প্রতীক নয়; এটি জাতীয় পরিচয় ও ঐতিহাসিক স্মৃতির এক নীরব দলিল।

একসময় গ্রামের ডাকপিয়ন ছিলেন পরিচিত ও আপনজনের মতো একজন মানুষ। তিনি শুধু চিঠি পৌঁছে দিতেন না; কখনো সুখবর, কখনো দুঃসংবাদ, কখনো আবার বহুদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠতেন। সেই মানবিক সম্পর্ক আজ অনেকটাই ম্লান হলেও ডাক বিভাগের সামাজিক গুরুত্ব এখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ যোগাযোগের প্রচলিত ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ই-মেইল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার প্রায় বিলুপ্তির পথে নিয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ডে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বার্তা পৌঁছে যাওয়ার এই যুগে কাগজের চিঠির প্রয়োজন স্বাভাবিকভাবেই কমেছে। ফলে ডাক বিভাগের প্রচলিত সেবার চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

তবে এটিই পুরো বাস্তবতা নয়। চিঠির ব্যবহার কমলেও পার্সেল পরিবহন, ই-কমার্স, সরকারি নথিপত্র প্রেরণ, আন্তর্জাতিক ডাকসেবা এবং আর্থিক সেবার প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ পার্সেল পরিবহন, এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিস (ইএমএস), আন্তর্জাতিক ডাকসেবা, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক, ডাক জীবন বীমা, অর্থ স্থানান্তর এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা প্রদান করছে। বিশেষ করে ই-কমার্সের প্রসারের ফলে দেশের বিস্তৃত ডাকঘর নেটওয়ার্ক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত সরকারি সেবার নেটওয়ার্কগুলোর একটি হওয়ার পরও ডাক বিভাগ কি তার প্রকৃত সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পেরেছে? প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে কেন বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের প্রথম পছন্দে পরিণত হলো? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করাই এখন সময়ের দাবি।

ডাক বিভাগের বর্তমান অবস্থার মূল্যায়ন করতে গেলে আবেগ নয়, বাস্তবতাকেই প্রাধান্য দিতে হবে। সত্য হলো, এই প্রতিষ্ঠানের রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস, বিস্তৃত অবকাঠামো এবং জনআস্থার দীর্ঘ ঐতিহ্য। আবার এটিও সত্য যে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়নে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। ফলে একসময় যে প্রতিষ্ঠান মানুষের যোগাযোগের প্রধান ভরসা ছিল, আজ অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিযোগিতার দৌড়ে পিছিয়ে পড়েছে।

ডাক বিভাগের অন্যতম বড় সংকট প্রযুক্তিগত রূপান্তরে ধীরগতি। পৃথিবী যখন ডিজিটাল যোগাযোগ, স্বয়ংক্রিয় লজিস্টিকস এবং রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে গেছে, তখন দেশের অনেক ডাকঘর এখনও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট এবং সেবাগত দুর্বলতার সঙ্গে লড়াই করছে। অনেক ক্ষেত্রে পার্সেল বা গুরুত্বপূর্ণ নথি পৌঁছাতে অযৌক্তিক বিলম্ব, গ্রাহকসেবার দুর্বলতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার অভাব মানুষের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত প্রশাসনিক জটিলতা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতাও এ অবস্থার জন্য কম দায়ী নয়।

তবে পুরো দায় ডাক বিভাগের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও ন্যায়সংগত হবে না। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, মানুষের যোগাযোগের অভ্যাসের পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের সীমিত বিনিয়োগ, নীতিগত ধীরগতি এবং বেসরকারি খাতের আক্রমণাত্মক সম্প্রসারণ—সবকিছু মিলিয়েই আজকের বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। যখন বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত, প্রযুক্তিনির্ভর ও নমনীয় সেবা চালু করেছে, তখন ডাক বিভাগ নানা প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে একই গতিতে এগোতে পারেনি।

অথচ দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত সরকারি সেবার নেটওয়ার্ক এখনও ডাক বিভাগের হাতেই রয়েছে। হাজারো ডাকঘর, প্রশিক্ষিত জনবল, রাষ্ট্রীয় আস্থা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানোর সক্ষমতা—এসবই এমন সম্পদ, যা অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নেই। প্রশ্ন হলো, এই শক্তিকে কি কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেছে? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে সেই ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করে দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়াই হবে বিচক্ষণতার পরিচয়।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ডাক বিভাগ আর কেবল চিঠি বহনের প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক দেশে এটি ই-কমার্স লজিস্টিকস, ডিজিটাল আর্থিক সেবা, সরকারি নাগরিকসেবা, পরিচয় যাচাইকরণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সরবরাহব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে। পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েই তারা টিকে আছে, এমনকি নতুন সম্ভাবনাও সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের জন্যও সেই পথ উন্মুক্ত। দেশের প্রতিটি ডাকঘরকে আধুনিক নাগরিকসেবা কেন্দ্রে রূপান্তর করা যেতে পারে। ই-কমার্স পণ্যের নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা, উন্নত ট্র্যাকিং প্রযুক্তি, ডিজিটাল পেমেন্ট, সরকারি সেবার ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য লজিস্টিকস সহায়তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা—এসব উদ্যোগ ডাক বিভাগের কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে দক্ষ জনবল তৈরি, কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকবান্ধব সেবার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও অপরিহার্য।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আমরা অনেক সময় সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সমালোচনা করি, কিন্তু তাদের পরিবর্তনের সুযোগ ও সক্ষমতার কথাও ভাবতে হবে। ডাক বিভাগকে অতীতের একটি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে ভবিষ্যতের একটি আধুনিক জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের সুযোগ করে দিতে হবে। রাষ্ট্র, নীতিনির্ধারক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ জনগণ—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

ডাক বিভাগের সংকট মূলত চিঠির সংকট নয়; এটি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলার সংকট। যে প্রতিষ্ঠান একসময় মানুষের সুখ-দুঃখ, রাষ্ট্রের নির্দেশ এবং সমাজের স্পন্দন বহন করত, সেই প্রতিষ্ঠানকে আজ বহন করতে হবে ডিজিটাল যুগের প্রত্যাশাও। অতীতের গৌরব যেমন আত্মবিশ্বাস জোগায়, তেমনি বর্তমানের সীমাবদ্ধতা আত্মসমালোচনার আহ্বান জানায়। পরিবর্তনকে সাহসের সঙ্গে গ্রহণ করে যদি ডাক বিভাগ নিজেকে আধুনিক, দক্ষ, স্বচ্ছ ও জনমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে পারে, তবে ডাকপিয়নের সেই হারিয়ে যেতে বসা ঘণ্টাধ্বনি হয়তো আর হাতে লেখা চিঠির আগমনী বার্তা বহন করবে না; কিন্তু নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার এক আশাব্যঞ্জক প্রতিধ্বনি হয়ে আবারও মানুষের দুয়ারে পৌঁছাবে। ঐতিহ্যকে ধারণ করে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাওয়াই হোক বাংলাদেশ ডাক বিভাগের নতুন অভিযাত্রার অঙ্গীকার।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa