- - -

চট্টগ্রামের নগর রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ

Print News

চট্টগ্রামের নগর রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ

শাহ জালাল

নগর রাজনীতির দৃশ্যপট কখনো কখনোএমন কিছু নতুন চরিত্রের আবির্ভাবে বদলে যেতে শুরু করে, যাঁরা কেবল একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নন; বরং দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পৃক্ততা, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং জনপরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকদের সামনে বিকল্প নেতৃত্বের সম্ভাবনাও তুলে ধরেন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) নির্বাচনকে ঘিরে এবার তেমনই একটি আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন লেখক, সাংবাদিক ও সংগঠক আবদুল্লাহ মজুমদার। তাঁর মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণাকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি নাগরিক সমাজেও নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, এই প্রার্থিতা কেবল নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন একটি নামের সংযোজন নয়; বরং নগর উন্নয়ন, সুশাসন, নাগরিক নেতৃত্ব এবং বিকল্প রাজনৈতিক ভাবনারও একটি নতুন অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।

আবদুল্লাহ মজুমদার বর্তমানে লাভ বাংলাদেশ পার্টির চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি তিনি ট্রাস্ট অব হিউম্যান রাইটস বাংলাদেশের মহাসচিব, সেভ দ্য রিভার্স বাংলাদেশ সোসাইটি, চট্টগ্রামের সভাপতি এবং চট্টগ্রাম বিনোদন সাংবাদিক সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। সাংবাদিকতা পেশায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তিনি বর্তমানে দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম-এর সাহিত্য সম্পাদক এবং বাণিজ্যিক রাজধানী ও বাংলাদেশ টোটাল নিউজ-এর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি জুলেখা আমিনুর রহমান সিটি কর্পোরেশন উচ্চবিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সদস্য। সাহিত্যচর্চায়ও তিনি সুপরিচিত; কবিতা, প্রবন্ধ, কলাম এবং সমসাময়িক নানা বিষয়ে তাঁর নিয়মিত লেখালেখি রয়েছে। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ দুধের বালক সাহিত্যাঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেছে। দীর্ঘদিনের সাহিত্যচর্চা, সাংবাদিকতা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি সাহিত্যাঙ্গণেও নিজের মেধা ও সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন এবং পাঠক-লেখক মহলে একটি পরিচিত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। দীর্ঘদিনের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার কারণে তিনি অনেকের কাছে একজন ভদ্র, মার্জিত ও সমাজের পরিচিত মুখ হিসেবেও বিবেচিত। ফলে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি একটি বিস্তৃত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

আবদুল্লাহ মজুমদারের বহুমাত্রিক সাংগঠনিক সম্পৃক্ততাও তাঁর প্রার্থিতাকে ভিন্নভাবে আলোচনায় এনেছে। মানবাধিকার, পরিবেশ, সাংবাদিকতা, শিক্ষা ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে নগরজীবনের বহুমাত্রিক সমস্যার সঙ্গে সরাসরি পরিচিত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নাগরিক অধিকার, সেবার মান এবং জবাবদিহির প্রশ্নে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। নদী ও পরিবেশবিষয়ক সংগঠনের নেতৃত্ব জলাবদ্ধতা, খাল-নদী সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁকে আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। আবার সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা জনমত, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নাগরিক প্রত্যাশা সম্পর্কে তাঁকে বাস্তবধর্মী ধারণা দিয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা শিক্ষাবান্ধব নগর গঠনের ভাবনাকেও শক্তিশালী করতে পারে। তবে এসব অভিজ্ঞতা নির্বাচিত হলে কতটা কার্যকর নগর প্রশাসনে রূপ নেবে, সেটিই হবে ভোটারদের অন্যতম মূল্যায়নের বিষয়।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নগর উন্নয়ন, সুশাসন এবং জনসেবাকে অগ্রাধিকার দিয়েই তাঁকে মেয়র পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রার্থিতা ঘোষণার পর আবদুল্লাহ মজুমদার বলেছেন, চট্টগ্রাম একটি ঐতিহ্যবাহী ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নগরী হলেও নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে এখনো বহু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই তিনি নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় রাজনীতির তুলনায় অনেক বেশি নাগরিক সেবা ও বাস্তব সমস্যার সমাধানকেন্দ্রিক। চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরনির্ভর অর্থনৈতিক নগরী হলেও জলাবদ্ধতা, যানজট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, পরিবেশ দূষণ, খাল-নদী দখল, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং উন্মুক্ত স্থানের সংকট দীর্ঘদিন ধরে নগরবাসীর প্রধান দুর্ভোগ। ফলে এবারের নির্বাচনেও ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে—কে এসব সমস্যার কার্যকর ও টেকসই সমাধান দিতে পারবেন?

আবদুল্লাহ মজুমদার তাঁর অগ্রাধিকারের তালিকায় জলাবদ্ধতা নিরসন, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট নিরসন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের উন্নয়ন, নগর পরিচালনায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির কথা বলেছেন। এসব অঙ্গীকার সময়োপযোগী হলেও সেগুলোর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, দক্ষ প্রশাসনিক সমন্বয়, অর্থায়নের সক্ষমতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। নাগরিকরা এখন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়; বরং নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, সময়সীমা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনের নিশ্চয়তা দেখতে চান।

একজন লেখক, সাংবাদিক ও সংগঠক হিসেবে আবদুল্লাহ মজুমদারের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রচলিত রাজনৈতিক প্রার্থীদের তুলনায় একটি ভিন্ন অবস্থানে নিয়ে এসেছে। নাগরিক সমস্যা নিয়ে ধারাবাহিক লেখালেখি, সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্ব এবং মানবাধিকার ও পরিবেশবিষয়ক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা তাঁর জনপরিচিতিকে সমৃদ্ধ করেছে। সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তাঁর দীর্ঘ পথচলা তাঁকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে পরিচিত করে তুলেছে। তবে নির্বাচনের বাস্তবতায় ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির পাশাপাশি সাংগঠনিক শক্তি, দলীয় অবকাঠামো, নির্বাচনী কৌশল এবং ভোটারদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তাঁর প্রার্থিতা যেমন সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষার মুখেও দাঁড়িয়ে আছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তরুণ ভোটারদের ভূমিকা। বর্তমান প্রজন্ম উন্নয়ন, স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিক সেবা, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের প্রশ্নে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। তাঁরা ব্যক্তি বা দলীয় পরিচয়ের চেয়ে নেতৃত্বের দক্ষতা, সততা এবং কার্যকর পরিকল্পনাকে বেশি গুরুত্ব দেন। এই বাস্তবতায় বিকল্প রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে আবদুল্লাহ মজুমদারের প্রার্থিতা তরুণ ভোটারদের মধ্যে কতটা সাড়া ফেলতে পারে, সেটিও নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠতে পারে।

চট্টগ্রাম কেবল একটি সিটি কর্পোরেশন নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, বন্দরনগরী এবং সম্ভাবনার মহানগর। এই নগরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এমন নেতৃত্বের ওপর, যাঁরা দূরদর্শী পরিকল্পনা, জবাবদিহি, দক্ষতা এবং জনসম্পৃক্ততাকে সমান গুরুত্ব দিতে পারবেন। আবদুল্লাহ মজুমদারের প্রার্থিতা সেই আলোচনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর সাহিত্যচর্চা, সাংবাদিকতা, মানবাধিকার ও পরিবেশভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন, শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট সম্পৃক্ততা এবং বহুমাত্রিক সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তাঁকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো প্রার্থীর অতীত অভিজ্ঞতা যতই সমৃদ্ধ হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা অর্জনের প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা, কার্যকর নেতৃত্ব এবং সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা। চসিক নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম নয়।

নগরবাসী নিশ্চয়ই এমন নেতৃত্বই প্রত্যাশা করবেন, যিনি কথার চেয়ে কাজে বেশি বিশ্বাসী, প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেন এবং একটি আধুনিক, বাসযোগ্য, পরিবেশবান্ধব ও মানবিক চট্টগ্রাম গড়ে তোলার সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারেন। এই প্রত্যাশার আলোকে আবদুল্লাহ মজুমদারের প্রার্থিতাও এখন জনমতের বিচারে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখোমুখি।

লেখক: সাংবাদিক, সাধারণ সম্পাদক, লাভ বাংলাদেশ পার্টি, চট্টগ্রাম মহানগর

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa