- - -

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলা দেখতে ডিমলায় জনতার ঢল

img 20261022 wa0092
Print News

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলা দেখতে ডিমলায় জনতার ঢল

গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, শেকড়ের টান আর মানুষের প্রাণের মেলবন্ধন। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলার টানে নীলফামারীর ডিমলায় জড়ো হন হাজারো দর্শক। খেলোয়াড়দের ক্ষিপ্রতা, কৌশল আর রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে মেতে ওঠেন দর্শকেরা। খেলা ঘিরে বসে গ্রামীণ মেলা, জমে ওঠে বিভিন্ন পণ্যের বেচাকেনা। সব মিলিয়ে মাঠজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ, যেন ফিরে আসে গ্রামবাংলার চিরচেনা সেই ঐতিহ্যের দিনগুলো।

বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানি ইউনিয়নের পূর্ণারঝার ফুটব্রিজ-সংলগ্ন মাঠে পূর্ণারঝার যুব সমাজের উদ্যোগে এ হাডুডু টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে আয়োজনটি রূপ নেয় এক গ্রামীণ মিলনমেলায়।

টুর্নামেন্টে আটটি দল অংশ নেয়। বিভিন্ন ধাপের খেলা শেষে ফাইনালে মুখোমুখি হয় কাঁকড়া একাদশ, ঝুনাগাছ চাপানি এবং স্বাগতিক পূর্ণারঝার একাদশ, খালিশা চাপানি। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফাইনাল খেলায় স্বাগতিক পূর্ণারঝার একাদশ ২৬ পয়েন্ট অর্জন করে বিজয়ী হয়। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ কাঁকড়া একাদশ অর্জন করে ১৪ পয়েন্ট। টুর্নামেন্টে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হন বিজয়ী দলের খেলোয়াড় টাইগার সেলিম।

খেলাকে কেন্দ্র করে মাঠসংলগ্ন এলাকায় বসে গ্রামীণ মেলা। বুট, বাদাম, চানাচুর, জিলাপি ও মিষ্টিসহ বিভিন্ন মুখরোচক খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। পাশাপাশি বসে নানা ধরনের অস্থায়ী দোকান। খেলা দেখতে আসা দর্শনার্থীদের ভিড়ে এসব দোকানেও চলে বেচাকেনা। খেলাধুলার উত্তেজনার পাশাপাশি খাবারের দোকান ও মেলার আমেজে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ খেলা উপভোগের পাশাপাশি মেলা ঘুরে কেনাকাটা ও আড্ডায় মেতে ওঠেন।

খেলা শেষে আয়োজিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খালিশা চাপানি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মঈনুল হক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিমলা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক কাজী হাবিবুর রহমান।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন খালিশা চাপানি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুজ্জামান সরকার, সাবেক চেয়ারম্যান সামছুল হক হুদা, খালিশা চাপানি ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি মো. ওবায়দুর রহমান, ডিমলা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আয়েশা সিদ্দিকা, ইউপি সদস্য সেলিমুর রহমান, গোল্ডেন এডুকেয়ার হোম স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান, ইউপি সদস্য সামিউল ইসলাম শিমুল, সমাজসেবক তালিমুল ইসলাম, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আতাউর রহমান আসিক, সমাজসেবক ওহায়দুর রহমানসহ অনেকে।

খেলা দেখতে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। মাঠের চারপাশে ভিড় করে দর্শকেরা উপভোগ করেন খেলোয়াড়দের নৈপুণ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিশেষ করে নারী দর্শকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দর্শনার্থীরা জানান, এমন আয়োজন গ্রামীণ মানুষের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী খেলাটির প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়াবে। তাঁরা প্রতিবছর এ ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন অব্যাহত রাখার দাবি জানান।

উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি গ্রামের খলিলুর রহমান বলেন, ‘কালের বিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলা হারিয়ে যেতে বসেছে। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোররা খেলাটির নামও ভুলতে বসেছে। ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে মাদক ও মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রাখতে এমন আয়োজনের বিকল্প নেই।’

বাঘেরপুল গ্রামের গৃহবধূ বিলকিস আক্তার বলেন, ‘এ খেলাকে কেন্দ্র করে গ্রামের তরুণেরা বেশ কিছুদিন ধরে অনুশীলন করেছে। তাদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। এমন আয়োজন গ্রামের মানুষের মধ্যে আনন্দ ও উৎসাহ সৃষ্টি করেছে।’

স্থানীয় জুলহাস হুসেন বলেন, ‘তরুণদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ত রাখলে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকবে এবং মাদক থেকে দূরে থাকতে পারবে। আমরা তরুণদের এই নান্দনিক খেলা বেশ উপভোগ করেছি। এমন সুন্দর আয়োজন প্রতিবছর করা প্রয়োজন।’

আয়োজক কমিটির সদস্য আনারুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রামবাংলার একসময়ের জনপ্রিয় খেলা হাডুডু এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। একসময় গ্রামের কাঁচা রাস্তার পাশে, মাঠে, বাগানে কিংবা খোলা জায়গায় উৎসবমুখর পরিবেশে এ খেলা অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু কালের আবর্তে সেই চেনা দৃশ্য এখন আর তেমন দেখা যায় না। ঐতিহ্যবাহী খেলাটিকে টিকিয়ে রাখা এবং নতুন প্রজন্মকে এর প্রতি আগ্রহী করে তুলতেই স্থানীয়দের নিয়ে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছি। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এ টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।’

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো. মঈনুল হক বলেন, ‘আধুনিকতার ছোঁয়ায় ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলা হারিয়ে যেতে বসেছে। এমন উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আমি আয়োজকদের সাধুবাদ জানাই এবং প্রতিবছর এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখতে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছি।’

হাডুডু শুধু একটি খেলা নয়, এটি গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম দেশীয় খেলাধুলার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়, তরুণেরা পায় সুস্থ বিনোদনের ক্ষেত্র, আর গ্রামীণ মানুষ ফিরে পায় একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার উপলক্ষ। নিয়মিত এমন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা গেলে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ক্রীড়া ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa