
আবুল মাল আবদুল মুহিতকে মনে পড়ে?
খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, লেখক এবং ভাষাসৈনিক
২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী ছিলেন
আবুল মাল আবদুল মুহিত বহু গ্রন্থের লেখক। তার লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল – স্মৃতিময় কর্মজীবন,
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সম্ভাবনা,
বাংলাদেশের অভ্যুদয়, স্মৃতি অম্লান ১৯৭১,
বাংলাদেশ : জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব, মহাপুরুষদের কথা কাছে থেকে দেখা, নানা দেশ নানা জাতি, স্মৃতির মণিকোঠায়, আমার সিলেট, মুক্তিযুদ্ধের রচনাসমগ্র,
বসবাসের উপযুক্ত বাংলাদেশ চাই, সংকট ও সুযোগ,
আমাদের জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন, নির্বাচন ও প্রশাসন, আমাদের বিপন্ন পরিবেশ, সোনালি দিনগুলি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাতাশ মাস,
রাজনৈতিক ঐকমত্যের সন্ধানে, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ ইত্যাদি।
সৎ মানুষ ছিলেন –
সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে তাঁর সহকর্মী, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বিশিষ্টজনেরা আপাদমস্তক একজন সৎ, আদর্শবান ও কর্মঠ মানুষ হিসেবে গণ্য করতেন।
তাঁর সফলতা –
তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৬৬ সালে তাকে ‘তমঘা ই খিদমত’ পদকে ভূষিত করে।
পরিবেশ রক্ষা করা, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তরকরণ, বিনোদন পার্ক সৃষ্টিতে তার ভূমিকা রয়েছে। এ জন্য সিলেট জেলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সটি তার নামে নামকরণ করা হয়।
তিনি
টানা দশ বার বাজেট পেশকারী অর্থমন্ত্রী –
আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘসময় অর্থাৎ টানা ১০ বার বাজেট পেশকারী অর্থমন্ত্রী। তিনি মূলত দেশের অর্থনীতিতে ধারাবাহিকতা, বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন, পদ্মা সেতু সহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে বলিষ্ঠ পদক্ষেপের জন্য সফল হিসেবে গণ্য হয়ে আছেন।
তবে ব্যাংকিং খাতে আর্থিক কেলেঙ্কারি ও শৃঙ্খলা ফেরাতে না পারার কারণে তিনি সমালোচিতও হয়েছেন।
অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার সফলতার দিকগুলি হলো –
২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা ১০টি বাজেট পেশের বিরল রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন।
মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন – বিশেষকরে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো সাহসিকতাপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং বড় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণ হয়েছিল তার আমলে।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল তার আমলে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিক রাখা এবং এলডিসি অর্থাৎ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে দেশকে এগিয়ে নিতে পেরেছিলেন।
ব্যাংকিং খাতে কেলেঙ্কারি ঘটেছে তার আমলে। হল-মার্ক, বেসিক ব্যাংক, এবং শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির মতো বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলো রোধ করতে পারেননি।
অর্থনৈতিক অপরাধে কঠোর হতে পারেননি।
বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে তার ব্যর্থতা ছিল।
নতুন মূল্য-সংযোজন কর বা ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে জটিলতা এবং তা সফলভাবে পুরোপুরি কার্যকর করতে পারেননি তিনি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি’র ওপর ১৫% ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি।
আবুল মাল আবদুল মুহিত একজন দূরদর্শী পরিকল্পনাবিদ হিসেবে অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী করলেও ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় পুরোপুরি সফল হননি, যা তার মেয়াদের অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত।
আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন একজন সফল অর্থনীতিবিদ, দক্ষ প্রশাসক এবং দীর্ঘকালীন অর্থমন্ত্রী, যাকে সাধারণভাবে সৎ, স্পষ্টভাষী, প্রাণবন্ত ও মেধাবী মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার জন্য প্রশংসিত হলেও, তার স্পষ্টভাষী মন্তব্যের কারণে বিভিন্ন ইস্যুতে সমালোচিতও হয়েছেন।
আবুল মাল আবদুল মুহিত ছিলেন অফুরন্ত জীবনীশক্তির অধিকারী, সদা হাস্যোজ্জ্বল, অসাম্প্রদায়িক, সৎ এবং প্রগতিশীল। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন এবং পরপর ১২টি বাজেট পেশ করে তিনি সফলতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
কর্মজীবনে কিছু স্পষ্টভাষী মন্তব্য বা কঠোর অবস্থানের কারণে তিনি সমালোচিত হয়েছেন। যেমন- শিক্ষকদের বেতন স্কেল সংক্রান্ত বক্তব্য দিয়ে।
পেশাগত জীবনে অত্যন্ত সফল ও সৎ হিসেবে পরিচিত হলেও, ব্যক্তিগত মত প্রকাশ ও সিদ্ধান্তে তিনি মিশ্র প্রতিক্রিয়া বা সমালোচনাও কুড়িয়েছেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি –
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন এবং বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখেন।
ওয়াশিংটনে তৎকালীন পাকিস্তানের দূতাবাসে প্রথম কূটনীতিবিদ হিসেবে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বপক্ষে নিজ অবস্থান তুলে ধরে চাকরি থেকে ইস্তফা প্রদান করেন মুহিত।
পরে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে গঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়াশিংটন দূতাবাসে ইকনমিক কাউন্সেলরের দায়িত্ব পালেন করেন তিনি।
সাধারণ মানুষের পাশে তিনি –
তাঁর উচ্চবিত্ত পারিবারিক আভিজাত্য থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের সাথে সহজভাবে মিশতে পারতেন। সারা জীবন জ্ঞানের চর্চা করে গেছেন।
আমার কাছ থেকে আমার লেখা ‘৬৪ জেলা ভ্রমণ’ এবং ‘চলচ্চিত্র তারকাদের কথা’ গ্রন্থ দু’টি ক্রয় করেছিলেন তিনি, তখন তাঁর মুখে ছিল হাসি।
পরিবারের কথা –
আবুল মাল আবদুল মুহিতের স্ত্রীর নাম সৈয়দা সাবিয়া। এই দম্পতির সন্তানরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল এবং প্রতিষ্ঠিত।
কন্যা সামিনা মুহিত একজন ব্যাংকার এবং আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ।
বড় ছেলে শাহেদ মুহিত পেশায় একজন বাস্তুকলাবিদ বা স্থপতি।
তাদের ছোট ছেলে সামির মুহিত শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত এবং বর্তমানে প্রবাসে কর্মরত আছেন।
পারিবারিকভাবে আবুল মাল আবদুল মুহিতের বংশধর সিলেটের একটি প্রগতিশীল ও রাজনৈতিক অভিজাত পরিবারের উত্তরাধিকার বহন করছেন। তার ভাই এ কে আবদুল মোমেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বোন শাহলা খাতুন একজন জাতীয় অধ্যাপক ও প্রখ্যাত চিকিৎসক।
আবুল মাল আবদুল মুহিত পরলোকগমন করেন ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি –
আবুল মাল আবদুল মুহিতের জন্ম ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটে। তার পিতা আবু আহমদ আবদুল হাফিজ উকিল মিয়া ছিলেন নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সিলেট শাখার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি সিলেট গণভোট ও পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। তার মা সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী ছিলেন বাংলা ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী। শুধু তাই নয়, সুফী কবি সৈয়দ আশহর আলী চৌধুরীর নাতনী ছিলেন। ১৪ ভাইবোনের মধ্যে আবুল মাল আবদুল মুহিত তৃতীয় ছিলেন। তাঁর দাদা খান বাহাদুর আব্দুর রহীম ছিলেন রায়নগরের মুন্সী আবদুল কাদের ও মতি বিবি বিনতে মুহম্মদ উজায়েরের ছেলে। তাঁদের আদিবাড়ি ছিল দর্জিপাড়ায়, পরে সোনারপাড়া থেকে মোখতার খান কিরমানী মহল্লায় চলে যান। তাঁর দাদী হাফিজা বানু ছিলেন পাঠানটুলার আব্দুল কাদেরের মেয়ে, মৌলভী আব্দুল করীমের ভাতিজি এবং শিক্ষামন্ত্রী আবদুল হামিদের বোন।
স্কুল জীবন –
আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৪৯ সালে সিলেট সরকারি পাইলট হাইস্কুল (তৎকালীন ‘গভর্নমেন্ট হাই ইংলিশ স্কুল’) থেকে বিজ্ঞান শাখায় প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন (তৎকালীন প্রবেশিকা) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
এই স্কুলে তিনি ১৯৪১ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি স্কাউটিং এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন।
শৈশব ও কৈশোর থেকেই তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় মনোনিবেশ করেছিলেন এবং শিশু-কিশোর সংগঠন ‘মুকুল ফৌজ’ গড়ে তুলেছিলেন।
মেধাবী ও সাহিত্যমনস্ক পরিবারে বড় হওয়ার কারণে খুব অল্প বয়স থেকেই তিনি সামাজিক ও সৃজনশীল কাজে জড়িয়ে পড়েন।
কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন –
আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৫১ সালে সিলেটের মুরারি চাঁদ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯৫৪ সালে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণী পেয়ে কৃতকার্য হন। ইংরেজি সাহিত্যে ১৯৫৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। বিদেশে চাকরিরত অবস্থায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন তিনি। অতঃপর ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রী লাভ করেন।
কর্মজীবন –
পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব হিসেবে ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। অর্থনৈতিক পরামর্শক হিসেবে ১৯৬৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৎকালীন পাকিস্তান দূতাবাসে যোগদান করেছিলেন। চাকরিরত অবস্থায় পাকিস্তান কর্মপরিকল্পনা কমিশনের প্রধান ও উপ-সচিব ছিলেন। সে সময় তিনি পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য প্রতিবেদন আকারে তুলে ধরেন ও পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসে পেশ করেন।
পরিকল্পনা কমিশনের সচিব –
পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আবুল মাল আবদুল মুহিত।
সরকারি চাকরি হতে অবসর –
১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে আবুল মাল আবদুল মুহিত সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। এরপর তিনি ফোর্ড ফাউণ্ডেশনের অর্থনীতি এবং উন্নয়ন বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন সংস্থা বা ইফাদেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা –
১৯৮২-১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে এরশাদ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন মুহিত। পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।
বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ, আইডিবি এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সিলেট -১ আসনে বিজয়ী
আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের মনোনয়নে সিলেট-১ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য হিসেবে প্রার্থী হন। ঐ নির্বাচনে তিনি ‘সংসদ সদস্য’ হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে তিনি অর্থমন্ত্রী হন। ২০০৯ সাল থেকে টানা ১০ বছর তিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
লিয়াকত হোসেন খোকন
১৬ এপ্রিল ২০২৬।
![]()









