
স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা কী হারিয়ে যাচ্ছে?
আবদুল্লাহ মজুমদার
সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কেউ ভাবে না—এটাই হয়তো তার শেষ সকাল। মানুষ বের হয় কাজে, কেউ যায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে, কেউ সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে, কেউ চিকিৎসার জন্য। সবার মনে থাকে একটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা—দিন শেষে প্রিয়জনের কাছে ফিরে আসবে। কিন্তু কখনো কখনো সেই ফেরা আর হয় না। একটি দুর্ঘটনা, একটি অগ্নিকাণ্ড, একটি বৈদ্যুতিক তার, একটি অনিরাপদ ভবন কিংবা সামান্য অসতর্কতা কেড়ে নেয় একটি জীবন। তখন শুধু একজন মানুষই মারা যান না, থেমে যায় একটি পরিবারের স্বপ্নও।
মৃত্যু জীবনের অনিবার্য পরিণতি। বার্ধক্য কিংবা দুরারোগ্য ব্যাধিতে মৃত্যু জীবনের বাস্তবতা। কিন্তু অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বহীনতা, নিরাপত্তার ঘাটতি কিংবা প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনায় যে মৃত্যু আসে, তাকে কি নিছক নিয়তি বলে মেনে নেওয়া যায়?
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাই প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এনেছে। চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় একটি মাইক্রোবাসের চার আরোহী নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন কনের ভাই ও বোন। আহত হন আরও কয়েকজন। ষোলশহরে রেললাইনে থাকা এক শিশুকে ট্রেনের ধাক্কা থেকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারান এক ব্যক্তি। পরে শিশুটিও মারা যায়। রাঙ্গুনিয়ায় অটোরিকশা থেকে ছিটকে পড়ে প্রাণ হারায় মাত্র তিন বছরের এক শিশু। আবার হাটহাজারীতে প্রশিক্ষণের সময় ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের ঘটনায় দুই সেনাসদস্যের মৃত্যুও দেখিয়েছে, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশেও দুর্ঘটনা কখনো কখনো কতটা নির্মম হতে পারে।
ঘটনাগুলো আলাদা। কিন্তু প্রতিটির পর একই দৃশ্য—স্বজনের কান্না, বাড়িতে শোক আর একটি অপূর্ণ জীবনের গল্প। প্রশ্ন হলো, এসব মৃত্যুর কতগুলো সত্যিই অনিবার্য ছিল?
সড়ক দুর্ঘটনার কথা ধরা যাক। দুর্ঘটনা ঘটলেই আমরা সাধারণত চালকের ভুল, বেপরোয়া গতি কিংবা অসতর্কতার দিকে আঙুল তুলি। কিন্তু সড়কনিরাপত্তা কেবল চালকের দায়িত্ব নয়। গাড়ির ফিটনেস, চালকের প্রশিক্ষণ, সড়কের নকশা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পথচারীর নিরাপত্তা, আইন প্রয়োগ—সবকিছুর সমন্বয়েই একটি নিরাপদ সড়কব্যবস্থা গড়ে ওঠে। একটি ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন রাস্তায় নামার আগেই যদি শনাক্ত করা যায়, একটি ঝুঁকিপূর্ণ মোড় আগেই নিরাপদ করা যায়, একটি বেপরোয়া চালককে আইনের আওতায় আনা যায়—তাহলে অনেক প্রাণই হয়তো বেঁচে যেতে পারে।
অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আগুন লাগার পর উদ্ধার অভিযান যতই দ্রুত হোক, আগুন লাগার আগেই যদি বৈদ্যুতিক ত্রুটি শনাক্ত করা যায়, জরুরি বহির্গমনপথ নিশ্চিত করা যায়, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর রাখা যায়—তাহলে বিপর্যয়ের মাত্রা অনেকটাই কমানো সম্ভব। ভবন নির্মাণেও নিরাপত্তার প্রশ্নটি একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নকশা, নির্মাণসামগ্রী, অনুমোদন, প্রকৌশল তদারকি—কোনো একটি জায়গায় গাফিলতি থাকলেও তার মূল্য দিতে হতে পারে মানুষের জীবন দিয়ে।
বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনাও কম ভয়াবহ নয়। ঝুলন্ত তার, উন্মুক্ত সংযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক খুঁটি কিংবা অব্যবস্থাপনার কারণে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। অথচ এসব ঝুঁকির অনেকটাই দৃশ্যমান। অর্থাৎ দুর্ঘটনা ঘটার আগেই সতর্ক হওয়ার সুযোগ থাকে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। সব রোগীর মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে, জটিল রোগ আছে, আকস্মিক শারীরিক বিপর্যয় আছে। কিন্তু সেবার ঘাটতি, অযৌক্তিক বিলম্ব, অব্যবস্থাপনা কিংবা দায়িত্বে অবহেলার কারণে কোনো মৃত্যু ঘটলে তার জবাবদিহি প্রয়োজন। কারণ চিকিৎসা শুধু একটি পেশা নয়; এর সঙ্গে মানুষের জীবন সরাসরি জড়িত।
শুধু দুর্ঘটনাই নয়, পরিবেশ ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিও মানুষের স্বাভাবিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বায়ুদূষণ, অনিরাপদ পানি, ভেজাল খাদ্য, অতিরিক্ত শব্দদূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। এসব ঝুঁকি চোখে কম পড়ে বলে এগুলোকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
অনেকে বলেন, মৃত্যু আল্লাহর হাতে। নিঃসন্দেহে মানুষের জন্ম-মৃত্যু তার নিয়তির অংশ। কিন্তু তাই বলে মানুষের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একজন চালককে নিরাপদে গাড়ি চালাতে হবে, একজন ভবনমালিককে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইন প্রয়োগ করতে হবে, রাষ্ট্রকে নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ দায়িত্বে অবহেলা করে তার ফলকে শুধু নিয়তি বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
একজন বাবা সন্তানকে স্কুলে দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরবেন—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। একজন মা কর্মস্থলে যাওয়া সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় থাকবেন—এটাই স্বাভাবিক। একজন শ্রমিক সকালে কাজে গিয়ে সন্ধ্যায় জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরবেন—এটাই স্বাভাবিক। একজন পথচারী রাস্তা পার হয়ে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাবেন—এটুকু নিশ্চয়তা চাওয়া কোনো বিলাসিতা নয়। এটি নাগরিকের মৌলিক প্রত্যাশা।
সব দুর্ঘটনা ঠেকানো সম্ভব নয়। কিন্তু অনেক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। ঝুঁকি চিহ্নিত করা সম্ভব। অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব। আইন প্রয়োগ করা সম্ভব। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা সম্ভব। আর এসবের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহি।
তাই কোনো দুর্ঘটনার পর শুধু মৃতের সংখ্যা গোনা যথেষ্ট নয়। জানতে হবে—মানুষটি কেন মারা গেলেন? তাঁর মৃত্যুর আগে কী কী ঝুঁকি ছিল? সেগুলো কি চিহ্নিত করা হয়েছিল? ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল কি না? থাকলে কেন নেওয়া হয়নি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে না পারলে এক দুর্ঘটনার শোক শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি দুর্ঘটনা আমাদের সামনে হাজির হবে।
একটি প্রাণহানি শুধু একটি সংখ্যা নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবার, কিছু স্বপ্ন, কিছু দায়িত্ব, কিছু অপেক্ষা। একটি শিশুর কাছে হারিয়ে যায় তার বাবা কিংবা মা; একজন মায়ের কাছে নিভে যায় সন্তানের ভবিষ্যৎ; একজন স্ত্রীর জীবনে নেমে আসে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা। মৃত্যুর এই সামাজিক মূল্য কোনো পরিসংখ্যানে পুরোপুরি ধরা পড়ে না।
মানুষ অমর হতে চায় না। মানুষ শুধু চায়—জীবনটা যেন নিরাপদ হয়। সকালে ঘর থেকে বের হয়ে সন্ধ্যায় প্রিয়জনের কাছে ফিরে আসার নিশ্চয়তা যেন থাকে।
মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু অনিবার্য নয়।
তাই মৃত্যুর পর শোক প্রকাশের পাশাপাশি আমাদের ভাবতে হবে মৃত্যুর আগের মুহূর্তগুলো নিয়েও। কোথায় ঝুঁকি ছিল, কেন তা দূর করা হয়নি, কার দায়িত্ব ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ একটি সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু তার কত বড় উন্নয়ন প্রকল্প আছে, তা নয়; বরং তার নাগরিকেরা কতটা নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারে—সেই হিসাবেও। মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা রক্ষা করা তাই কেবল প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও সমাজ—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
লেখক: সাহিত্য ও মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক আমাদের চট্টগ্রাম।
![]()









