- - -

ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন: আইন, মানবাধিকার ও মানবসেবার এক আলোকিত নাম

ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন: আইন, মানবাধিকার ও মানবসেবার এক আলোকিত নাম

তসলিম খাঁ

 

বাংলাদেশের মানুষ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকলেও মাতৃভূমির প্রতি দায়বদ্ধতা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা অনেক প্রবাসীর জীবনকে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন তাঁদেরই একজন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এই বিশিষ্ট বাংলাদেশি আইনজীবী পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি মানবাধিকার, সমাজসেবা ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

চট্টগ্রামের সন্তান মনোয়ার হোসেনের পৈতৃক নিবাস বোয়ালখালী উপজেলায় হলেও দেশ স্বাধীনতা উত্তর হতে চট্টগ্রাম নগরীর মুরাদপুরে স্থায়ী বসবাস করে আসছেন তাঁর পুরো পরিবারসহ। ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেনের বাবা ডা. নুরুল হুদা ছিলেন একজন চিকিৎসক ও মুক্তিযোদ্ধা। পারিবারিকভাবেই দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার যে শিক্ষা তিনি পেয়েছেন, পরবর্তী জীবনে তা তাঁর কর্ম ও চিন্তায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

শিক্ষাজীবনেও মনোয়ার হোসেন ছিলেন সক্রিয় ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৮৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রজীবনের এই নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী সামাজিক ও পেশাগত জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাজ্যে গিয়ে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৯৭ সালে লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে অনার্স এবং ১৯৯৮ সালে ব্যারিস্টার ডিগ্রি অর্জন করেন। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের আদালতসমূহে শুনানির পূর্ণ অধিকারপ্রাপ্ত আইনজীবী হিসেবে তিনি পেশাগত জীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

যুক্তরাজ্যে তাঁর আইন পেশার প্রধান ক্ষেত্র সিভিল লিটিগেশন, মানবাধিকার ও ইমিগ্রেশন আইন। লন্ডনভিত্তিক ‘হুসাইন ল’ অ্যাসোসিয়েটস’ বা MH Barristers -এর প্রধান আইনজীবী ও হেড অব চেম্বার্স হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘ পেশাজীবনে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের বহু অভিবাসীকে আইনি সহায়তা দিয়েছেন। বিশেষ করে অভিবাসন ও মানবাধিকারসংক্রান্ত জটিল বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা বহু মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তার পথ তৈরি করেছে।

একজন আইনজীবীর দায়িত্ব শুধু আদালতের কাঠগড়ায় আইনি যুক্তি উপস্থাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, মনোয়ার হোসেনের কর্মজীবন সেই বৃহত্তর ধারণারই প্রতিফলন। আইনের মাধ্যমে মানুষের অধিকার রক্ষা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং ন্যায়বিচারের সুযোগ নিশ্চিত করার যে প্রত্যয় তিনি ধারণ করেন, তা তাঁর পেশাকে মানবসেবার সঙ্গে যুক্ত করেছে।

পেশাগত পরিচয়ের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম এবং ওয়ার্ল্ডওয়াইড চিটাগং অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি চট্টগ্রামের মানুষের বিভিন্ন নাগরিক, সামাজিক ও প্রবাসীস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করে চলেছেন। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে যোগাযোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং মাতৃভূমির সঙ্গে প্রবাসীদের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রেও এসব উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে।

করোনা মহামারির মতো কঠিন সময়েও তাঁর মানবিক ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে তিনি অসহায় ও সংকটাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। মহামারির মতো দুর্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার পেশা বা সামাজিক অবস্থানে নয়, বরং সংকটের সময়ে সে কতটা মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর সামাজিক কর্মকান্ডে প্রশংসার দাবি রাখে।

মনোয়ার হোসেনের জীবন তাই কেবল একজন সফল প্রবাসী আইনজীবীর গল্প নয়; এটি দেশ, মানুষ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ একজন মানুষের পথচলার গল্প। পেশাগত জীবনে তিনি যুক্তরাজ্যে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন, আবার সামাজিক কর্মকা-ের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গেও তাঁর নিবিড় সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর টান তাঁর বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে প্রতিফলিত হয়।

আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে সফল পেশাজীবী এবং এনআরবি আইকন হিসেবে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সম্মাননা লাভ তাঁর কর্মজীবনের স্বীকৃতি। তবে যেকোনো সম্মাননার চেয়েও বড় অর্জন হলো মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করা। দীর্ঘদিনের পেশাগত অভিজ্ঞতা, সামাজিক নেতৃত্ব এবং মানবিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে তিনি সেই আস্থা অর্জনের চেষ্টা করে চলেছেন।

ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেনের জীবন থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়, সাফল্য তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা নিজের গন্ডি পেরিয়ে অন্য মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। আইনজীবী হিসেবে ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান, মানবাধিকারকর্মী হিসেবে মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ এবং সমাজসেবক হিসেবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, এই তিনটি পরিচয় তাঁর ব্যক্তিত্বকে স্বতন্ত্র করেছে।

প্রবাসে থেকেও দেশের প্রতি ভালোবাসা ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ধরে রাখা সহজ নয়। কিন্তু মনোয়ার হোসেনের কর্মজীবন দেখায়, ভৌগোলিক দূরত্ব কখনোই হৃদয়ের দূরত্ব তৈরি করতে পারে না। চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে তিনি যেমন নিজের পেশাগত অবস্থানকে সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

আইন, মানবাধিকার ও সমাজসেবার সমন্বিত পথচলায় ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন নিঃসন্দেহে একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর মতো প্রবাসী পেশাজীবীদের সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; তাঁদের কর্ম ও মানবিক উদ্যোগ বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকেও আন্তর্জাতিক পরিসরে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরে। মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার পক্ষে তাঁর পথচলা ভবিষ্যতেও আরও বিস্তৃত হবে এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী, কবি ও প্রাবন্ধিক।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa