- - -

কঠিন চীবর দানোৎসবে চসিক প্রশাসক সব ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ ও সম্প্রীতির চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে কাজ করছি: প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন

img 20261106 wa0021
Print News

কঠিন চীবর দানোৎসবে চসিক প্রশাসক
সব ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপদ ও সম্প্রীতির চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে কাজ করছি: প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন

img 20261106 wa0025

চট্টগ্রাম নগরীকে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের জন্য নিরাপদ, সুন্দর ও সম্প্রীতিপূর্ণ নগরীতে পরিণত করতে কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য চট্টগ্রামের অন্যতম শক্তি। এই বৈচিত্র্যকে ধারণ করে তিনি এমন একটি ‘রেইনবো সিটি’ গড়ে তুলতে চান, যেখানে সব ধর্ম, বর্ণ ও মতের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, শান্তি, সম্প্রীতি ও সমান নাগরিক অধিকার নিয়ে বসবাস করবেন।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) চট্টগ্রামের সিইপিজেড এলাকায় বেপজা স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে চট্টগ্রাম মৈত্রী বন বিহারের উদ্যোগে আয়োজিত ১৬তম কঠিন চীবর দানোৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমি চট্টগ্রামকে এমন একটি রেইনবো সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে চাই, যেখানে সব ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি নিয়ে স্বাধীনভাবে বসবাস করবেন। এখানে কেউ ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হবেন না। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ সমান অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করবেন। আমাদের লক্ষ্য এমন একটি মানবিক নগর গড়ে তোলা, যেখানে প্রত্যেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করবেন।’
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের রয়েছে শত শত বছরের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের ঐতিহ্য। এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়েই একটি শান্তিপূর্ণ ও বৈষম্যহীন নগর গড়ে তোলা সম্ভব।
প্রশাসক বলেন, ‘একটি শহর শুধু বড় বড় ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে উন্নত হয় না। সেই শহরের মানুষ কতটা নিরাপদ, কতটা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারেন এবং কতটা মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন—সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। আমরা এমন একটি চট্টগ্রাম চাই, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে কেউ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন না।’
নগরীকে ‘গ্রিন, হেলদি, সেফ অ্যান্ড স্মার্ট সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সবুজায়ন, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং আধুনিক নাগরিক সুবিধার পাশাপাশি মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সম্প্রীতি নিশ্চিত করা জরুরি। একটি নগর তখনই সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, যখন সেখানে বসবাসকারী প্রত্যেক মানুষ নিজেকে সেই নগরের সমান অংশীদার মনে করেন।
তিনি বলেন, ‘আপনারা যেন নিরাপদে বাসায় ফিরতে পারেন, নিরাপদে রাস্তায় চলাচল করতে পারেন এবং নির্বিঘ্নে নিজ নিজ ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান পালন করতে পারেন—এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই। নগর প্রশাসক হিসেবে নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় আমার দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমি চাই চট্টগ্রামের প্রতিটি মানুষ, তিনি যে ধর্মেরই হোন না কেন, এই নগরকে নিজের নিরাপদ আশ্রয় মনে করুন।’
ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় সামাজিক সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রশাসক বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা প্রশাসনের একার দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সম্প্রীতির পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে হয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘ধর্ম মানুষকে নৈতিকতা, মানবিকতা, সহমর্মিতা ও শান্তির শিক্ষা দেয়। কোনো ধর্মই অন্যের প্রতি বিদ্বেষ কিংবা অন্যায় আচরণকে উৎসাহিত করে না। আমরা যদি নিজ নিজ ধর্মের মানবিক শিক্ষাগুলো অনুসরণ করি, তাহলে সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় হবে। মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে।’
বৌদ্ধধর্মের অহিংসা, মৈত্রী ও করুণার শিক্ষার কথা উল্লেখ করে প্রশাসক বলেন, বুদ্ধের শিক্ষা মানুষকে হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে শান্তি, সংযম ও সহমর্মিতার পথে চলতে অনুপ্রাণিত করে। বর্তমান বিশ্বে সামাজিক বিভাজন, অসহিষ্ণুতা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এই মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কঠিন চীবর দানের মতো ধর্মীয় উৎসব শুধু একটি সম্প্রদায়ের ধর্মাচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এ ধরনের আয়োজন পারস্পরিক সৌহার্দ্য, দানশীলতা ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করারও সুযোগ সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, ‘কঠিন চীবর দান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অত্যন্ত পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান। দান, ত্যাগ, সংযম ও মানবকল্যাণের যে শিক্ষা এই উৎসব বহন করে, তা আমাদের সবার জন্য অনুকরণীয়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের সব নাগরিক সমান মর্যাদা পাবেন। ধর্ম, বর্ণ, মত কিংবা বিশ্বাসের ভিন্নতা কখনো কারও অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। আমি চট্টগ্রামে সেই চেতনার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চাই। নাগরিক সেবা, উন্নয়ন এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে সবাইকে সমান গুরুত্ব দিতে চাই।’
অনুষ্ঠানে পুণ্যবান ভিক্ষুসংঘের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রাজবন বিহারের অধ্যক্ষ প্রজ্ঞালংকার মহাস্থবির, জ্যেষ্ঠ আবাসিক ভিক্ষু সৌরজগত মহাস্থবির এবং চট্টগ্রাম মৈত্রী বনবিহারের অধ্যক্ষ বিজ্ঞানানন্দ মহাস্থবিরসহ বিভিন্ন বিহারের ভিক্ষুসংঘের সদস্যরা। আয়োজনে বৌদ্ধধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, আমন্ত্রিত অতিথি ও বিপুলসংখ্যক পুণ্যার্থী অংশ নেন।
ছবির ক্যাপশন
চট্টগ্রাম মৈত্রী বন বিহারের উদ্যোগে আয়োজিত ১৬তম কঠিন চীবর দানোৎসবে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa