- - -

বাবাকে হারানোর শোক বুকে নিয়ে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেল লিজা স্বপ্ন চিকিৎসক

img 20261104 wa0116
Print News

বাবাকে হারানোর শোক বুকে নিয়ে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেল লিজা স্বপ্ন চিকিৎসক

 

যে বাবার হাত ধরে জীবনের পথচলা, যে বাবা মেয়ের ভালো ফলাফলের অপেক্ষায় থাকতেন অধীর আগ্রহে, সেই বাবাই আজ নেই। এইচএসসি পরীক্ষার মাত্র কয়েক দিন আগে বাবাকে হারিয়েও থেমে থাকেনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার মেধাবী শিক্ষার্থী লিজা আক্তার। বুকভরা শোক আর চোখের জল নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে শেষ পর্যন্ত অর্জন করেছে জিপিএ-৫।

গত ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে লিজার এমন সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও সহপাঠীদের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ। তবে জীবনের অন্যতম সেরা অর্জনের দিনে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ বাবাকে পাশে না পাওয়ার বেদনা যেন তার সব আনন্দকে ছাপিয়ে গেছে।

লিজা আক্তার আখাউড়া পৌর এলাকার মসজিদপাড়ার বাসিন্দা। সে উপজেলার মোগড়া এলাকার ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। তার বাবা মৃত রেজাউল ইসলাম (ছায়েদ) এবং মা রোজিনা আক্তার একজন গৃহিণী। দুই ভাইয়ের মধ্যে লিজা বড়। এর আগে এসএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ অর্জন করেছিল সে।

পরিবার ও শিক্ষকদের প্রত্যাশা ছিল, এবারও ভালো ফল করবে লিজা। কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষার কয়েক দিন আগে বাবার মৃত্যুতে তার জীবনে নেমে আসে গভীর শোক। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে সে। বই খুললেই মনে পড়ত বাবার কথা। পড়াশোনায় মন বসত না। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে স্বজনদের সাহস ও শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় বাবার স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয় নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেয় লিজা।

নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে লিজা বলে, ‘বাবা সব সময় চাইতেন আমার ফল ভালো হোক। পরীক্ষার আগে বাবাকে হারানো ছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত। বাবার স্বপ্ন পূরণের কথা ভেবেই নিজেকে সামলে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। বাবার মৃত্যুর পর কোনো কিছুই ভালো লাগত না।

বারবার বাবার মুখ মনে পড়ত, পড়াশোনায় মন বসত না। বাবা বেঁচে থাকলে আমার এই ফল দেখে অনেক খুশি হতেন। সবার কাছে বাবার জন্য দোয়া চাই।’

আখাউড়া নাছরীন নবী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক খোরশেদ আলম জানান, আখাউড়া ক্যামব্রিয়ান কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পুরো উপজেলায় একমাত্র জিপিএ-৫ অর্জন করেছে লিজা। পরীক্ষা শুরুর অল্প কিছুদিন আগে তার বাবা মারা গেলেও সে নিজের মনোবল ধরে রেখে অসাধারণ ফলাফল করেছে।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে লিজা ঢাকায় রেটিনা কোচিংয়ে পড়াশোনা করছে।
তবে বাবাকে হারানোর শোক এখনো তাকে তাড়া করে বেড়ায়। মাঝেমধ্যে ফোন করে কান্নাকাটি করে। শিক্ষকরা তাকে সাহস ও অনুপ্রেরণা দিয়ে মানসিকভাবে শক্ত রাখার চেষ্টা করছেন।

ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুর রাজ্জাক হাজারী বলেন, ‘লিজা শুরু থেকেই মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী। তার ভালো ফলের ব্যাপারে শিক্ষকদের প্রত্যাশা ছিল। তবে পরীক্ষার কিছুদিন আগে বাবার মৃত্যুতে সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।

এ সময় কলেজের শিক্ষকরা তাকে সাহস জুগিয়েছেন এবং সার্বিক সহযোগিতা করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাবাকে হারানোর মতো বড় শোক সামলে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তার এ সাফল্যে কলেজের সবাই আনন্দিত। আশা করি, ভবিষ্যতেও সে সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখবে।’

সরজমিনে জানা গেছে, ভবিষ্যতে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে লিজা। বাবার স্বপ্ন ও নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সে সামনে আরও এগিয়ে যেতে চায়।
আজ তার হাতে জিপিএ-৫, সামনে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন।

কিন্তু যে মানুষটি মেয়ের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হতেন, সেই বাবাই নেই। তাই সাফল্যের আনন্দের মাঝেও লিজার হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে একটাই শূন্যতা—ইশ্! আজ যদি বাবা বেঁচে থাকতেন!

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa