
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নভেম্বর পর্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে: প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন
চট্টগ্রাম, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬: ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে নভেম্বর মাস পর্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা এবং মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, বৃষ্টি কমে গেলেও ডেঙ্গুর ঝুঁকি শেষ হয়ে যায় না। বিগত বছরের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী নভেম্বর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত থাকতে পারে। তাই এ সময়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
সোমবার টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক পর্যালোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রশাসক এসব কথা বলেন। সভায় সিভিল সার্জন অফিসের হালনাগাদ পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয় এবং নগরীতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় চলমান কার্যক্রম ও করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় ৩ হাজার ২১০ জন, জেলার উপজেলাগুলোতে ২ হাজার ৭৬২ জন এবং চট্টগ্রাম বিভাগের অন্যান্য জেলা থেকে আগত ৭০৮ জন রোগী রয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মোট ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মহানগর এলাকায় ১২ জন, উপজেলা পর্যায়ে ১৪ জন এবং অন্যান্য জেলার সাতজন রয়েছেন। মৃতদের মধ্যে ১৮ জন নারী, নয়জন শিশু ও ছয়জন পুরুষ। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে ৯১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।
মহানগর এলাকার মধ্যে হালিশহরে সর্বোচ্চ ৪৩৯ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ ছাড়া কোতোয়ালীতে ৩৩৪ জন, বন্দরে ৩২৪ জন, পাহাড়তলীতে ৩০৪ জন এবং বাকলিয়াতে ২৫৬ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। উপজেলা পর্যায়ে সীতাকুণ্ডে সর্বোচ্চ ৮৪৮ জন, কর্ণফুলীতে ৩২৩ জন এবং বাঁশখালীতে ২৩১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে সেপ্টেম্বরে ২ হাজার ৪৩০ জন এবং অক্টোবরে ২ হাজার ১২৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এসব পরিসংখ্যান ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।
প্রশাসক বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করলে হবে না; নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাসাবাড়ি, আঙিনা, ছাদ, বারান্দা ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে হবে। ফুলের টবের নিচে জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, টায়ার, পানির ট্যাংক এবং অন্যান্য স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হতে পারে। তাই কোথাও পানি জমতে না দেওয়া এবং নিয়মিত জমে থাকা পানি অপসারণের মাধ্যমে মশার বংশবিস্তার বন্ধ করতে হবে। পরিচ্ছন্নতা ও ব্যক্তিগত সচেতনতাকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ডেঙ্গুর লক্ষণ, প্রতিরোধের উপায় এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে নগরবাসীকে ডেঙ্গুর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা সম্ভব।
সভায় জানানো হয়, চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বর্তমানে প্রতিটি ছোট ওয়ার্ডে তিনজন করে এবং বড় ওয়ার্ডগুলোতে পাঁচজন করে কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। সব মিলিয়ে প্রায় দেড়শ কর্মী এ কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। মশক নিয়ন্ত্রণে বিটিআইসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ এবং অন্যান্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রশাসক এসব কার্যক্রম নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের তদারকি জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রসঙ্গে প্রশাসক বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তিদের যথাযথ ও সময়োপযোগী চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকদের রোগীদের শারীরিক অবস্থার প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীরা যেন মশারি ব্যবহার করেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশা কামড়ানোর পর সেই মশার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই রোগীর চিকিৎসার পাশাপাশি মশার কামড় থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা, মশক নিয়ন্ত্রণ এবং যথাযথ চিকিৎসাসেবা—এই চারটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করলে ডেঙ্গুর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
সভায় চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শামীম মোহাম্মদ খান, ম্যালেরিয়া ও মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা শরফুল ইসলাম মাহি এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ছবির ক্যাপশন: সর্বশেষ ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যালোচনা সভায় বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন।
![]()









